মালদহ ও চাকুলিয়া: মার্চের শেষ সপ্তাহ থেকে নির্বাচন কমিশনের প্রকাশিত একের পর এক সাপ্লিমেন্টারি তালিকায় নাম বাদ পড়ার হিড়িক যেন থামতেই চাইছে না। স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (SIR) প্রক্রিয়ার গেরোয় পড়ে ভোটাধিকার হারানোর তালিকায় প্রতিদিন যুক্ত হচ্ছে নতুন নতুন নাম। বীরভূমের নলহাটিতে ১,১১৪ জন ‘বিচারাধীন‘ ভোটারের মধ্যে ৯৮৭ জনের নাম কাটা যাওয়ার রেশ কাটতে না কাটতেই এবার একই ভয়াবহ ছবি ধরা পড়ল মালদহের মোথাবাড়ি এবং উত্তর দিনাজপুরের চাকুলিয়ায়। ২৩ থেকে ৩০ মার্চের মধ্যে দফায় দফায় পাঁচটি সাপ্লিমেন্টারি লিস্ট প্রকাশের যে প্রক্রিয়া চলছে, সেখানেই ধরা পড়ছে এই গণ-বাতিলের ছবি।
মাধ্যমিক পাসের শংসাপত্র থেকে শুরু করে এসআইআর-এর জন্য উল্লিখিত তথ্য প্রমাণ জমা দেওয়ার পরেও শয়ে শয়ে বাসিন্দার নাম রাতারাতি ‘ডিলিটেড’ বা মুছে দেওয়া হয়েছে। প্রায় ৬০ লক্ষ ভোটারের নথিপত্র খতিয়ে দেখার এই বিশাল কর্মযজ্ঞে ভোটার তালিকার এই নজিরবিহীন ‘ছাঁটাই’ ঘিরে এখন তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়েছে। সব প্রমাণ হাতে থাকা সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত নিজের ভোটার অধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন কি না, তা নিয়ে ঘোর দুশ্চিন্তায় মোথাবাড়ি ও চাকুলিয়ার , সুজাপুর ও কোচবিহার কয়েকশো পরিবার।
মালদহের মোথাবাড়ি বিধানসভা কেন্দ্রের ১৭৮ নম্বর বুথের পরিসংখ্যান রীতিমতো পিলে চমকানো। ওই বুথে মোট ভোটার ১,২৮৪ জন। স্থানীয় বাসিন্দা মোহা: রাহিমুদ্দিন সেখ জানান, ৬৮৯ জন বিচারাধীন (Under adjudication) থাকা ভোটারের শুনানি (Hearing) হয়েছিল। কিন্তু সাপ্লিমেন্টারি তালিকায় তাঁদের মধ্যে ৫২৪ জনের নামই বাদ দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, শুনানিতে অংশ নেওয়া প্রায় ৭৬ শতাংশেরই ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে। এমনকি খোদ রাহিমুদ্দিন সেখের নামও বাদ দেওয়া হয়েছে সাপ্লিমেন্টারি তালিকা থেকে। তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন ,
আমি মাধ্যমিক পাসের সার্টিফিকেট, অ্যাডমিট কার্ড এবং জন্মপরিচয় পত্রের মতো সমস্ত বৈধ নথি জমা দিয়েছিলাম। তাসত্ত্বেও সাপ্লিমেন্টারি তালিকায় আমার নাম রাখা হয়নি, সরাসরি ডিলিট করে দেওয়া হয়েছে। সব প্রমাণ দিয়েও কেন এই বঞ্চনা, তা বুঝতে পারছি না।
একই ছবি ধরা পড়েছে উত্তর দিনাজপুরের চাকুলিয়াতেও। সেখানকার ৫০ নং বুথে ৪৩২ জন ‘বিচারাধীন’ (Under Adjudication) ভোটারের মধ্যে ৩৫৫ জনের নামই সাপ্লিমেন্টারি তালিকায় নেই। আমাদের প্রতিনিধি স্থানীয় গ্রামবাসী জাবেদ আক্তার সঙ্গে কথা বললে তিনি, ক্ষোভ প্রকাশের সঙ্গে জানান, তাঁদের পরিবারের সদস্যদের মাধ্যমিকের শংসাপত্র থেকে শুরু করে এসআইআর প্রক্রিয়ার সমস্ত প্রয়োজনীয় নথি জমা দিয়েছিলেন। এরপরও তাদের পরিবারের নাম সহ এলাকার ৩৫৫ জন ভোটারের নাম সাপ্লিমেন্টারি তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এদিন জাবেদ আমাদেরকে জানায়,
মাধ্যমিকের সার্টিফিকেট থাকা সত্ত্বেও যদি আমরা নাগরিক বা ভোটার না হই, তবে আর কী প্রমাণ দিতে হবে?
একই তালিকা থেকে বাদে’র যন্ত্রণার সুর শোনা গেল কোচবিহার দক্ষিণ বিধানসভার ১০০ নম্বর বুথের ভোটার একরামুল হকের গলায়। বাবার নাম ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় থাকা সত্ত্বেও একরামুলের নাম ঠাঁই হয়নি সাপ্লিমেন্টারি তালিকায় । তিনি বলেন,
হেয়ারিং-এ মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকের সার্টিফিকেট, রেজাল্ট, অ্যাডমিট কার্ড সব দিয়েছি। তাও নাম মুছে দেওয়া হয়েছে। এখন আর কী নথি দেব? কিছুই বুঝতে পারছি না।
উল্লেখ্য, এর আগে নলহাটির ১৩ নম্বর ওয়ার্ডে বিপুল সংখ্যক ভোটারের নাম বাদ যাওয়া নিয়ে তোলপাড় হয়েছিল। পাশাপাশি বসিরহাটেও একটি বুথ থেকে ৩৪০ জনের নাম ডিলিট হওয়ার খবর পাওয়া গিয়েছে। বৈধ নথি থাকা সত্ত্বেও কেন এই পাইকারি হারে ছাঁটাই, তার কোনও সদুত্তর মিলছে না প্রশাসনের কাছে।
তবে সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক নির্দেশ অনুযায়ী, ভোটাধিকার কোনও ভাবেই চিরতরে কেড়ে নেওয়া যায় না। কমিশন জানিয়েছে, এই ‘ডিলিটেড’ বা বাদ পড়া ভোটারদের এখন নবগঠিত ‘অ্যাপেলেট ট্রাইব্যুনালে’ (Appellate Tribunal) গিয়ে তাঁদের নাগরিকত্বের অকাট্য প্রমাণ দিয়ে আইনি লড়াই লড়তে হবে। তবে নির্বাচনের ঠিক মুখে সাধারণ গ্রামবাসীদের এই ট্রাইব্যুনালের চক্কর কাটা এবং আইনি লড়াই লড়া কতটা সম্ভব হবে।

