লোকসভার পর এবার রাজ্যসভাতেও পাস হল ‘ওয়াকফ (সংশোধনী) বিল, ২০২৫’। দীর্ঘ ১২ ঘণ্টার বিতর্কের পর বৃহস্পতিবার গভীর রাতে ভোটাভুটির মাধ্যমে এই বিলটি পাস হয়। সংসদীয় ও সংখ্যালঘু বিষয়ক মন্ত্রী কিরেন রিজিজু রাত ২টা ১৯ মিনিটে বিল পাস করানোর প্রস্তাব পেশ করেন।
প্রথমে ধ্বনিভোটে বিলটি পাস করানোর চেষ্টা হলেও, বিরোধীরা সন্তুষ্ট না হয়ে বিভাজন চেয়ে বসেন। এরপর ভোটাভুটি শুরু হয় এবং রাত ২টা ৩৪ মিনিটে ফলাফল ঘোষণা করা হয়। তাতে দেখা যায়, ১২৮ জন সদস্য বিলটির পক্ষে ভোট দেন এবং ৯৫ জন বিপক্ষে ভোট দেন। ফলে ৩৩ ভোটের ব্যবধানে রাজ্যসভায় পাস হয়ে যায় এই গুরুত্বপূর্ণ বিলটি।
লোকসভা-পার হয়ে রাজ্যসভাতেও পাশ বিতর্কিত ওয়াকফ সংশোধনী বিল, আইন রূপ পেতে শুধু রাষ্ট্রপতির সইয়ের অপেক্ষা
হাইলাইটস:
- লোকসভা ও রাজ্যসভায় পাস ‘ওয়াকফ (সংশোধনী) বিল, ২০২৫’
- রাজ্যসভায় পক্ষে ভোট ১২৮, বিপক্ষে ৯৫
- ১২ ঘণ্টার দীর্ঘ বিতর্ক, রাত ২টা ৩৪ মিনিটে ফলাফল ঘোষণা
- রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের অপেক্ষায় নতুন আইন
- বিল নিয়ে তীব্র বিরোধিতায় মুসলিম সংগঠন ও বিরোধী দলগুলো
সংসদীয় ও সংখ্যালঘু বিষয়ক মন্ত্রী কিরেন রিজিজু দাবি করেন, নতুন আইন কার্যকর হলে ওয়াকফ বোর্ডের রাজস্ব আয় বহুগুণে বাড়বে। তিনি সাচার কমিটির তথ্য তুলে ধরে জানান, ২০০৬ সালে ৪.৯ লক্ষ ওয়াকফ সম্পত্তি থেকেও মাত্র ১৬৩ কোটি টাকা আয় হয়েছিল, যেখানে সম্ভাব্য আয় ছিল ১২ হাজার কোটি টাকা। এমনকি ২০১৩ সালের ইউপিএ সরকারের সংশোধনীর পর ৮.৭২ লক্ষ সম্পত্তি থেকেও আয় হয় মাত্র ১৬৬ কোটি।
রিজিজুর মতে, ওয়াকফ সম্পত্তির মাধ্যমে মুসলিম সমাজের দরিদ্র, মহিলা ও অনাথ শিশুদের উন্নয়ন করা উচিত। নতুন আইন সেই লক্ষ্যেই তৈরি।
রাজ্যের শাসক দলের নেতা রাজ্যসভার তৃণমূল সাংসদ নাদিমুল হক ওয়াকফ (সংশোধনী) বিল নিয়ে তীব্র আপত্তি জানায় নাদিমুল হক সরাসরি অভিযোগ করেন, “এই বিল একটি বিপজ্জনক নজির তৈরি করবে। আজ ওয়াকফ সম্পত্তি, কাল গির্জা, মন্দির, গুরুদ্বার— সকল ধর্মীয় সম্পত্তি সরকারের নিয়ন্ত্রণে চলে যেতে পারে।”
তিনি বলেন, “এটি শুধুই ধর্মীয় নয়, বরং একটি সাংবিধানিক সমস্যা। এই বিলের অনেক ত্রুটি রয়েছে এবং এতে ধর্ম-বহির্ভূত সিদ্ধান্ত রয়েছে যা সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর পরিপন্থী। বিলটি বৈষম্যমূলক এবং আইনি প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করবে।”
নাদিমুলের মতে, এই সংশোধনী আসলে ওয়াকফের শতাব্দীপ্রাচীন ঐতিহ্যকে সরকারি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা, যা যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর ওপর আক্রমণ হিসেবে দেখা উচিত। তিনি আরও বলেন, “এই বিল দেশের ঐক্য ও সংহতির পক্ষে বিপজ্জনক। দেশকে বিভাজনের দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে।”
আরও এক তৃণমূল সাংসদ সুস্মিতা দেব সংসদে বলেন, “বিলটির ভাষা ও কাঠামোতে স্পষ্ট দুর্বলতা রয়েছে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিশ্বাস ও আত্মমর্যাদায় আঘাত হানতে পারে এই সংশোধনী।”
বিরোধী দলগুলোর আরও অভিযোগ করেন, নতুন সংশোধনী ওয়াকফ বোর্ডের ক্ষমতা খর্ব করছে এবং বোর্ডে অমুসলিম সদস্য অন্তর্ভুক্তির ব্যবস্থা মুসলিম স্বার্থের পরিপন্থী।
রিজিজু এর জবাবে বলেন, ওয়াকফ বোর্ড একটি বিধিবদ্ধ সংস্থা, তাই ধর্মনিরপেক্ষতা বজায় রাখতে অন্যান্য ধর্মের প্রতিনিধিত্ব থাকা উচিত। তবে তিনি আশ্বাস দেন, ২২ সদস্যের বোর্ডে সর্বোচ্চ ৪ জন অমুসলিম সদস্য থাকবেন, ফলে মুসলিম প্রতিনিধিরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ থাকবেন।
কেন বিতর্কে ওয়াকফ বিল?
ওয়াকফ (সংশোধনী) বিলের সবচেয়ে বিতর্কিত দিক হলো—এতে অমুসলিমকে ওয়াকফ বোর্ডের প্রধান নির্বাহী হিসেবে নিয়োগের সুযোগ রাখা হয়েছে। পাশাপাশি, রাজ্য সরকার চাইলেই ওয়াকফ বোর্ডে অন্তত দু’জন অমুসলিমকে সদস্য করতে পারবে।
এছাড়া, নতুন নিয়মে ওয়াকফ সম্পত্তি নির্ধারণের ক্ষমতা এখন ওয়াকফ বোর্ডের বদলে দেওয়া হয়েছে জেলা শাসকের হাতে। তিনি চাইলে কোনও সম্পত্তিকে ওয়াকফ ঘোষণা করতে পারবেন কিংবা সরকারি মালিকানায় নিতে পারবেন।
এইসব পরিবর্তন নিয়ে মুসলিম সমাজ ও বিরোধীরা বলছেন—এটা ওয়াকফের ধর্মীয় কাঠামোয় হস্তক্ষেপ, যা সংবিধানেরও বিরোধী।