ঐতিহাসিক আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়কে (Aliah University) কেন্দ্র করে এক নজিরবিহীন প্রশাসনিক রদবদলের সিদ্ধান্ত নিল রাজ্য মন্ত্রিসভা। দীর্ঘ আড়াইশো বছরের ঐতিহ্যবাহী এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটিকে আর সংখ্যালঘু উন্নয়ন ও মাদ্রাসা শিক্ষা দফতর এর অধীনে রাখা হচ্ছে না। আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকেই এটি সম্পূর্ণভাবে স্থানান্তরিত হচ্ছে রাজ্যের উচ্চশিক্ষা দফতর-এর (Higher Education Department) অধীনে। সোমবার রাজ্য মন্ত্রিসভার এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকের পর স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এই বড় সিদ্ধান্তের কথা ঘোষণা করেন।
সরকারের এই আকস্মিক ঘোষণার পর থেকেই শিক্ষা এবং রাজনৈতিক মহলে তীব্র শোরগোল পড়ে গিয়েছে। একদিকে যেখানে রাজ্য প্রশাসন একে ‘এক রাজ্য-এক শিক্ষা’ নীতি ও মেধার সমতার এক নতুন অধ্যায় হিসেবে তুলে ধরছে, অন্যদিকে তেমনই এই সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করে ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান ও প্রাক্তন পড়ুয়াদের একাংশ।
বিশ্ববিদ্যালয়ের এই নিয়ন্ত্রণ বদলের পেছনে রাজ্য সরকারের প্রশাসনিক ও নীতিগত অবস্থান অত্যন্ত স্পষ্ট। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানান, জাতীয় শিক্ষানীতির (NEP) মূল ভাবনার সাথে সামঞ্জস্য রেখে রাজ্যে ‘এক রাজ্য-এক শিক্ষা পদ্ধতি’ কার্যকর করা হচ্ছে। শিক্ষাক্ষেত্রে যেকোনো ধরনের ধর্মীয় বিভাজনের বিরোধিতা করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন,
ছাত্রদের পরিচয় কোনো ধর্ম দিয়ে হয় না। তাদের পরিচয় মেধা। আগের সরকার যা করেছিল, ছাত্রদের পরিচয়ে হিন্দু-মুসলমান করা যায় না। আমরা চাই, সংখ্যালঘু-সংখ্যাগুরু সব ছেলেমেয়েরা তাদের মেধায় ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, আইএএস-আইপিএস, ডব্লিউবিসিএস হোক বা সরকারি চাকরিতে সফল হোক। মেধার উত্তরণের যে কাজ আমরা করছি, তাতে কোনো ভেদাভেদ-বৈষম্য থাকবে না। আগের সরকারের সব ভুল এখন সংশোধন হচ্ছে।
মুখ্যমন্ত্রী আরও স্পষ্ট করে দেন যে, ক্লাস ফাইভ থেকে ক্লাস এইট পর্যন্ত শুধু একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের (মুসলিম) ছাত্ররা স্কলারশিপ পাবে—এমন ধর্মীয় বৈষম্য বর্তমান সরকার বরদাস্ত করবে না। তবে মেধার ভিত্তিতে দেশ ও বিদেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের ক্ষেত্রে সরকার সব ধর্মের পড়ুয়াদের সমানভাবে আর্থিক সহযোগিতা করবে। এর পাশাপাশি শিক্ষা ক্ষেত্রের একাধিক স্তরের কর্মীদের বেতন বৃদ্ধির ঘোষণাও এ দিন করা হয়।
এই প্রশাসনিক রদবদলকে আইনি সিলমোহর দিতে আগামী ১০ সেপ্টেম্বর বিধানসভার একটি সংক্ষিপ্ত বিশেষ অধিবেশন ডাকা হয়েছে। সেখানে পাস করানোর জন্য পেশ করা হবে ‘দ্য ওয়েস্ট বেঙ্গল ইউনিভার্সিটি অ্যান্ড কলেজেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অ্যান্ড রেগুলেশন অ্যামেন্ডমেন্ট বিল ২০২৬’ শীর্ষক একটি সংশোধনী বিল।
এই নয়া বিল পাস হলে উচ্চশিক্ষা দফতরের অধীনে থাকা বিভিন্ন college ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, আধিকারিক এবং শিক্ষাকর্মীদের প্রয়োজন অনুযায়ী এক প্রতিষ্ঠান থেকে অন্য প্রতিষ্ঠানে পারস্পরিক বদলি (Inter-Transfer) করতে পারবে রাজ্য সরকার।
আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিকড় জড়িয়ে রয়েছে বাংলার ইতিহাসের সাথে। ১৭৮০-৮১ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আমলে তৎকালীন governor general ওয়ারেন হেস্টিংস ‘ক্যালকাটা মোহামেডান কলেজ’ (কলকাতা মাদ্রাসা) হিসেবে এর পত্তন করেন। মূলত আরবি, ফারসি, ইসলামি ধর্মতত্ত্ব ও আইন পঠনপাঠনের উদ্দেশ্যে তৈরি এই প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘ আড়াইশো বছর ধরে তার নিজস্ব পরম্পরা এবং আধুনিক শিক্ষার মেলবন্ধন ঘটিয়ে এসেছে। ২০০৮ সালে আইন পাস করে একে পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা দেওয়া হয়। বর্তমানে জাতীয় স্তরের শিক্ষাগত মূল্যায়নেও (NAAC) আলিয়া বি+ (B+) গ্রেড পেয়ে নিজের মেধার স্বাক্ষর রেখেছে। সৈয়দ আমীর আলী বা নবাব আবদুল লতীফের মতো মণীষী থেকে শুরু করে বর্তমান সময়ের ভাঙড়ের আইএসএফ (ISF) বিধায়ক নওশাদ সিদ্দিকীও এই বিশ্ববিদ্যালয়েরই প্রাক্তনী।
তবে সরকারের এই নতুন সিদ্ধান্তকে কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সমাজ সহজভাবে মেনে নিতে পারছে না। ইতিমধ্যেই আলিয়ার বর্তমান ও প্রাক্তন ছাত্রছাত্রীদের একাংশ এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে সোশ্যাল মিডিয়া ও ক্যাম্পাসে প্রচার শুরু করেছেন। তাদের মূল স্লোগান—”আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয় বাঁচাতে এক হোন।”
বিক্ষুব্ধ পড়ুয়াদের সাফ দাবি, আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়কে কোনোভাবেই সংখ্যালঘু দফতর থেকে সরানো যাবে না এবং এর ‘সংখ্যালঘু স্ট্যাটাস’ (Minority Status) কেড়ে নেওয়া চলবে না। আন্দোলনকারীদের আশঙ্কা, এই রদবদলের ফলে পিছিয়ে পড়া সংখ্যালঘু সমাজের ছাত্রছাত্রীদের জন্য বরাদ্দ বিশেষ আর্থিক সুবিধা, স্বায়ত্তশাসন এবং বৃত্তির ভবিষ্যৎ অন্ধকারের মুখে পড়তে পারে।
রাজ্য সরকারের সিদ্ধান্তের কঠোর সমালোচনা করেছে অল ইন্ডিয়া সেকুলার ফ্রন্ট (ISF)। বিশ্ববিদ্যালয়টিকে সংখ্যালঘু বিষয়ক ও মাদ্রাসা শিক্ষা দফতরের অধীনেই রাখার দাবি জানিয়েছে দল।
মঙ্গলবার প্রকাশিত এক প্রেস বিবৃতিতে আইএসএফ মুখ্যমন্ত্রীর ‘রাজ্যে একটি শিক্ষা দফতর থাকবে’ যুক্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। দলের বক্তব্য, যদি সমস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে একটি দফতরের অধীনেই রাখতে হয়, তাহলে সরকারি মেডিকেল কলেজগুলি কোন দফতরের অধীনে রয়েছে? কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলিই বা কোন দফতরের অধীনে পরিচালিত হয়?
আইএসএফের দাবি, পশ্চিমবঙ্গের সরকারি মেডিকেল কলেজগুলি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ দফতরের অধীনে পরিচালিত হয়। বিধানচন্দ্র কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও উত্তরবঙ্গ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় রাজ্যের কৃষি দফতরের অধীনে রয়েছে। একইভাবে রাজ্যের প্রাণী ও মৎস্যবিজ্ঞান বিশ্ববিদ্যালয় প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন দফতরের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। দলের অভিযোগ, আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাতন্ত্র্য ও মর্যাদাকে খর্ব করার জন্যই ‘এক শিক্ষা দফতর’-এর যুক্তি সামনে আনা হচ্ছে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, ১৭৮০ সালে প্রতিষ্ঠিত কলকাতা মহামেডান কলেজের ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার বহন করে আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয় বাংলার শিক্ষার ইতিহাসে একটি স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। তাই প্রশাসনিক দফতর বদলের পরিবর্তে বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থসংস্থান, পরিকাঠামো, শিক্ষার মান এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্বায়ত্তশাসন আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন বলে দাবি করেছে আইএসএফ।
দলের পক্ষ থেকে আরও বলা হয়েছে, আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে শিক্ষক, পড়ুয়া, কর্মচারী, প্রাক্তন শিক্ষার্থী এবং অন্যান্য অংশীদারদের সঙ্গে যথাযথ আলোচনা করা উচিত। আইএসএফের বক্তব্য, আলিয়ার ঐতিহ্য ও স্বাতন্ত্র্য বাংলার বহুত্ববাদী শিক্ষাগত ঐতিহ্যেরই অংশ। প্রশাসনিক পুনর্গঠনের নামে সেই স্বাতন্ত্র্যকে কোনওভাবেই দুর্বল করা উচিত নয়।
এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার দাবিতে আইএসএফের চেয়ারম্যান তথা বিধায়ক নওসাদ সিদ্দিকী মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকে চিঠি দিয়েছেন বলে প্রেস বিবৃতিতে জানানো হয়েছে।
ফলে আগামী ১০ সেপ্টেম্বর বিধানসভার বিশেষ অধিবেশনে আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে প্রস্তাবিত সংশোধনী বিল ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্ক আরও তীব্র হতে পারে।

