প্যান কার্ড বা ভোটার কার্ড থাকলেই যে ভারতীয় নাগরিকত্বের দাবি প্রমাণিত হয় না, সেই বার্তা দিল গুয়াহাটি হাইকোর্ট। আসামের এক ব্যক্তি নিজের ভারতীয় নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে আদালতে প্যান কার্ড, ভোটার পরিচয়পত্র, ১৯৫১ সালের এনআরসির নথি, জমির দলিল এবং স্কুলের শংসাপত্র-সহ মোট ১৬টি নথি জমা দিয়েছিলেন। কিন্তু আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এই নথিগুলি আইনত নাগরিকত্ব প্রমাণের জন্য যথেষ্ট নয়। ফলে ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালের আগের সিদ্ধান্ত বহাল রেখে হাইকোর্ট ওই ব্যক্তিকে ‘বিদেশি’ (Foreigner) বলে ঘোষণা করেছে।
মামলার আবেদনকারী ছিলেন আমিনুল হক। ২০১৯ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি আসামের কামরূপ জেলার ফরেনার্স ট্রাইব্যুনাল তাঁকে বিদেশি নাগরিক বলে ঘোষণা করেছিল। সেই নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করে তিনি গুয়াহাটি হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন। তাঁর দাবি ছিল, তাঁদের পরিবার বহু প্রজন্ম ধরে ভারতে বসবাস করছে এবং তিনি জন্মসূত্রেই ভারতীয় নাগরিক।
নিজের দাবির সমর্থনে তিনি ১৬টি নথি পেশ করেন। এছাড়াও তিনি তাঁর বাবাকে আদালতে হাজির করেন, যিনি আমিনুল হককে নিজের ছেলে হিসেবে শনাক্ত করেন। তবে আদালত স্পষ্ট জানিয়েছে, শুধু নথি জমা দিলেই বা মৌখিক দাবি করলেই নাগরিকত্ব প্রমাণ হয় না। ১৯৬৪ সালের ফরেনার্স অ্যাক্টের ৯ নম্বর ধারা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তির নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠলে নিজেকে ভারতীয় নাগরিক হিসেবে প্রমাণ করার দায়ভার ওই ব্যক্তির ওপরই বর্তায়। সেই প্রমাণ হতে হবে গ্রহণযোগ্য, নির্ভরযোগ্য এবং আইনের মানদণ্ড অনুযায়ী সন্তোষজনক।
আদালত লক্ষ্য করেছে যে, বিভিন্ন নথিতে আবেদনকারীর বাবার নাম চার ধরনের বানানে লেখা হয়েছে (মহিরুদ্দিন শেখ, মাহরুদ্দিন শেখ, মহিরুদ্দিন এবং মহির উদ্দীন)। যদিও এই বানানগত পার্থক্যকে আদালত বিশেষ গুরুত্ব দেয়নি, তবে মূল সমস্যাটি ছিল আবেদনকারীর সঙ্গে তাঁর বাবা ও দাদুর পারিবারিক যোগসূত্র। আদালত জানিয়েছে, নথি অনুযায়ী মহিরুদ্দিনের বাবার নাম পাসান আলি হলেও, ডোবাকুড়া, ঘুঘুডোবা ও হাসডোবা গ্রামের ভোটার তালিকায় এই তিন ব্যক্তি (পাসান আলি, মহিরুদ্দিন ও আমিনুল হক) ধারাবাহিকভাবে একই পরিবারের সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত ছিলেন—এমন কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ আদালতে পেশ করা যায়নি। এছাড়া, পরিবারটি এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে স্থানান্তরিত হয়েছে বলে দাবি করা হলেও, তার সপক্ষেও কোনো প্রমাণ নেই।
পাশাপাশি, আবেদনকারী ২০১৭ সালে ইস্যু করা স্কুলের যে শংসাপত্রটি জমা দিয়েছিলেন, আদালত তা গ্রহণ করেনি। কারণ, যে ব্যক্তি ওই সার্টিফিকেট দিয়েছিলেন, তিনি আদালতে হাজির হয়ে সেটির সত্যতা নিশ্চিত করেননি।
গত ৩০ জুন হাইকোর্টের বিচারপতি কল্যাণ রাই সুরানা ও বিচারপতি শামিমা জাহানের ডিভিশন বেঞ্চ এই রায়ে জানায়, নাগরিকত্ব প্রমাণের ক্ষেত্রে প্যান কার্ড, ভোটার কার্ড বা এনআরসির নথি থাকলেই হবে না, বরং উপযুক্ত এবং নির্ভরযোগ্য নথিপত্র দেখাতে হবে। কেবল মুখের কথার ওপর ভিত্তি করে পারিবারিক সম্পর্কের আইনি স্বীকৃতি দেওয়া সম্ভব নয়।

