ফর্ম ৬-এর আড়ালে কী—প্রশাসনিক ত্রুটি না পরিকল্পিত কারসাজি?

লিখেছেন: তামিম আখতার (লেখক আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী এবং কোচবিহারের বাসিন্দা। তিনি নিয়মিত সমসাময়িক রাজনীতি ও সামাজিক বিষয় নিয়ে বিশ্লেষণধর্মী লেখালেখি করেন)।

MD 360 NEWS
4 Min Read
WhatsApp_Group
সব খবর মোবাইলে পেতে Whatsapp গ্রুপে জয়েন্ট করুন

ইলেকশন কমিশনের SIR এর কর্মপদ্ধতিগত হয়রানি যখন বাংলার মানুষকে অতিষ্ঠ করে তুলেছে ঠিক তখনই রাজ্য রাজনীতিতে নতুন বিতর্ক যার নাম Form 6 , অভিযোগ অন্যান্য রাজ্যের মতো এ রাজ্যেও ভোটের পূর্বে বাইরে থেকে বিজেপির ভোটার বাড়ানোর চেষ্টা চলছে ।  এই ভোটার সংযোজন প্রক্রিয়াটাই আজ প্রশ্নের মুখে।  কারণ বিষয়টা শুধু নতুন ভোটার যুক্ত হওয়া নয়, বরং কিভাবে, কতটা যাচাই করে, এবং কোন নথির ভিত্তিতে একজন মানুষ হঠাৎ করেই একটি রাজ্যের নির্বাচনী গণতন্ত্রের অংশ হয়ে উঠছেন—সেই কাঠামোটাই এখন আলোচনার কেন্দ্রে।

Join WhatsApp Channel Join Now
Telegram Group Join Now

ভারতের সর্বোচ্চ আদালত, অর্থাৎ Supreme Court of India স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছে, আধার কোনোভাবেই নাগরিকত্বের প্রমাণ নয়।  এমনকি জন্মতারিখ বা স্থায়ী বসবাসের নির্ভরযোগ্য একক প্রমাণ হিসেবেও আধারকে গণ্য করা যায় না। UIDAI নিজেও বলে—এটি কেবলমাত্র একটি পরিচয়পত্র, তার বেশি কিছু নয়।  অথচ বাস্তবে যা ঘটছে, তা একেবারেই ভিন্ন ছবি তুলে ধরছে।  আজকের Form 6-এর বাস্তব ব্যবহারে দেখা যাচ্ছে, আধার কার্যত এমন এক “all-purpose document”-এ পরিণত হয়েছে, যার উপর নির্ভর করেই একজনের ঠিকানা, বয়স, এমনকি ভোটার হিসেবে তার গ্রহণযোগ্যতা নির্ধারিত হচ্ছে।  আইন এক কথা বলছে, আর প্রশাসনিক বাস্তবতা আরেক কথা।

সমস্যার গভীরতা এখানেই।  কারণ আজকের দিনে আধারের ঠিকানা পরিবর্তন করা অত্যন্ত সহজ।  অনলাইনে কয়েকটি ধাপ পেরোলেই, সামান্য কিছু সহায়ক নথি জোগাড় করলেই, একজন ব্যক্তি নিজের ঠিকানা বদলে ফেলতে পারেন—এমনকি সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি রাজ্যে।  এই প্রক্রিয়ায় কঠোর যাচাইয়ের অভাব বহুবার প্রশ্নের মুখে পড়েছে।  ফলে, যখন সেই পরিবর্তিত আধারই আবার Form 6-এর মতো সংবেদনশীল নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত হয়, তখন সন্দেহটা আর কল্পনা থাকে না—বাস্তব আশঙ্কায় রূপ নেয়।

Election Commission of India-এর নিয়ম অনুযায়ী অবশ্যই বহুস্তরীয় যাচাই হওয়ার কথা—BLO স্তরে বাড়ি গিয়ে পরীক্ষা, স্থানীয় তালিকার সঙ্গে মিলিয়ে দেখা, এবং প্রয়োজনে উচ্চতর পর্যায়ে অনুমোদন।  কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এই যাচাই কি সর্বত্র একই রকম কড়া ভাবে হচ্ছে? নাকি কোথাও কোথাও এই স্তরগুলো কেবল কাগজে-কলমে থেকে যাচ্ছে? কারণ বাস্তব চিত্র বলছে, অনেক ক্ষেত্রে হঠাৎ করে বিপুল সংখ্যক নতুন নাম যুক্ত হচ্ছে, অথচ সেই অনুপাতে মাঠপর্যায়ে যাচাইয়ের প্রমাণ বা স্বচ্ছতা দেখা যাচ্ছে না।  এই অসামঞ্জস্যই পুরো প্রক্রিয়াটিকে সন্দেহের কেন্দ্রে এনে দাঁড় করাচ্ছে।

গণতন্ত্রের সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি হল ভোটার তালিকা—যেখানে প্রতিটি নামের পেছনে থাকা উচিত একটি নিশ্চিত, যাচাইকৃত পরিচয়।  যদি সেই তালিকায় ঢোকার প্রক্রিয়াটাই সন্দেহের মুখে পড়ে, যদি এমন ধারণা তৈরি হয় যে কাগজে-কলমে ঠিকানা বদলে ফেলে, দুর্বল যাচাই ব্যবস্থাকে কাজে লাগিয়ে, যে কেউ যে কোনো জায়গার ভোটার হয়ে যেতে পারে—তাহলে সেটা শুধু একটি প্রশাসনিক ত্রুটি নয়, বরং গণতান্ত্রিক কাঠামোর ওপর আঘাত।

আজকের বিতর্কের আসল প্রশ্ন তাই খুব সরল—Form 6 কি তার নির্ধারিত উদ্দেশ্য অনুযায়ী সঠিকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে, নাকি বাস্তব প্রয়োগে সেটি এমন এক দরজা হয়ে উঠছে, যার ফাঁক গলে অযোগ্য বা যাচাইবিহীন নাম তালিকায় ঢুকে পড়ার সুযোগ পাচ্ছে? এই প্রশ্নের উত্তর রাজনৈতিক বক্তব্যে নয়, দরকার স্বচ্ছ তথ্য, নিরপেক্ষ অডিট, এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—মাঠপর্যায়ে নির্ভুল ও কঠোর যাচাই।

কারণ শেষ পর্যন্ত, নির্বাচন কেবল ভোটের দিন নয়—নির্বাচনের শুরু হয় সেই তালিকা থেকে, যেখানে একজন নাগরিকের নাম ওঠে।  আর যদি সেই শুরুটাই প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তাহলে শেষের ফলাফল নিয়েও প্রশ্ন উঠবে—এটাই স্বাভাবিক।

Share This Article