বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি নারীর অতি পরিচিত শারীরিক সমস্যা পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম বা ‘পিসিওএস’ (PCOS)-এর নাম চিরতরে বদলে গেল। আন্তর্জাতিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের এক বৈপ্লবিক সিদ্ধান্তে এই রোগের নতুন নাম রাখা হয়েছে পলিএন্ডোক্রিন মেটাবলিক ওভারিয়ান সিনড্রোম বা ‘পিএমওএস’ (PMOS)। মঙ্গলবার ইউরোপিয়ান কংগ্রেস অফ এন্ডোক্রিনোলজির পক্ষ থেকে এই ঐতিহাসিক পরিবর্তনের ঘোষণা করা হয়েছে। দীর্ঘ ১৪ বছরের নিরবচ্ছিন্ন গবেষণা এবং বিশ্বের ৫৬টি আন্তর্জাতিক সংগঠনের যৌথ সম্মতিতে এই নতুন নাম চূড়ান্ত করা হয়। গবেষকদের মতে, পুরনো নামের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ‘সিস্ট’ শব্দটি নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে যে দীর্ঘদিনের ভ্রান্ত ধারণা ও আতঙ্ক ছিল, তা দূর করতেই এই আমূল পরিবর্তন।
চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘পিসিওএস’ নামটির কারণে অনেক নারীই মনে করতেন যে তাঁদের ডিম্বাশয়ে অসংখ্য সিস্ট হয়েছে এবং এর ফলে হয়তো তাঁরা কোনোদিন মা হতে পারবেন না। কিন্তু গবেষণায় দেখা গেছে, এই রোগে ডিম্বাশয়ে যা দেখা যায় তা মূলত খুব ছোট ছোট অপরিণত থলি বা গুটি, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় কোনোভাবেই ‘সিস্ট’ বলা যায় না। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে এই রোগ থাকা সত্ত্বেও নারীর ডিম্বাশয়ে কোনো থলিই থাকে না। তবে নতুন ‘পিএমওএস’ নামটি রোগটির প্রকৃত স্বরূপকে প্রতিফলিত করে; এটি স্পষ্ট করে দেয় যে এটি কেবল ডিম্বাশয়ের সমস্যা নয়, বরং এটি শরীরের হরমোন (Endocrine) এবং বিপাকীয় (Metabolic) ব্যবস্থার একটি গভীর জটিলতা। এর প্রভাবে ইনসুলিনের ভারসাম্য বিঘ্নিত হওয়া থেকে শুরু করে ডায়াবেটিস, হৃদরোগ এবং মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি পর্যন্ত ঘটতে পারে।
বর্তমানে ভারতে প্রতি ৫ জন নারীর মধ্যে ১ জন (অর্থাৎ প্রায় ২০ শতাংশ) এই সমস্যায় আক্রান্ত। অর্থাৎ, দেশের প্রায় ৪.৪ কোটি নারী এই দীর্ঘমেয়াদী হরমোনজনিত লড়াইয়ের সঙ্গে যুক্ত। চিকিৎসকদের মতে, এই রোগের সঠিক চিকিৎসা না নিলে হৃদ্রোগ, উচ্চ রক্তচাপ এবং ঘুমের মধ্যে হঠাৎ শ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো সমস্যা বা ‘স্লিপ অ্যাপনিয়া’ দেখা দিতে পারে। দীর্ঘদিন ঋতুস্রাব বন্ধ থাকলে জরায়ুর ভেতরের আস্তরণ পুরু হয়ে গিয়ে জরায়ুর ক্যানসারের ঝুঁকি পর্যন্ত বাড়িয়ে দেয়। মূলত শরীরে পুরুষ হরমোন বা অ্যান্ড্রোজেনের আধিক্য ঘটলে ডিম্বাশয়ের চারপাশে ছোট ছোট অপরিণত থলি তৈরি হয়, যা স্বাভাবিক ডিম্বস্ফোটনে বাধার সৃষ্টি করে এবং একসময় ডিম্বাণু নির্গমন বন্ধ হয়ে যায়। এর ফলে অনিয়মিত ঋতুচক্রের পাশাপাশি বন্ধ্যত্বের মতো জটিল সমস্যাও দেখা দিতে পারে।
কেবল অভ্যন্তরীণ সমস্যাই নয়, এই রোগের বাহ্যিক লক্ষণগুলিও বেশ স্পষ্ট। অনিয়মিত মাসিকের পাশাপাশি অনেক সময় মাসিকে খুব অল্প রক্তপাত হওয়া, মুখমণ্ডল, স্তন বা হাত-পায়ের পাতায় অনাকাঙ্ক্ষিত লোম গজানো এবং দ্রুত ওজন বেড়ে যাওয়া এর অন্যতম প্রধান উপসর্গ। এছাড়া ত্বক অতিরিক্ত তেলতেলে হওয়া, ব্রণর সমস্যা, মাথার চুল পড়া এবং শরীরের বিভিন্ন অংশ যেমন গলা, কুচকি বা স্তনের নিচের ত্বক কালো হয়ে যাওয়া এই রোগেরই সংকেত। এর পাশাপাশি ঘুমের সমস্যা, বিষণ্নতা এবং গর্ভধারণে অক্ষমতাও এই হরমোনজনিত গোলমালের ফলাফল। গবেষকদের আশা, ২০২৮ সালের মধ্যে আন্তর্জাতিক চিকিৎসা নির্দেশিকায় ‘পিএমওএস’ (PMOS) নামটি পুরোপুরি কার্যকর হলে সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়বে। সিস্ট নিয়ে অহেতুক ভীতি কাটিয়ে এবং সঠিক লক্ষণগুলি চিনে সময়মতো চিকিৎসা শুরু করতে পারলে এই দীর্ঘমেয়াদী শারীরিক ও মানসিক জটিলতাগুলো এড়ানো সম্ভব হবে।
