রাজ্যে ২০১১ সাল থেকে ইস্যু হওয়া জাতিগত শংসাপত্র বা কাস্ট সার্টিফিকেট পুনরায় যাচাইয়ের জন্য রাজ্য সরকারের জারি করা বিজ্ঞপ্তির উপর অন্তর্বর্তী স্থগিতাদেশ জারি করল কলকাতা হাই কোর্ট। ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি তপোব্রত চক্রবর্তী এবং বিচারপতি অরিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ডিভিশন বেঞ্চ জানিয়ে দিয়েছে, শুধুমাত্র ১৪ মের সরকারি বিজ্ঞপ্তির ভিত্তিতে রাজ্যজুড়ে এসসি, এসটি এবং ওবিসি শংসাপত্রের ব্যাপক পুনঃযাচাই করা যাবে না। তবে কোনও নির্দিষ্ট অভিযোগ সামনে এলে, প্রচলিত আইন মেনে সংশ্লিষ্ট আধিকারিকরা সেই অভিযোগের ভিত্তিতে শংসাপত্র যাচাই করে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন।
মামলার সূত্রপাত রাজ্য সরকারের ১৪ মে’র বিজ্ঞপ্তিকে কেন্দ্র করে। ওই বিজ্ঞপ্তিতে ২০১১ সাল থেকে ইস্যু হওয়া প্রায় ১ কোটি ৬৯ লক্ষ জাতিগত শংসাপত্র পুনরায় যাচাইয়ের কথা বলা হয়েছিল। বিশেষ করে ‘দুয়ারে সরকার’ শিবিরের মাধ্যমে দেওয়া শংসাপত্রগুলির একটি বড় অংশ ভুয়ো বা অনিয়মের মাধ্যমে দেওয়া হয়ে থাকতে পারে বলে বর্তমান রাজ্য সরকারের তরফে বারবার দাবি করা হয়েছিল। ক্ষমতায় আসার পর মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীও জানিয়েছিলেন, ২০১১ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত পূর্ববর্তী তৃণমূল সরকারের আমলে দেওয়া সমস্ত এসসি, এসটি এবং ওবিসি শংসাপত্র পুনরায় যাছাই বাছাই করে দেখা হবে।
রাজ্যের এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে কলকাতা হাই কোর্টে মামলা দায়ের হয়। মামলাকারীর হয়ে সওয়াল করেন সিনিয়র আইনজীবী বিকাশ রঞ্জন ভট্টাচার্য। তাঁর যুক্তি, কোনও নির্দিষ্ট ব্যক্তির কাস্ট সার্টিফিকেট নিয়ে অভিযোগ উঠলে আইন মেনে সেটি যাচাই করা যেতে পারে। কিন্তু শুধু একটি সরকারি বিজ্ঞপ্তির ভিত্তিতে ২০১১ সাল থেকে দেওয়া সমস্ত কাস্ট সার্টিফিকেট একসঙ্গে ফের যাচাই করা যায় না। তিনি আদালতে প্রশ্ন তোলেন, অভিযোগ থাকলে সেই নির্দিষ্ট সার্টিফিকেট যাচাই না করে কেন ২০১১ সাল থেকে দেওয়া সব শংসাপত্রকে নতুন করে যাচাইয়ের আওতায় আনা হবে?
রাজ্যের অ্যাডভোকেট জেনারেল সুরজিৎ নাথ মিত্র আদালতে জানান, ২০১১ সাল থেকে দেওয়া কিছু কাস্ট সার্টিফিকেট ভোটার কার্ডের মতো ডকুমেন্টের উপর ভিত্তিতে তৈরি হয়েছে। তাই ওই শংসাপত্রগুলির ক্ষেত্রে নথিপত্র ঠিক আছে কি না, তা ফের পরীক্ষা করার প্রয়োজন হতে পারে। তবে আধার, প্যান কার্ড বা অন্য বৈধ নথির ভিত্তিতে দেওয়া কাস্ট সার্টিফিকেটগুলি একইভাবে যাচাই করা হবে কি না, তা নিয়ে আলাদা বিষয় রয়েছে বলে আদালতে জানায় রাজ্য।
এখানেই এসআইআর এর প্রসঙ্গ ওঠে। আদালত স্পষ্ট করে দেয়, এসআইআর এ কারও নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে বলেই তাঁর কাস্ট সার্টিফিকেট বাতিল করে দেওয়া যাবে না। কাস্ট সার্টিফিকেট বাতিল করতে হলে নির্দিষ্ট আইন ও নিয়ম মেনেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। অর্থাৎ, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়া এবং কাস্ট সার্টিফিকেট বাতিল হওয়া দুটি বিষয়কে সরাসরি এক করে দেখা যাবে না।
মামলাকারীর আইনজীবী বিকাশ রঞ্জন ভট্টাচার্যও বলেন, কোনও নির্দিষ্ট কাস্ট সার্টিফিকেট নিয়ে অভিযোগ থাকলে প্রশাসন অবশ্যই তা তদন্ত করতে পারে। কিন্তু কোনও অভিযোগ ছাড়াই ২০১১ সাল থেকে দেওয়া লক্ষ লক্ষ শংসাপত্র একসঙ্গে যাচাই শুরু করলে সাধারণ মানুষের মধ্যে অযথা আতঙ্ক ও সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে।
শেষ পর্যন্ত আদালত স্পষ্ট করে দেয় কোনও নির্দিষ্ট কাস্ট সার্টিফিকেট নিয়ে অভিযোগ থাকলে সেটি আইন মেনে যাচাই করা যাবে। কিন্তু শুধু গত ১৪ মে-র সরকারি বিজ্ঞপ্তির ভিত্তিতে ২০১১ সাল থেকে দেওয়া সমস্ত এসসি, এসটি এবং ওবিসি শংসাপত্র একসঙ্গে পুনরায় যাচাই করা যাবে না। এই সার্বিক পুনঃযাচাইয়ের উপর আপাতত স্থগিতাদেশ থাকবে।
এছাড়াও এদিনের রায়ে কাস্ট সার্টিফিকেট যাচাই পুরোপুরি বন্ধ করেনি হাই কোর্ট। কোনও নির্দিষ্ট সার্টিফিকেট নিয়ে অভিযোগ থাকলে তার তদন্ত করবে রাজ্য । তবে রাজ্য যে ভাবে ২০১১ সাল থেকে দেওয়া সমস্ত কাস্ট সার্টিফিকেট একসঙ্গে যাচাই করতে চেয়েছিল, সেই প্রক্রিয়াতেই আপাতত আদালত স্থগিতাদেশ পড়লো।

