ট্রাইব্যুনালের ঢিমেতালে নাগরিকত্বই প্রমাণ হলো না, তার মাঝেই বাংলায় শুরু ডিটেনশন! ‘বাংলার এটাই কি পরিবর্তন?’ তোপ মহুয়ার

Ealiash Rahaman
By
Ealiash Rahaman
বিগত প্রায় পাঁচ বছর ধরে ডিজিটাল মিডিয়ার কাজের সঙ্গে যুক্ত। দেশ ও বিদেশের সমস্ত রকম খবরাখবর রাখতে ও তা প্রতিবেদন আকারে লিখতে অভ্যস্থ।
6 Min Read
WhatsApp_Group
সব খবর মোবাইলে পেতে Whatsapp গ্রুপে জয়েন্ট করুন

ভোটার তালিকা থেকে যে ২৭ লাখ মানুষের নাম বাদ গিয়েছে, ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে তাঁদের নাম পুনরায় ভোটার তালিকায় ফিরিয়ে আনার জন্য আবেদন করেছেন প্রায় ২৫ লাখ বাদ পড়া ভোটার। কিন্তু নির্বাচন কমিশনের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত মাত্র ৬,৫৮১টি আপিলের বিচার বা নিষ্পত্তি হয়েছে, যা মোট আবেদনের মাত্র শূন্য দশমিক ২৬ শতাংশ।  একদিকে বাদপড়া নাগরিকদের পরিচয় নির্ধারণের এই আইনি প্রক্রিয়া যখন ধীরগতিতে চলছে, ঠিক তখনই
বাংলাদেশি বা রোহিঙ্গা সন্দেহে ধৃতদের রাখার জন্য জেলায় জেলায় ‘হোল্ডিং সেন্টার’ তৈরির নির্দেশ দিল নবান্ন।  এই পরিস্থিতিতে রাজ্যের নতুন বিজেপি সরকারকে তীব্র আক্রমণ করে তৃণমূল সাংসদ মহুয়া মৈত্র।  প্রশ্ন তুলেছেন, এটাই বাংলার কাঙ্ক্ষিত ‘পরিবর্তন’ কি না।

Join WhatsApp Channel Join Now
Telegram Group Join Now

এ দিন কৃষ্ণনগরের তৃণমূল সাংসদ মহুয়া মৈত্র এক্স-এ (টুইটারে) তীব্র ক্ষোভ ও রাগ প্রকাশ করে লিখেছেন, বাংলার নতুন মুখ্যমন্ত্রী এখন প্রতিটি জেলায় আটক কেন্দ্র বা ডিটেনশন ক্যাম্প বানানোর নির্দেশ দিয়েছেন।  অথচ ঠিক এই সময়ে ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া প্রায় ২৭ লাখ মানুষ চিন্তায়-উদ্বেগে দিন কাটাচ্ছেন, তাঁদের ভাগ্যে কী আছে কে জানে।  এমনকি এই অনিশ্চয়তার মধ্যে তাঁদের সব সরকারি সুবিধা-সাহায্য বন্ধ হয়ে যাওয়ারও বড় ভয় তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতি দেখে মহুয়া মৈত্র রাজ্যবাসীর উদ্দেশে সরাসরি প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছেন

বাংলা, তোমরা কি এই বদলটাই চেয়েছিলে?

ক্ষমতায় আসার আগে থেকেই মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ঘোষণা করেছিলেন, ক্ষমতায় এলে বেআইনি অনুপ্রবেশের প্রশ্নে তাঁর সরকার কঠোর অবস্থান নেবে।  এবার সেই কথা মতোই কাজ শুরু করল বাংলার নতুন বিজেপি সরকার।  অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করে ফেরত পাঠানোর নির্দেশিকা আগেই জারি করেছিল কেন্দ্রীয় সরকার।  মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী সম্প্রতি নবান্নে এক সাংবাদিক বৈঠক করে জানান, পূর্বতন সরকার কেন্দ্রের সেই নির্দেশ পালন করেনি।  কিন্তু তাঁর সরকার ক্ষমতায় আসার পর রাজ্যে ওই সংক্রান্ত আইন পুরোপুরি কার্যকর করা হয়েছে।  তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, সিএএ বা নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের অন্তর্ভুক্ত নন যাঁরা, এবার তাঁদের অবিলম্বে চিহ্নিত করে গ্রেফতার করা হবে এবং সরাসরি তুলে দেওয়া হবে সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ এর হাতে। বিএসএফ তাঁদের সংশ্লিষ্ট দেশে ফেরত পাঠানোর কাজ করবে।  মুখ্যমন্ত্রীর এই ঘোষণার পরেই রাজ্য সরকারের তরফে প্রশাসনিক নির্দেশিকা জারি করে দেওয়া হয়েছে।

নবান্নের সেই নির্দেশিকায় বলা হয়েছে,

বাংলাদেশি বা রোহিঙ্গাদের যাঁরা এ রাজ্যে বেআইনি ভাবে বসবাস করতে গিয়ে ধরা পড়েছেন, তাঁদের ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হচ্ছে।  জেলাগুলিতে তার জন্য হোল্ডিং সেন্টার বা আটক কেন্দ্র তৈরি করা হবে।  অবৈধ অনুপ্রবেশকারী এবং এ রাজ্যের জেল থেকে ছাড়া পাওয়া বিদেশি বন্দিদের রাখার জন্য এই সমস্ত সেন্টার ব্যবহার করা হবে।  সেন্টার তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করার নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে।’’

নবান্ন থেকে এই মর্মে নির্দেশিকা পাঠানো হয়েছে রাজ্য পুলিশের ডিজি, প্রত্যেক জেলার জেলাশাসক, পুলিশ সুপার এবং কলকাতা-সহ প্রত্যেক পুলিশ কমিশনারেটের কমিশনারদের কাছে।  নিয়ম অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে আসা বেআইনি অনুপ্রবেশকারী এবং রোহিঙ্গাদের চিহ্নিত করে এই সমস্ত কেন্দ্রে সর্বোচ্চ ৩০ দিন বা এক মাস পর্যন্ত আটকে রাখা যাবে এবং এই সময়ের মধ্যেই জেলাশাসক তাঁদের নাগরিকত্বের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন।

অথচ একই সময়ে এস‌আইআর এর আপিল প্রক্রিয়া প্রায় থেমে রয়েছে।  তথ্য অনুসারে, প্রায় ২৫ লাখ আবেদনের মধ্যে এখনও পর্যন্ত মাত্র ৬,৫৮১টির নিষ্পত্তি হয়েছে, যা মোট আবেদনের মাত্র শূন্য দশমিক ২৬ শতাংশ।  যে কয়েকটি মামলার রায় হয়েছে, তার মধ্যে ৬১.৫ শতাংশ আবেদনকারী (৪,০৪৩ জন) নিজেদের বৈধ নাগরিক বলে প্রমাণ করতে পেরেছেন। মাত্র ১,২৬৭ জনের আবেদন খারিজ হয়েছে এবং বাকি মামলার অবস্থান এখনও স্পষ্ট হয়নি।  এই পরিসংখ্যানই বলে দিচ্ছে যে, বাদ পড়া ভোটারদের এক বিরাট অংশই এ দেশের বৈধ নাগরিক, যাঁরা কেবল কমিশনের ধীর গতির কারণে চরম দুর্ভোগের মুখোমুখি পড়েছে।   এর আগে তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে কোর্টে জানানো হয় বর্তমানে যে গতিতে এই আপিলগুলোর শুনানি বা নিষ্পত্তি চলছে, তাতে এই লাখ লাখ মানুষের আবেদনের ফয়সালা হতে অন্তত ৪ বছর সময় লেগে যাবে।


এছাড়াও বর্তমানে রাজ্য জুড়ে থাকা ১৯টি আপিল ট্রাইব্যুনালে নথিপত্র যাচাই ও শুনানির কাজ চললেও, কত জন শুনানির নোটিশ পেলেন আর কতজনের নাম নতুন করে তালিকায় উঠল, তার কোনো স্পষ্ট তথ্য এখনও প্রকাশ করেনি কমিশন।  ফলে এসআইআর (SIR) প্রক্রিয়ায় নাম বাদ যাওয়ার পর, ট্রাইব্যুনালের দ্বারস্থ হওয়া আবেদনকারী বা তাঁদের আইনজীবীদের অনেকেরই কোনো স্পষ্ট ধারণা নেই যে ভোটার তালিকায় পুনরায় নাম তুলতে ঠিক কী পদ্ধতি মানতে হবে।  এর ওপর আবার নাম ডিলিট হওয়া বহু মানুষের সাথে এখন পর্যন্ত শুনানির বিষয়ে কোনো যোগাযোগই করা হয়নি।

যদিও সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে বিধানসভা নির্বাচনের আগে দুই দফায় কিছু নাম পুনরায় তালিকাভুক্ত করা হয়েছিল। প্রথম দফায় ১৩৯ জনের নাম যুক্ত হয় এবং ৮ জনের নাম বাদ যায়।  দ্বিতীয় দফায়, দ্বিতীয় রাউন্ডের ভোটের ঠিক আগের দিন আরও ১,৪৬৮ জনের নাম তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয় এবং মাত্র ৬ জনের নাম বাদ পড়ে।  কিন্তু এরপর আর কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। নির্বাচন কমিশন এখনও জানায়নি যে, এই দুই দফার পর রাজ্যজুড়ে আর কতজনের নাম ভোটার তালিকায় নতুন করে যুক্ত হয়েছে।এদিকে আরও উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে কলকাতা উত্তর ও দক্ষিণ জেলার আপিল ট্রাইব্যুনালের দায়িত্বে থাকা কলকাতা হাইকোর্টের প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি টি এস শিবজ্ঞানম-এর পদত্যাগ।  তাঁর পদত্যাগের পর এই দুই জেলায় আপিল প্রক্রিয়া আরও ধীর হয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।  বর্তমানে এখানে এখনও ৫১ হাজারের বেশি আবেদন ঝুলে রয়েছে।

Share This Article
বিগত প্রায় পাঁচ বছর ধরে ডিজিটাল মিডিয়ার কাজের সঙ্গে যুক্ত। দেশ ও বিদেশের সমস্ত রকম খবরাখবর রাখতে ও তা প্রতিবেদন আকারে লিখতে অভ্যস্থ।