SIR বা ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অবস্থানকে পুরোপুরি মান্যতা দিল দেশের শীর্ষ আদালত। বুধবার সুপ্রিম কোর্টের পক্ষ থেকে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, ভোটার তালিকা থেকে অযোগ্য, ভুয়ো এবং মৃত ব্যক্তিদের নাম বাদ দেওয়া কোনওভাবেই বেআইনি বা অসাংবিধানিক নয়। বরং দেশে একটি অবাধ, শান্তিপূর্ণ এবং সুষ্ঠু নির্বাচন প্রক্রিয়া সুনিশ্চিত করার স্বার্থে এই পদক্ষেপ অত্যন্ত প্রয়োজনীয় এবং সম্পূর্ণ সংবিধানসম্মত। প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত এবং বিচারপতি জয়মাল্য বাগচীর ডিভিশন বেঞ্চ বিরোধীদের আনা সমস্ত অভিযোগ ও আপত্তি খারিজ করে নির্বাচন কমিশনের বিশেষ ভোটার তালিকা পর্যালোচনা বা ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ (SIR) প্রক্রিয়াকে আইনিভাবে বৈধ বলে ঘোষণা করেছে।
এই আইনি লড়াইয়ের সূত্রপাত হয়েছিল মূলত বিহার এবং পশ্চিমবঙ্গকে কেন্দ্র করে। বিহার বিধানসভা নির্বাচনের আগে নির্বাচন কমিশন সেখানে প্রথম এই বিশেষ পর্যালোচনা বা SIR প্রক্রিয়া চালু করে। এর জেরে রাজ্যটি থেকে মৃত এবং ভুয়ো ভোটারসহ প্রায় ৬০ লক্ষ নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়। একইভাবে, পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের ঠিক আগেও তড়িঘড়ি এই একই নিয়ম প্রয়োগ করে প্রায় ৯০ লক্ষ নাম ভোটার তালিকা থেকে মুছে ফেলা হয়েছিল।
তৃণমূল কংগ্রেসসহ দেশের একাধিক বিরোধী দল এই প্রক্রিয়ার তীব্র বিরোধিতা করে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিল। তাদের অভিযোগ ছিল, নির্বাচনের মুখে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এবং প্রকৃত ভোটারদের বিপাকে ফেলতেই কমিশন এই পদক্ষেপ নিয়েছে। এই প্রক্রিয়ার ওপর স্থগিতাদেশ জারির দাবিও জানানো হয়েছিল। তবে শীর্ষ আদালত আজ বিরোধীদের সেই সমস্ত আশঙ্কা ও যুক্তি পুরোপুরি খারিজ করে দিয়েছে।
আদালত তার রায়ে স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, দেশের সংবিধানের ৩২৪ নম্বর অনুচ্ছেদ এবং ১৯৫০ সালের জনপ্রতিনিধিত্ব আইন নির্বাচন কমিশনকে ভোটার তালিকা তৈরি ও সংশোধনের ক্ষেত্রে অত্যন্ত ব্যাপক ক্ষমতা দিয়েছে। সাধারণ সংশোধন প্রক্রিয়ার থেকে এই বিশেষ নিবিড় সংশোধনের পদ্ধতি কিছুটা আলাদা হলেও, শুধুমাত্র সেই কারণে একে ‘আইনবহির্ভূত’ বা ‘বাতিলযোগ্য’ বলা যায় না। আইন নিজেই কমিশনকে যেকোনো সময় ভোটার তালিকা পুনর্বিবেচনা করার এবং সেই কাজ নিজের মতো করে পরিচালনা করার পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছে। ফলে এই রায় নির্বাচন কমিশনের জন্য এক মস্ত বড় জয়। আদালতের এই সবুজ সংকেতের পর দেশজুড়ে চলমান SIR-এর কাজ একইভাবে জারি থাকবে। আগামী ৩০ মে থেকে দেশের ১৬টি রাজ্য এবং ৩টি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে এই প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত পর্যায়ের কাজ শুরু হতে চলেছে।
এদিন সুপ্রিম কোর্ট পরিষ্কার জানিয়েছে, এই সংশোধনের ক্ষেত্রে ভোটারদের অধিকারকে কোনোভাবেই খর্ব করা হয়নি। তালিকায় নাম থাকা বা বাদ যাওয়ার বিষয়ে ভোটারদের আগে থেকে নোটিস পাওয়া এবং শুনানিতে নিজের বক্তব্য পেশ করার অধিকার বজায় রাখা হয়েছে। নথিপত্র যাচাইয়ের যে নিয়ম কমিশন তৈরি করেছে, তা সম্পূর্ণ যুক্তিসঙ্গত।
এই প্রক্রিয়ায়, যাদের নাম ২০০২ বা ২০০৩ সালের ভোটার তালিকায় ছিল না, তাদের পুরনো তালিকার কোনো সদস্যের সঙ্গে সম্পর্ক প্রমাণের জন্য নির্দিষ্ট কিছু নথিপত্র জমা দিতে বলা হয়েছিল। শুরুতে নির্বাচন কমিশন এই কাজের জন্য আধার কার্ডকে প্রমাণ হিসেবে মানতে না চাইলেও, সুপ্রিম কোর্ট সাধারণ মানুষের সুবিধার্থে আধার কার্ডকেও বৈধ নথির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার নির্দেশ দিয়েছে। একই সঙ্গে আদালত জানিয়েছে, যদি কোনো যোগ্য ব্যক্তির নাম ভুলবশত বাদও চলে যায়, তবে তিনি পুনরায় আবেদন করার সুযোগ পাবেন এবং কমিশনকে তা গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখতে হবে।
এছাড়াও এদিন সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছে, নাম বাদ যাওয়া মানেই নাগরিকত্ব চলে যাওয়া নয়। এছাড়াও এও জানান, কারও নাগরিকত্ব নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার কোনো এক্তিয়ার বা আইনি ক্ষমতা নির্বাচন কমিশনের নেই। সেই সিদ্ধান্ত নেবেন নাগরিকত্ব আইন অনুযায়ী নির্ধারিত দেশের নির্দিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষ।
নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা শুধুই ভোটার তালিকায় নাম রাখা বা বাদ দেওয়ার প্রশ্ন পর্যন্ত সীমাবদ্ধ। ফলে ভোটার তালিকা থেকে কারও নাম বাদ যাওয়া মানেই কিন্তু তাকে বিদেশি বা অভারতীয় নাগরিক ঘোষণা করা নয়। কমিশনের এই যাচাইকরণের একমাত্র উদ্দেশ্য হলো নির্বাচনী ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ ত্রুটিমুক্ত ও স্বচ্ছ রাখা, যাতে কোনো ভুয়ো ব্যক্তি ভোট দিতে না পারেন।

