রাজ্যের স্বীকৃতিপ্রাপ্ত মাদ্রাসাগুলিতে শিক্ষক ও অশিক্ষক কর্মী নিয়োগ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে চলা আইনি জটিলতায় এদিন গুরুত্বপূর্ণ রায় দিল সুপ্রিম কোর্ট। সোমবার বিচারপতি এজি মাসিহ এবং বিচারপতি দীপঙ্কর দত্তের ডিভিশন বেঞ্চ জানিয়ে দিয়েছে, মামলাকারীদের কোনও দাবিরই আইনি ভিত্তি পাওয়া যায়নি। তাই শুধু নমুনা হিসেবে শুনানি হওয়া ১৩টি আবেদন নয়, মোট ৩৬১ জন আবেদনকারীর করা ৪০টি রিট পিটিশনই খারিজ করে দেওয়া হয়েছে।
এই মামলার সূত্রপাত ২০১৫ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে হওয়া শিক্ষক ও অশিক্ষক কর্মীদের নিয়োগকে কেন্দ্র করে। ওই সময়ে কলকাতা হাইকোর্টের একটি রায়ের কারণে পশ্চিমবঙ্গ মাদ্রাসা সার্ভিস কমিশন আইন, ২০০৮ এর বৈধতা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল। সেই অবস্থায় হওয়া নিয়োগগুলি বৈধ কি না, তা নিয়েই পরে সুপ্রিম কোর্টে একাধিক মামলা দায়ের হয়। পাশাপাশি, রাজ্যের অনুদানভিত্তিক (Grant-in-Aid) প্রকল্পের আওতায় বেতন পাওয়ার দাবিও জানানো হয়েছিল।
শুনানির শুরুতেই সুপ্রিম কোর্ট জানায়, সব আবেদন একসঙ্গে না শুনে প্রথমে ৩৬১ জনের মধ্যে ১৩ জনের আবেদন বিস্তারিতভাবে চেক করা হবে। যদি ওই ১৩টি মামলায় আবেদনকারীদের যুক্তি গ্রহণযোগ্য হয়, তাহলে বাকি আবেদনগুলিও বিবেচনা করা হবে। কিন্তু আদালতের মতে, নির্বাচিত ১৩টি মামলার কোনওটিতেই এমন কোনও আইনি ভিত্তি বা যুক্তি পাওয়া যায়নি, যাতে পরবর্তী আবেদনগুলির শুনানির প্রয়োজন হয়। সেই কারণেই একসঙ্গে সমস্ত আবেদন খারিজ করে দেওয়া হয়েছে।
এই মামলার পেছনের আইনি ইতিহাসও বেশ দীর্ঘ। ২০০৮ সালে পশ্চিমবঙ্গ মাদ্রাসা সার্ভিস কমিশন আইন চালু হওয়ার পর রাজ্যের স্বীকৃত মাদ্রাসাগুলিতে শিক্ষক নিয়োগের জন্য একটি আইনানুগ কমিশন গঠন করা হয়। কিন্তু ২০১৪ সালে কলকাতা হাইকোর্টের একক বেঞ্চ ওই আইনকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করে। পরে ডিভিশন বেঞ্চও সেই রায় বহাল রাখে। এরপর বিষয়টি সুপ্রিম কোর্টে পৌঁছায়।
এরপর ২০১৬ সালে সুপ্রিম কোর্ট হাইকোর্টের রায়ের উপর স্থগিতাদেশ দেয়। পরে ২০২০ সালে চূড়ান্ত রায়ে শীর্ষ আদালত পশ্চিমবঙ্গ মাদ্রাসা সার্ভিস কমিশন আইন, ২০০৮ কে বৈধ ঘোষণা করে এবং হাইকোর্টের আগের রায় বাতিল করে দেয়। তবে এর মধ্যবর্তী সময়ে, অর্থাৎ ২০১৫ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে বিভিন্ন মাদ্রাসায় শিক্ষক ও অশিক্ষক কর্মী নিয়োগ চলতে থাকে। সেই নিয়োগগুলির বৈধতা নিয়েই নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়।
এরপর সুপ্রিম কোর্ট একটি বিশেষ কমিটি গঠন করে সংশ্লিষ্ট সময়ের সমস্ত নিয়োগ খতিয়ে দেখার নির্দেশ দেয়। একই সঙ্গে যাঁরা ইতিমধ্যেই কাজ করছিলেন, তাঁদের বেতন চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়েছিল, যাতে মামলার নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তাঁরা সমস্যায় না পড়েন। পরে কমিটি তাদের রিপোর্টে জানায়, ২০১৫ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে হওয়া নিয়োগগুলি আইনসম্মত নয়।
কমিটির সেই রিপোর্ট এবং নিয়োগ বাতিলের সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করেই ৩৬১ জন শিক্ষক ও অশিক্ষক কর্মী সুপ্রিম কোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করেন। দীর্ঘ শুনানির পর সোমবার আদালত স্পষ্ট জানিয়ে দিল, আবেদনকারীদের দাবি গ্রহণযোগ্য নয়। ফলে সব আবেদন খারিজ করা হচ্ছে এবং এই পর্যায়ে নিয়োগের বৈধতা নিয়ে আর কোনও স্বস্তি মিলল না আবেদনকারীদের।

