দীর্ঘ কয়েক মাসের প্রচার, রাজনৈতিক উত্তাপ আর জনসভার পালা শেষ। এবার রায় দেওয়ার পালা ইভিএম-এর। আগামীকাল, ৪ মে সোমবার সকাল ৮টা থেকে শুরু হচ্ছে পশ্চিমবঙ্গ, কেরালা, আসাম, তামিলনাড়ু এবং পুদুচেরি’র এই পাঁচ রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনের ভোটগণনা। ৮২৪টি আসনের এই যুদ্ধে কার ভাগ্যে শিকে ছিঁড়বে, তা স্পষ্ট হতে শুরু করবে বেলা ১০টার পর থেকেই।
পশ্চিমবঙ্গ: আগামীকাল বাংলার রাজনীতির এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। ফলতা বিধানসভা কেন্দ্র বাদে বাকি ২৯৩টি আসনের ভাগ্য নির্ধারিত হতে চলেছে। শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস কি জয়ের ধারা বজায় রেখে টানা চতুর্থবার নবান্নের দখল নেবে? নাকি বাংলার মসনদে এবার পরিবর্তনের হাওয়া বইবে এবং গেরুয়া শিবিরের দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটবে?
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে তৃণমূল কংগ্রেস ২০১১, ২০১৬ এবং ২০২১—টানা তিনবার বিপুল জনসমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় এসেছে। এবারের লড়াই তাদের কাছে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে তৃণমূল কংগ্রেস ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’ ও বিভিন্ন জনমুখী প্রকল্পের ওপর ভর করে জয়ের বিষয়ে আত্মবিশ্বাসী। অন্যদিকে, দুর্নীতি ইস্যু ও মেরুকরণের রাজনীতিকে হাতিয়ার করে পরিবর্তনের ডাক দিয়েছে বিজেপি। বিভিন্ন বুথফেরত সমীক্ষায় (Exit Polls) হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের ইঙ্গিত মিলেছে। কোনো সমীক্ষায় বিজেপিকে সামান্য এগিয়ে রাখা হলেও, অন্যগুলোতে তৃণমূলকে ম্যাজিক ফিগার ১৪৮-এর ওপরে রাখা হয়েছে। এবং এবারের নির্বাচনে কংগ্রেস ও বামপন্থীরা নিজেদের জমি ফিরে পেতে মরিয়া। তরুণ মুখদের পাশাপাশি অভিজ্ঞ নেতাদের লড়াইয়ে ফিরিয়ে এনেছে তারা। বিশেষ করে মুর্শিদাবাদ ও মালদার মতো জেলাগুলোতে কংগ্রেসের ফলাফল কিং-মেকার হওয়ার পথে বড় ভূমিকা নিতে পারে। পাশাপাশি, পীরজাদা আব্বাস সিদ্দিকীর ও নাওসাদ সিদ্দিকীর দল ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্ট (ISF) এবার দক্ষিণবঙ্গের বেশ কিছু আসনে তৃণমূল ও বিজেপি উভয় শিবিরের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সংখ্যালঘু ও পিছিয়ে পড়া শ্রেণির ভোট কোন দিকে গেল, তার ওপর আইএসএফ-এর সাফল্য নির্ভর করছে।
এছাড়াও হুমায়ুন কবিরের নেতৃত্বাধীন আম জনতা উন্নয়ন পার্টিও এবার বেশ কিছু আসনে শক্তিশালী প্রার্থী দিয়ে আলোচনায় এসেছে। বিশেষ করে মুর্শিদাবাদ ও সংলগ্ন এলাকায় তাদের প্রভাব ভোটের সমীকরণ বদলে দিতে পারে। যদিও ২০১৯-এর লোকসভা নির্বাচন এবং ২০২১-এর বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি শক্তিশালী বিরোধী পক্ষ হিসেবে উঠে এসেছে। তৃণমূলকে হঠিয়ে বাংলা জয়ের যে দীর্ঘ প্রতীক্ষা গেরুয়া শিবিরের রয়েছে, তা বাস্তবায়িত হবে কি না, তা কাল দুপুরের মধ্যেই স্পষ্ট হতে শুরু করবে।
কেরালা: কেরালার ১৪০টি আসনে লড়াই মূলত বাম গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট (LDF) এবং কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউডিএফ (UDF) এর মধ্যে। মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়ন তাঁর সরকারের উন্নত স্বাস্থ্য পরিষেবা ও চরম দারিদ্র্য দূরীকরণের সাফল্যকে হাতিয়ার করে টানা তৃতীয়বার জয়ের ‘হ্যাটট্রিক’ করতে মরিয়া। তবে অ্যাক্সিস মাই ইন্ডিয়া এবং ম্যাট্রাইজের মতো অধিকাংশ এগজিট পোল এবার কেরালায় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছে। তাদের মতে, ইউডিএফ ৭০ থেকে ৯০টি আসন পেয়ে ক্ষমতায় ফিরতে পারে। যদিও এলডিএফ-এর দাবি, উন্নয়নের ধারা বজায় রাখতে কেরালার মানুষ আবারও লাল নিশানকেই বেছে নেবেন। সেখানে বিজেপির ভোট শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়া বা না পাওয়ার ওপর অনেক সমীকরণ নির্ভর করছে।
আসাম: আসাম বিধানসভার ১২৬ সদস্য নির্বাচনের জন্য ৯ এপ্রিল ২০২৬ এ আসামে বিধানসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এই ১২৬টি আসনের এই লড়াইয়ে মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মার নেতৃত্বে বিজেপি টানা তৃতীয়বার ক্ষমতায় ফেরার লক্ষ্যে ময়দানে নেমেছে।
অধিকাংশ বুথফেরত সমীক্ষাই (Exit Polls) রাজ্যে পুনরায় বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ সরকারের ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিশেষ করে অ্যাক্সিস মাই ইন্ডিয়া-র মতো সংস্থাগুলো এনডিএ-কে ৮৮ থেকে ১০০টি আসনের আভাস দিয়েছে, যা নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার (৬৪ আসন) চেয়ে অনেক বেশি। অন্যদিকে, কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট বা ‘ইউনাইটেড অপজিশন ফোরাম‘ ২৪ থেকে ৩৬টি আসনেই থমকে যেতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। বিজেপি সরকার তাদের প্রচারে মূলত ‘ডবল ইঞ্জিন’ সরকারের উন্নয়ন এবং পরিকাঠামো নির্মাণকে হাতিয়ার করেছে। তবে বিরোধী শিবির থেকে ‘অনুপ্রবেশ‘ এবং ভোটার তালিকায় বিতর্কিত বিভাজনের রাজনীতির যে অভিযোগ তোলা হয়েছে, বিজেপি তা অস্বীকার করে কর্মসংস্থান ও উন্নয়নের দাবিতেই অনড় থেকেছে। এবার ৮৫ শতাংশের ওপর রেকর্ড ভোটদান হয়েছে। আসামের ভৌগোলিক বিন্যাস অনুযায়ী, উচ্চ আসাম এবং বরাক উপত্যকার ফলাফল বিজেপির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিপরীতে লোয়ার আসামে এআইইউডিএফ (AIUDF) এবং কংগ্রেসের ভোট ভাগাভাগি শেষ পর্যন্ত কার সুবিধা করে দেবে, তা কাল দুপুরের মধ্যেই স্পষ্ট হয়ে যাবে।
তামিলনাড়ু: তামিলনাড়ুর ২৩৪টি আসনে এবার লড়াই মূলত ত্রিমুখী। মুখ্যমন্ত্রী এম.কে. স্ট্যালিনের ডিএমকে সরকারের সামনে প্রধান বিরোধী শক্তি এডিএমকে। তবে এবারের ভোটে নজর রয়েছে অভিনেতা বিজয়ের রাজনৈতিক দল ‘টিভিকে’ (TVK) র ওপর। বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের মধ্যে বিজয়ের জনপ্রিয়তা বড় কোনো চমক দিতে পারে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। স্ট্যালিনের ছেলে উদয়নিধি স্ট্যালিনের নেতৃত্ব এবং ডিএমকে র আসন সমঝোতা কংগ্রেস ও বামপন্থীদের সাথে কতটা সফল হলো, তা আগামীকালই স্পষ্ট হবে।
পুদুচেরি: কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল পুদুচেরির ৩০টি আসনেও আগামীকাল ভাগ্য নির্ধারণ হবে। এখানে এন. রাঙাস্বামীর নেতৃত্বাধীন এনআর কংগ্রেস ও বিজেপির জোট ক্ষমতায় ফেরার লড়াই চালাচ্ছে। বুথফেরত সমীক্ষাগুলো বলছে, এনডিএ জোট ১৬ থেকে ১৯টি আসন পেয়ে ক্ষমতা ধরে রাখতে পারে। তবে কংগ্রেস ও ডিএমকে জোট এবং বিজয়ের নবাগত টিভিকে (TVK) এখানে কড়া টক্কর দিচ্ছে।

