পশ্চিম এশিয়ার চলমান তীব্র ভূ-রাজনৈতিক সংঘাত এবং আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের লাগামছাড়া মূল্যবৃদ্ধির জেরে ভারতের বাজারে আবারও বড়সড় ধাক্কা খেল জ্বালানির দর। মাত্র ১২ দিনের ব্যবধানে এই নিয়ে চতুর্থবার দেশজুড়ে বৃদ্ধি পেল পেট্রল ও ডিজেলের দাম। সোমবার সকাল থেকে কার্যকর হওয়া নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, দুই জ্বালানির দামই লিটার প্রতি আড়াই টাকারও বেশি বাড়ানো হয়েছে।
সবচেয়ে বেশি লোকসানের মুখে পড়েছে কলকাতার মানুষ। কলকাতায় প্রতি লিটার পেট্রলের দাম এক ধাক্কায় ২ টাকা ৮৭ পয়সা বেড়ে গিয়েছে, যার ফলে এখন ১ লিটার পেট্রল কিনতে খরচ হবে ১১৩ টাকা ৫১ পয়সা।
পেট্রলের পাশাপাশি ডিজেলের দামও লিটার প্রতি ২ টাকা ৮০ পয়সা বাড়ানো হয়েছে। ফলে কলকাতায় এখন ১ লিটার ডিজেলের নতুন দাম দাঁড়িয়েছে ৯৯ টাকা ৮২ পয়সা।
রাজধানী দিল্লিতে পেট্রলের দাম এখন ১০২.১২ টাকা (২.৬১ টাকা বৃদ্ধি) এবং ডিজেল ৯৫.২০ টাকা (২.৭১ টাকা বৃদ্ধি)। মুম্বইয়ে পেট্রল ১১১.২১ টাকা (২.৭২ টাকা বেড়েছে) এবং ডিজেল ৯৭.৮৩ টাকা (২.৮১ টাকা বেড়েছে)। চেন্নাইয়ে পেট্রল ১০৭.৭৭ টাকা (২.৪৬ টাকা বেড়েছে) এবং ডিজেল ৯৯.৫৫ টাকা (২.৫৭ টাকা বেড়েছে)।
গত ১৫ মে প্রথম দফায় এক ধাক্কায় প্রায় ৩ টাকা দাম বাড়ানো হয়। তারপর ১৯ মে দ্বিতীয় দফায় ৯০ পয়সা বৃদ্ধি। গত শনিবার তৃতীয় দফায় আবার ৮৭ থেকে ৯১ পয়সা বাড়ে। আর আজ চতুর্থ দফায় আড়াই টাকারও বেশি বৃদ্ধি। ফলে গত ১২ দিনে পেট্রল-ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি গড়ে সাড়ে সাত টাকারও বেশি বেড়েছে। দীর্ঘ চার বছর ধরে দাম অপরিবর্তিত থাকার পর হঠাৎ এভাবে একের পর এক বৃদ্ধিতে সাধারণ মানুষের মনে চরম উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলার মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে। এই অঞ্চলে ‘স্ট্রেট অফ হরমুজ’ নামে একটা খুব গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ আছে। যার মধ্যে দিয়ে বিশ্বের বড় বড় তেল উৎপাদক দেশগুলোর অনেক তেল এই পথ দিয়েই যায়। যুদ্ধের কারণে সেখানে তেলবাহী জাহাজ চলাচল অনেকটা বিপন্ন হয়ে পড়েছে। যার ফলে এতে বৈশ্বিক জ্বালানি তেলের সরবরাহে বড় ধরনের প্রভাব পড়ে। এবং বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দামও ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়। একপর্যায়ে প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত তেলের দাম ১০০ থেকে ১০২ ডলার ছাড়িয়ে যায়।
দীর্ঘদিন ধরে দেশের বাজারে তেলের দাম অপরিবর্তিত রাখায় রাষ্ট্রায়ত্ত তেল বিপণন সংস্থাগুলো বিপুল লোকসানের মুখে পড়ছিল। সেই লোকসান সামাল দিতেই বাধ্য হয়ে দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। এরই মধ্যে দেশের জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর ঘোষণা এসেছে। গতকাল যেখানে কলকাতায় পেট্রলের দাম ছিল ১১০.৬৪ টাকা, আজ ২.৮৭ টাকা বেড়ে তা দাঁড়িয়েছে ১১৩.৫১ টাকায়। অন্যদিকে, ডিজেলের দাম লিটার প্রতি ২.৮০ টাকা বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে ৯৯.৮২ টাকা।
ভারতের তেল কোম্পানিগুলো (ইন্ডিয়ান অয়েল, বিপিসিএল, এইচপিসিএল) দীর্ঘদিন ধরে দাম না বাড়িয়ে তেল বিক্রি করছিল। এতে প্রতিদিন হাজার কোটি টাকারও বেশি লোকসান হচ্ছিল। সেই লোকসান আর সামলাতে না পেরে বাধ্য হয়ে বারবার দাম বাড়াতে হচ্ছে। পেট্রোলিয়াম মন্ত্রক জানিয়েছে, দেশে তেলের মজুত যথেষ্ট আছে এবং রিফাইনারিগুলো স্বাভাবিকভাবে চলছে।
এ বিষয়ে চুক্তি না হলে দাম সহজে কমবে না, বরং আরও বাড়তে পারে। যতদিন পর্যন্ত এভাবে চলবে এবং হরমুজ প্রণালীতে স্বাভাবিক তেল সরবরাহ শুরু না হবে, ততদিন আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম উঁচুতেই থাকবে। ফলে ভারতেও পেট্রল-ডিজেলের দাম কমানোর সম্ভাবনা খুবই কম। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এবিষয়ে কোনো চুক্তি না হলে আগামী কয়েক সপ্তাহ বা মাসেও দাম কমার সম্ভাবনা নেই। উল্টো আরও এক-দু দফা দাম বাড়তে পারে।
সম্প্রতি ডিজেলের দাম বাড়লে ট্রাক, বাস, লরি চালানোর খরচ বাড়বে। ফলে বাজারে সবজি, দুধ, মাছ-মাংস, চাল, আটা, পাউরুটি সবকিছুর দামই বাড়বে। ইতিমধ্যেই বাসচালক ও লরি মালিকদের সংগঠনগুলো ভাড়া বাড়ানোর দাবি জানাতে শুরু করেছে। অটো এবং অ্যাপ-ক্যাবের ভাড়াও বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দেশবাসীকে তেল বাঁচিয়ে চলার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, সম্ভব হলে বাড়ি থেকে অফিসের কাজ করুন, ব্যক্তিগত গাড়ি কম চালান, প্রয়োজনে অনলাইন ক্লাস চালু রাখুন। অন্যদিকে বিরোধী নেতা রাহুল গান্ধী আগেই বলেছিলেন যে, পাঁচ রাজ্যের নির্বাচন মিটলেই জ্বালানির দাম বাড়ানো হবে।

