ইসলাম গ্রহণের পর দুই মেয়েকে ঘর বন্দি করে রাখার অভিযোগ, বাবার সঙ্গে ২৫ লাখ টাকা দিতে হবে উত্তরপ্রদেশ সরকারকেও

ধর্মান্তর নিয়ে তদন্ত চলতেই পারে, কিন্তু প্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে আটকে রাখা যায় না, জানাল এলাহাবাদ হাইকোর্ট

Ealiash Rahaman
By
Ealiash Rahaman
বিগত প্রায় পাঁচ বছর ধরে ডিজিটাল মিডিয়ার কাজের সঙ্গে যুক্ত। দেশ ও বিদেশের সমস্ত রকম খবরাখবর রাখতে ও তা প্রতিবেদন আকারে লিখতে অভ্যস্থ।
5 Min Read
প্রতীকী চিত্র
WhatsApp_Group
সব খবর মোবাইলে পেতে Whatsapp গ্রুপে জয়েন্ট করুন

ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন নিজের ইচ্ছায়।  কিন্তু সেই সিদ্ধান্তই কাল হয়ে দাঁড়ায় দুই প্রাপ্তবয়স্ক বোনের জীবনে! ধর্ম পরিবর্তনের পর তাঁদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে বাবার বাড়িতেই আটকে রাখার অভিযোগ ওঠে।  দিনের পর দিন কেটে গেলেও মেলেনি তাঁদের মুক্তি।  শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন দুই বোন।  আর সেই মামলাতেই এবার গুরুত্বপূর্ণ রায় দিল এলাহাবাদ হাইকোর্ট।  দুই বোনকে বেআইনিভাবে আটকে রাখার ঘটনায় তাঁদের বাবা এবং উত্তরপ্রদেশ সরকারকে যৌথভাবে ২৫ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে আদালত।

Join WhatsApp Channel Join Now
Telegram Group Join Now

বিচারপতি সন্দীপ জৈনের একক বেঞ্চের এই রায়ে শুধু ক্ষতিপূরণের নির্দেশই দেওয়া হয়নি, দুই বোনের ব্যক্তিগত স্বাধীনতার উপরও বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে।  ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকারে হস্তক্ষেপের বিষয়ে কড়া অবস্থান নিয়ে আদালত স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির ধর্মীয় পছন্দের কারণে তাঁর ব্যক্তিগত স্বাধীনতায় কোনওভাবেই হস্তক্ষেপ করা যায় না।  একজন মানুষ প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর নিজের ধর্ম, বিশ্বাস এবং কীভাবে জীবন কাটাবেন, তা নিজেই ঠিক করার পূর্ণ অধিকার রাখেন।  সেই পছন্দ পরিবারের মতের সঙ্গে না মিললেও, কাউকে জোর করে আটকে রাখা বা তাঁর স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করার অধিকার কারও নেই।

মামলাটি ৩৫ বছর বয়সী আনশু ভাটিয়া এবং ২০ বছর বয়সী দিয়া ভাটিয়াকে ঘিরে। ইসলাম গ্রহণের পর তাঁরা যথাক্রমে আমিনা ও জোয়া নাম গ্রহণ করেছেন।  আদালতে দুই বোন হলফনামা দিয়ে জানান, নিজেদের বিশ্বাস, বিবেক, মানসিক শান্তি এবং আধ্যাত্মিক তৃপ্তির সন্ধানেই তাঁরা স্বেচ্ছায় ইসলাম গ্রহণ করেছেন।  আনশু ২০২০ সালে এবং দিয়া ২০২১ সালে ইসলাম গ্রহণ করেন।  ধর্মান্তরের নেপথ্যে কোনও জোরজবরদস্তি, প্রতারণা, ভয় বা প্রলোভন—কোনও কিছুরই অস্তিত্ব ছিল না বলে তাঁরা আদালতে স্পষ্ট করেন।

দুই বোনের বক্তব্য শোনার পর আদালত পর্যবেক্ষণ করে, তাঁদের বক্তব্য ছিল অত্যন্ত স্বতঃস্ফূর্ত, সুসংগত এবং স্পষ্ট। তাঁদের আচরণ বা কথাবার্তায় এমন কোনও ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি, যা থেকে মনে হতে পারে তাঁরা কোনও ভয় বা চাপের মধ্যে রয়েছেন।  উল্টো, তাঁরা নিজেদের সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন।

দুই বোনের ধর্মান্তরের সিদ্ধান্ত মেনে নিতে না পেরে তাঁদের বাবা থানায় ফৌজদারি মামলা দায়ের করেছিলেন।  এছাড়াও উত্তরপ্রদেশ সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, এর পিছনে কোনও বৃহত্তর ষড়যন্ত্র রয়েছে কি না বা দেশের নিরাপত্তার প্রশ্ন জড়িয়ে আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।  সেই যুক্তিতে দুই বোনকে আপাতত মুক্তি না দেওয়ার আর্জি জানায় রাজ্য।

কিন্তু রাজ্যের এই যুক্তিতে সন্তুষ্ট হয়নি আদালত।  হাইকোর্ট সাফ জানিয়ে দেয়, ধর্মান্তর আইনসম্মতভাবে হয়েছে কি না, তা তদন্ত সাপেক্ষে খতিয়ে দেখা যেতে পারে।  তবে সেই তদন্তের অজুহাতে কোনও প্রাপ্তবয়স্ক নারীকে তাঁর ইচ্ছার বিরুদ্ধে বন্দি করে রাখা কিছুতেই বরদাস্ত করা যায় না।  ধর্মান্তরের বৈধতা এবং কোনও ব্যক্তিকে বেআইনিভাবে আটকে রাখার প্রশ্ন—দুটি সম্পূর্ণ আলাদা বিষয় বলেও স্পষ্ট করে আদালত।

আদালতের আরও নির্দেশ, দুই বোন নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী যে কোনও জায়গায় এবং যে কোনও ব্যক্তির সঙ্গে থাকতে পারবেন।  তাঁদের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা, চলাফেরা, বাসস্থান, পেশা কিংবা ধর্মীয় সিদ্ধান্তে তাঁদের বাবা আর কোনও হস্তক্ষেপ করতে পারবেন না।  শুধু তাই নয়, তাঁদের পাসপোর্ট, শিক্ষাগত শংসাপত্র, পরিচয়পত্র, ব্যাঙ্কের পাসবই, চেকবই, ধর্মান্তর সংক্রান্ত নথি এবং অন্যান্য ব্যক্তিগত জিনিসপত্রও ফিরিয়ে দিতে হবে।  প্রয়োজন হলে দুই বোনকে নিরাপত্তা দেওয়ার জন্য রাজ্য প্রশাসনকে নির্দেশ দিয়েছে আদালত।

এই মামলায় আদালত স্পষ্ট করে দিয়েছে, প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর একজন ব্যক্তি নিজের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিজেই নেওয়ার অধিকার রাখেন।  কোন ধর্মে বিশ্বাস করবেন, কোথায় থাকবেন বা কার সঙ্গে থাকবেন—এ সবই তাঁর ব্যক্তিগত স্বাধীনতার অংশ।  ভারতীয় সংবিধানের ২৫ নম্বর অনুচ্ছেদে প্রদত্ত বিবেকের স্বাধীনতার অধীনেই নিজের বিশ্বাস অনুযায়ী ধর্ম গ্রহণ, ত্যাগ বা পরিবর্তনের অধিকার প্রত্যেক নাগরিকের রয়েছে।  আদালতের মতে, এটি শুধু ধর্মীয় স্বাধীনতার প্রশ্ন নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ব্যক্তির মর্যাদা, স্বাধীনতা এবং নিজের জীবন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার মৌলিক অধিকার।

প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানকে আটকে রাখার অধিকার বাবা-মায়ের নেই বলেও স্পষ্ট করে দিয়েছে আদালত।  এই রায়ে বাবা-মায়ের ক্ষমতার সীমানাও উল্লেখ করা হয়েছে।  মতের মিল না হলে সন্তানকে ঘরে বন্দি করে রাখার অধিকার কোনও বাবা-মায়ের নেই।  সংবিধান বাবা-মাকে এমন কোনও ক্ষমতা দেয়নি যে, ধর্মীয় বা ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ না মিললে প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানকে জোর করে আটকে রাখা যাবে।

তাই দুই বোনকে তাঁদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে ঘরে আটকে রাখার ঘটনাকে সম্পূর্ণ বেআইনি বলে ঘোষণা করেছে আদালত।  একই সঙ্গে বাবা ও উত্তরপ্রদেশ সরকারকে যৌথভাবে ২৫ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দিয়ে প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির ধর্মীয় স্বাধীনতা ও ব্যক্তিস্বাধীনতার প্রশ্নে গুরুত্বপূর্ণ বার্তাও দিয়েছে এলাহাবাদ হাইকোর্ট।

Share This Article
বিগত প্রায় পাঁচ বছর ধরে ডিজিটাল মিডিয়ার কাজের সঙ্গে যুক্ত। দেশ ও বিদেশের সমস্ত রকম খবরাখবর রাখতে ও তা প্রতিবেদন আকারে লিখতে অভ্যস্থ।