পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের ডঙ্কা বেজে গিয়েছে, কিন্তু তার মধ্যেই লক্ষ লক্ষ মানুষের ভোটাধিকার নিয়ে তৈরি হয়েছে চরম অনিশ্চয়তা। আজ, সোমবার দেশের সর্বোচ্চ আদালতে এসআইআর (SIR) মামলার এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিন। সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত এবং বিচারপতি জয়মাল্য বাগচীর ডিভিশন বেঞ্চে দুপুর দুটোর পর এই মামলার শুনানি শুরু হওয়ার কথা। এই একটি শুনানির ওপরই নির্ভর করছে রাজ্যের সেই ২৭ লক্ষ মানুষের ভাগ্য, যাঁদের নাম বর্তমানে ‘অ্যাডজুডিকেশন’ তালিকায় আটকে রয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের প্রথাগত নিয়ম অনুযায়ী, কোনো নির্বাচনের মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিন রাত ১২টার পরেই সংশ্লিষ্ট এলাকার ভোটার তালিকা ‘ফ্রিজ’ বা চূড়ান্ত হয়ে যায়। সেই নিয়ম মেনে পশ্চিমবঙ্গে প্রথম দফার জন্য ৬ এপ্রিল এবং দ্বিতীয় দফার জন্য ৯ এপ্রিল তালিকা চূড়ান্ত করা হয়েছে। কিন্তু এখানেই দেখা দিয়েছে জটিলতা। গত শুক্রবার বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী পর্যবেক্ষণে বলেছিলেন যে, আদালত এই ‘ফ্রিজিং’ বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করতে পারে।
আইনজ্ঞদের মতে, সংবিধানের ৩২৪ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ‘অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন’ সুনিশ্চিত করা কমিশনের প্রাথমিক দায়িত্ব। যদি লক্ষ লক্ষ যোগ্য নাগরিক প্রশাসনিক বা যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে তালিকা থেকে বাদ পড়েন, তবে সেই নির্বাচনকে ‘অবাধ’ বলা যায় কি না, সেই প্রশ্নই আজ বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে। আজ সুপ্রিম কোর্ট যদি বিশেষ কোনো অন্তর্বর্তীকালীন নির্দেশ দেয়, তবে ভোটার তালিকা ফ্রিজ হওয়ার পরেও নতুন নাম অন্তর্ভুক্তির এক ঐতিহাসিক নজির তৈরি হতে পারে বলে মনে করছে বিশেষজ্ঞ মহল।
রাজ্য জুড়ে ভোটার তালিকা সংশোধন বা SIR এর এই বিশাল প্রক্রিয়ায় মোট ৬০ লক্ষ ৯০ হাজার ভোটারের নাম ‘অ্যাডজুডিকেশন’ বা বিশেষ যাচাইয়ের আওতায় আনা হয়েছিল। এর মধ্যে প্রায় ৩৩ লক্ষ মানুষের নথিপত্র সঠিক পাওয়ায় তাঁদের নাম তালিকায় পুনরায় বহাল রাখা হয়েছে। কিন্তু বিপত্তি বেঁধেছে বাকি ২৭ লক্ষ ১৬ হাজার ৩৯৩ জনকে নিয়ে, যাঁদের প্রাথমিক নথিপত্রে গরমিল থাকায় ‘অবৈধ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই বিপুল সংখ্যক মানুষের মধ্যে কতজন প্রকৃত ভারতীয় নাগরিক আর কতজন যান্ত্রিক ভুলে বাদ পড়েছেন, তা যাচাই করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই ২৭ লক্ষ ভোটারদের মধ্যে একটি বিশাল অংশ দাবি করেছেন যে তাঁদের কাছে ভোট দেওয়ার সমস্ত বৈধ নথিপত্র থাকা সত্ত্বেও SIR প্রক্রিয়ায় তাঁদের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে বা ‘অবৈধ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ট্রাইব্যুনালে নিজেদের নির্দোষ প্রমাণ করতে পারলেই কি তাঁরা আসন্ন ২৩ এবং ২৯ এপ্রিলের নির্বাচনে ভোট দিতে পারবেন? আজ সুপ্রিম কোর্টের রায়েই মিলবে সেই উত্তর।
দক্ষিণ কলকাতার অবস্থিত ‘শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ ওয়াটার অ্যান্ড স্যানিটেশন’ ভবনে আজ থেকেই ট্রাইব্যুনাল হেডকোয়ার্টারের কাজ পুরোদমে শুরু হচ্ছে। রবিবারই কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি সুজয় পাল ব্যক্তিগতভাবে সেখানকার পরিকাঠামো খতিয়ে দেখেছেন। এবং এই কাজের জন্য ১৯ জন জুডিশিয়াল অফিসারকে নিয়ে গঠিত এই ট্রাইব্যুনালে প্রতিটি টিমে ৩ জন করে এডিএম (ADM) পদমর্যাদার আধিকারিক নিয়োগ করা হয়েছে।
এছাড়া প্রায় ২০০ জন মাইক্রো অবজার্ভার কাজ করবেন, যাতে জেলা থেকে আসা কয়েক লক্ষ আবেদনপত্র এবং অনলাইন তথ্যের দ্রুত ও নিখুঁত নিষ্পত্তি করা যায়। পাশাপাশি, আজ মালদহের মোথাবাড়িতে জুডিশিয়াল অফিসারদের হেনস্থার ঘটনায় এনআইএ (NIA) তাদের তদন্তের ‘স্ট্যাটাস রিপোর্ট’ জমা দিতে পারে, যা এই মামলার সুর আরও চড়িয়ে দেবে বলে মনে করা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, আজ বিকেলের মধ্যেই পরিষ্কার হয়ে যাবে যে আগামী কয়েক দিনের মধ্যে বাংলার ভোটের লাইনে এই ২৭ লক্ষ মানুষের জন্য কোনো বিশেষ জায়গা তৈরি হবে কি না।

