রামপুরহাটের প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়ক তথা রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যু ঘিরে চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। রবিবার সকালে রামপুরহাট শহরের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের হাটতলাপাড়ায় তাঁর বাড়ি সংলগ্ন দলীয় কার্যালয় থেকে ঝুলন্ত অবস্থায় তাঁর দেহ উদ্ধার করা হয়। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছয় রামপুরহাট থানার পুলিশ। দেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য রামপুরহাট মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। কী কারণে তাঁর মৃত্যু হল, তা এখনও স্পষ্ট নয়। পুলিশ ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, রবিবার সকাল ৭টা নাগাদ দলীয় কার্যালয়ের ভিতর আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের দেহ দেখতে পাওয়া যায়। শনিবারও ওই কার্যালয়েই স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেছিলেন তিনি। পরের দিন সেখান থেকেই তাঁর দেহ উদ্ধারের ঘটনায় এলাকায় শোকের পাশাপাশি তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন। প্রাথমিক ভাবে ঘটনাটিকে আত্মহত্যা বলে মনে করা হলেও ময়নাতদন্তের রিপোর্ট না আসা পর্যন্ত মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত করে কিছু বলতে চাইছে না পুলিশ।
ঘটনাস্থল থেকে একটি চিঠিও উদ্ধার হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। সেটি আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা ‘সুইসাইড নোট’ কি না, তা পুলিশ খতিয়ে দেখছে। চিঠিতে লেখা রয়েছে, তাঁর মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী নন। নিজের দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন নিয়েও সেখানে আক্ষেপ প্রকাশ করেছেন তিনি। পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদের ভবিষ্যতে রাজনীতিতে না জড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন বলে জানা গিয়েছে।
চিঠিতে আশিস দাবি করেছেন, ছাত্রজীবন থেকেই তিনি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকলেও কখনও কোনও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন না। বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক থাকার সময়ও কোনও অনিয়মে যুক্ত হননি বলে উল্লেখ করেছেন তিনি। দলীয় স্তরে নানা বিষয়ে মতবিরোধ হলেও তা কখনও ব্যক্তিগত শত্রুতায় পরিণত হয়নি বলেও চিঠিতে দাবি করা হয়েছে। দলের কোনও কোনও সিদ্ধান্ত বা অন্যায় মেনে নিতে না পারলেও প্রকাশ্যে তার প্রতিবাদ করতে পারেননি এমন কথাও তিনি লিখেছেন বলে জানা গিয়েছে।
তবে চিঠিতে কোনও নির্দিষ্ট ব্যক্তির নাম করে অভিযোগ করা হয়নি। কে বা কারা তাঁকে অপমান করার চেষ্টা করেছিলেন, সে বিষয়েও স্পষ্ট করে কিছু উল্লেখ নেই বলে জানা গিয়েছে। চিঠিটি সত্যিই আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা কি না, সেটিও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। পুলিশ চিঠির হাতের লেখা-সহ অন্যান্য তথ্য পরীক্ষা করছে। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট এবং তদন্তের পরই মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যাবে।
আশিস বন্দ্যোপাধ্যায় রামপুরহাটের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক নেতা ছিলেন। ২০০১ সাল থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত টানা পাঁচ বার রামপুরহাটের বিধায়ক নির্বাচিত হন তিনি। তৃণমূল কংগ্রেস রাজ্যে ক্ষমতায় আসার পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মন্ত্রিসভায়ও দায়িত্ব পান। স্কুলশিক্ষা ও কৃষি দফতরের মন্ত্রীর দায়িত্ব সামলানোর পাশাপাশি ২০২১ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার ডেপুটি স্পিকার ছিলেন তিনি।
২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে রামপুরহাট কেন্দ্রে বিজেপি প্রার্থী ধ্রুব সাহার কাছে পরাজিত হন আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে এই প্রথম বিধানসভা নির্বাচনে পরাজয়ের পর তাঁকে সক্রিয় রাজনীতিতে তুলনামূলক ভাবে কম দেখা যাচ্ছিল বলে স্থানীয় সূত্রের দাবি।
ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়তেই দলীয় নেতা-কর্মী ও অনুগামীরা তাঁর বাড়ি এবং দলীয় কার্যালয়ের সামনে ভিড় করেন। পুলিশ গোটা ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে। মৃতদেহ ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে। মৃত্যুর আগে লেখা চিঠির বিষয়বস্তু, তাঁর সাম্প্রতিক মানসিক অবস্থা এবং মৃত্যুর আগের সময়ের ঘটনাক্রম সব দিকই খতিয়ে দেখছে তদন্তকারীরা।
প্রবীণ এই নেতার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন তৃণমূলের একাধিক নেতা। অনুব্রত মণ্ডলও আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যুর ঘটনায় শোক প্রকাশ করে বলেন, তিনি আশিসবাবুকে দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত বলে মনে করেন না। কেন তিনি এমন সিদ্ধান্ত নিলেন, তা বুঝতে পারছেন না বলেও মন্তব্য করেন অনুব্রত।


