রাজ্যের ওবিসি (অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণি) সংরক্ষণ ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আনল রাজ্য সরকার। সোমবার বিধানসভায় ওবিসি সংক্রান্ত দুটি গুরুত্বপূর্ণ সংশোধনী বিল পাশ হয়েছে। সরকারের দাবি, কলকাতা হাইকোর্টের রায় মেনেই সংরক্ষণ ব্যবস্থার আইনি অসঙ্গতি দূর করতে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তবে বিরোধীদের অভিযোগ, এই সংশোধনের কোনও বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই এবং এটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
বিধানসভায় ‘দ্য ওয়েস্ট বেঙ্গল ব্যাকওয়ার্ড ক্লাসেস (সংশোধন) বিল, ২০২৬’ এবং ‘দ্য ওয়েস্ট বেঙ্গল কমিশন ফর ব্যাকওয়ার্ড ক্লাসেস (সংশোধন) বিল, ২০২৬’ পেশ করেন অনগ্রসর শ্রেণিকল্যাণ মন্ত্রী গৌরীশঙ্কর ঘোষ। এই বিলের ফলে ১৯৯৩ সালের মূল তালিকায় থাকা ৬৬টি জনগোষ্ঠীই কেবল ওবিসি হিসেবে বহাল থাকছে। এর পরবর্তী সময়ে, অর্থাৎ বামফ্রন্ট সরকারের শেষ দিকে এবং তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের আমলে যে ১১৩টি জনগোষ্ঠীকে ওবিসি তালিকায় যুক্ত করা হয়েছিল, তাদের এই তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। ফলে সরকারি চাকরিতে ওবিসি সংরক্ষণের হার ১৭ শতাংশ থেকে কমে পুনরায় ৭ শতাংশে নেমে এসেছে।
সরকারের বক্তব্য, পশ্চিমবঙ্গে ১৯৯৩ সালে প্রথম ওবিসি তালিকা তৈরি করা হয়েছিল। সেই সময় বিস্তারিত সমীক্ষার ভিত্তিতে ৬৬টি জনগোষ্ঠীকে অনগ্রসর শ্রেণি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। পরে বামফ্রন্ট সরকারের শেষ পর্বে আইনে সংশোধন এনে নতুন কিছু জনগোষ্ঠী যুক্ত করা হয়। পরবর্তীকালে তৃণমূল কংগ্রেস সরকার আরও ১১৩টি জনগোষ্ঠীকে ওবিসি তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে। কিন্তু কলকাতা হাইকোর্ট পর্যবেক্ষণ করে জানায়, এই নতুন অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সামাজিক ও শিক্ষাগত সমীক্ষা, অনুসন্ধান এবং আইনি প্রক্রিয়া যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি। সেই কারণেই আদালত ওই অন্তর্ভুক্তিগুলি বাতিল করে। নব্য বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর জানিয়েছে, আদালতের নির্দেশ কার্যকর করতেই নতুন সংশোধনী আনা হয়েছে।
এছাড়াও নতুন আইনে ১৯৯৩ সালের মূল সমীক্ষাভুক্ত ৬৬টি জনগোষ্ঠীকেই ওবিসি তালিকায় বহাল রাখা হয়েছে। অন্যদিকে বামফ্রন্টের শেষ দিকে এবং তৃণমূল সরকারের আমলে যুক্ত হওয়া ১১৩টি জনগোষ্ঠীকে তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে আইনের শিডিউল-২ এবং শিডিউল-৩ সম্পূর্ণ বাতিল করা হয়েছে। এখন থেকে পশ্চিমবঙ্গ অনগ্রসর শ্রেণি কমিশন আইন, ১৯৯৩ অনুযায়ী যাদের ‘অনগ্রসর শ্রেণি‘ হিসেবে চিহ্নিত করা হবে, তারাই ওবিসি হিসেবে গণ্য হবেন।
এই পরিবর্তনের ফলে রাজ্যে ওবিসি সংরক্ষণের হারেও বড় পরিবর্তন এসেছে। আগে ওবিসি সংরক্ষণ ১৭ শতাংশ ছিল। নতুন সংশোধনের ফলে তা কমে আবার ৭ শতাংশে নেমে এসেছে। সরকার জানিয়েছে, ভবিষ্যতে কোনও নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীকে ওবিসি তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা বা বাদ দেওয়ার আগে পশ্চিমবঙ্গ অনগ্রসর শ্রেণি কমিশন বিস্তারিত সমীক্ষা করবে। বিভিন্ন শ্রেণির সামাজিক ও শিক্ষাগত পশ্চাৎপদতার মাত্রা বিচার করে কমিশন রাজ্য সরকারকে সুপারিশ করবে। সেই সুপারিশের ভিত্তিতেই সংরক্ষণের হার নির্ধারণ করা হবে। তবে আইনে স্পষ্ট বলা হয়েছে, এসসি, এসটি এবং ওবিসি মিলিয়ে মোট সংরক্ষণের পরিমাণ ৫০ শতাংশের বেশি হতে পারবে না।
সংরক্ষণ তালিকার পাশাপাশি সার্টিফিকেট যাচাইয়ের প্রক্রিয়াতেও সরকার কঠোর হচ্ছে। বর্তমানে ওবিসি তালিকায় বহাল থাকা মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে রয়েছে জোলা (আনসারী-মোমিন), ফকির-সাঁই, নস্য-সেখ, পাহাড়িয়া মুসলিম, শেরশাবাদিয়া, হাজ্জাম (মুসলিম) এবং চৌধুলি (মুসলিম)। এছাড়াও কাপালী, বৈশ্য কাপালী, কুর্মি, সূত্রধর, কর্মকার, কুম্ভকার, স্বর্ণকার, তেলী, নাপিত, গোপ, আহির, যাদব, গোয়ালা, ময়রা, মোদক, মালাকার, তাঁতি, কাঁসারী, কেওরি, কাহার, চিত্রকার, ধিমল, গাঙ্গোত, কৈবর্ত-সহ ১৯৯৩ সালের সমীক্ষাভুক্ত অন্যান্য জনগোষ্ঠীও এই তালিকায় বহাল রয়েছে।
বিলের বিরোধিতা করে আইএসএফ বিধায়ক নওশাদ সিদ্দিকি বলেন, এই সংশোধনের কোনও বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই এবং এটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে আনা হয়েছে। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে মন্ত্রী গৌরীশঙ্কর ঘোষ দাবি করেন, কোনও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এই বিল আনা হয়নি। পূর্ববর্তী সরকার ভোটের কথা মাথায় রেখে কিছু জনগোষ্ঠীকে ওবিসি তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছিল। বর্তমান সরকার শুধুমাত্র কলকাতা হাইকোর্টের রায় কার্যকর করতেই এই আইন এনেছে।
এর আগে সরকারের তরফে জানানো হয়, ২০১১ সালের পর থেকে ইস্যু হওয়া প্রায় ১ কোটি ৬৯ লক্ষ এসসি, এসটি ও ওবিসি সার্টিফিকেট ধাপে ধাপে পুনরায় খতিয়ে দেখা হবে। এর মধ্যে ‘দুয়ারে সরকার’ প্রকল্পে দেওয়া ৪৮ লক্ষ সার্টিফিকেটও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এছাড়াও সাম্প্রতিক ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়ায় নাম বাদ পড়া প্রায় ২৭ লক্ষ ব্যক্তির পারিবারিক কাস্ট সার্টিফিকেটও তদন্ত করা হবে। কোনো জালিয়াতি বা অনিয়ম ধরা পড়লে সার্টিফিকেট বাতিল করা হবে এবং আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

