কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দেওয়ার প্রায় দুই সপ্তাহ পর মুখ খুললেন প্রাক্তন কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান। নিট (NEET) পরীক্ষা নিয়ে দেশজুড়ে তৈরি হওয়া বিতর্ক এবং পড়ুয়াদের আন্দোলনের সময় কেন তিনি পদ ছেড়েছিলেন, শনিবার তার কারণ ব্যাখ্যা করেন তিনি। ওড়িশার ভুবনেশ্বরের জিএম বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি অনুষ্ঠানে পড়ুয়া ও শিক্ষকদের সামনে বক্তব্য রাখার সময় নিজের পদত্যাগ নিয়ে মুখ খোলেন সম্বলপুরের বিজেপি সাংসদ।
ধর্মেন্দ্র প্রধানের দাবি করেন, নিট নিয়ে আন্দোলনের সময় বর্তমান প্রজন্মের তরুণদের, যাদের ‘জেন-জি’ বলা হয়, তাঁদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করা হয়েছিল। সেই পরিস্থিতিতে দেশের পড়ুয়াদের ভবিষ্যৎ এবং তাঁদের আকাঙ্ক্ষার কথা মাথায় রেখেই তিনি কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।
ধর্মেন্দ্র বলেন, “জেন-জি আমাদের সন্তান। কিছু মানুষ তাঁদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছিল। তখন আমার কোনও ব্যক্তিগত সমস্যা ছিল না। পদ আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল না।”
তিনি বলেন, ভারতে প্রতি বছর প্রায় দুই কোটি শিশুর জন্ম হয়। গত ১০ বছরে প্রায় ২০ কোটি শিশুর জন্ম হয়েছে। এই প্রজন্মের তরুণদের নিজেদের লক্ষ্য ও আকাঙ্ক্ষা রয়েছে। তাঁরাই ভবিষ্যতে ভারতকে ‘বিশ্বগুরু’ হিসেবে গড়ে তুলবে বলে মন্তব্য করেন প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী।
ধর্মেন্দ্র জানান, এই পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখেই তিনি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কাছে গিয়ে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তাঁর বক্তব্য, ব্যক্তিগত কোনও কারণে নয়, বরং দেশের তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যতের কথা ভেবেই তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।
গত ২৫ জুলাই কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দেন ধর্মেন্দ্র প্রধান। নিট পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে প্রশ্নফাঁস ও অনিয়মের অভিযোগের পর দেশজুড়ে পড়ুয়াদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল। দিল্লির যন্তর মন্তরেও শুরু হয়েছিল বিক্ষোভ। আন্দোলনকারীদের অন্যতম দাবি ছিল ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ।
ইস্তফার আগে আন্দোলন ঘিরে তৈরি হওয়া পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন ধর্মেন্দ্র। তাঁর বক্তব্য ছিল, কোনও মেধাবী পড়ুয়ার ভবিষ্যৎ নষ্ট হতে দেওয়া যাবে না এবং কোনও পড়ুয়ার সঙ্গে অন্যায় হওয়া উচিত নয়। যন্তর মন্তর-সহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় তৈরি হওয়া পরিস্থিতির কারণে তিনি ব্যথিত বলেও জানিয়েছিলেন।
এ দিন নিজের পদত্যাগের কারণ ব্যাখ্যা করার পাশাপাশি ওড়িশায় তাঁকে ঘিরে হওয়া বিক্ষোভ নিয়েও মুখ খোলেন ধর্মেন্দ্র। ভুবনেশ্বর বিমানবন্দরের কাছে বিজেডির যুব ও ছাত্র সংগঠনের কর্মীরা তাঁকে লক্ষ্য করে ‘গো ব্যাক’ স্লোগান দিয়েছিলেন। সেই প্রসঙ্গে ধর্মেন্দ্র বলেন, তিনি এই ধরনের বিক্ষোভে ভয় পান না।
তাঁর কথায়, “আমি এক কৃষকের সন্তান। আপনারা যদি আমাকে ফিরে যেতেও বলেন, আমি আবার আসব।”
এর পরেই ওড়িশার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী এবং বিজু জনতা দল (বিজেডি)-র সভাপতি নবীন পট্টনায়েককে নিশানা করেন ধর্মেন্দ্র। তাঁর দাবি, নবীন পট্টনায়েক তাঁকে ওড়িশার মানুষের জন্য লজ্জার কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। ধর্মেন্দ্র প্রশ্ন তোলেন, “আমি কি কখনও এমন কিছু করেছি, যা ওড়িশার মানুষকে লজ্জিত করবে?” সভায় উপস্থিত মানুষজন তাঁর প্রশ্নের জবাবে সমস্বরে ‘না’ বলে সাড়া দেন।
ধর্মেন্দ্র আরও বলেন, “আমি হয়তো রাজ্যের জন্য বিশেষ কোনও গৌরব বয়ে আনছি না, কিন্তু আমার কাজের মাধ্যমে এখানকার মানুষকে কখনও অসম্মানিত করিনি। রাজ্যের সুনাম ক্ষুণ্ণ হয় এমন কোনও কাজ আমি কখনও করব না।”
তবে ধর্মেন্দ্রের এই বক্তব্যের পাল্টা জবাব দিয়েছে বিজেডি। দলের সম্বলপুর জেলা সভাপতি তথা প্রাক্তন মন্ত্রী রোহিত পূজারি দাবি করেন, ধর্মেন্দ্রকে কেউ হেয় করেনি। বরং নিট আন্দোলনের সময় পড়ুয়াদের বিরুদ্ধে পুলিশের পদক্ষেপের কারণেই তিনি সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন।
রোহিতের অভিযোগ, যন্তর মন্তরে শান্তিপূর্ণ ছাত্র আন্দোলনের সময় পুলিশ লাঠিচার্জ, কাঁদানে গ্যাস এবং দমনমূলক পদক্ষেপ করেছিল। তাঁর প্রশ্ন, আন্দোলনরত পড়ুয়াদের উপর পুলিশের পদক্ষেপের জন্য ধর্মেন্দ্র কেন নবীন পট্টনায়েককে দায়ী করছেন।
বিজেডি নেতার আরও দাবি, নিট নিয়ে তৈরি হওয়া পরিস্থিতির জন্য বিজেপি সরকারের নীতিই দায়ী এবং সেই কারণেই ধর্মেন্দ্র প্রধানের বিরুদ্ধে ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল।
এ দিকে ধর্মেন্দ্রকে ঘিরে বিক্ষোভ আরও বাড়তে পারে, এমন আশঙ্কায় সম্বলপুর পুলিশ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেয় বলে খবর। সূত্রের দাবি, বিজেডির যুব ও ছাত্র সংগঠনের কর্মীদের বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রায় ৩০ জন বিজেডি কর্মীকে আটক করা হয়েছিল।
নিট আন্দোলন, পড়ুয়াদের বিক্ষোভ এবং নিজের পদত্যাগ নিয়ে এত দিন প্রকাশ্যে বিস্তারিত মন্তব্য করেননি ধর্মেন্দ্র প্রধান।

