পুজোর আনন্দের ঠিক আগে শহরবাসীর পাতে কী উঠছে, তা খতিয়ে দেখতে গত কয়েকদিন ধরেই ঘুম উড়েছিল কলকাতা পুরসভার স্বাস্থ্য বিভাগের আধিকারিকদের। শহরের আনাচে-কানাচে, নামী রেস্তোরাঁ থেকে শুরু করে নামী শপিং মলের ফুড কোর্ট—সব মিলিয়ে প্রায় ৫৯২টি জায়গায় হানা দিয়েছিলেন ফুড সেফটি অফিসাররা। আর তাতেই বেরিয়ে এসেছে একের পর এক ভয়াবহ চিত্র। পুরসভা সূত্রে জানা গেছে, ৩১টি দোকান দিয়ে শুরু হলেও মঙ্গলবার রাত পর্যন্ত এই কালো তালিকার সংখ্যা গিয়ে ঠেকেছে ৪০টিতে। এই তালিকায় রয়েছে করিমস, আরসালান, বলরাম মল্লিক ও রাধারমণ মল্লিক, মিষ্টিমুখ, ডন জিওভানি’স কিংবা শিমলা ফুডের মতো শহরের প্রথম সারির নামী-দামী রেস্তোরাঁ ও মিষ্টির দোকানগুলিও।
তদন্তে যে সমস্ত চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে, তাতে সাধারণ মানুষের আঁতকে ওঠার জোগাড়। কোথাও দেখা গেছে বিরিয়ানির রঙ চড়াতে ব্যবহার করা হচ্ছে দেওয়ালের রং, কোথাও আবার ফ্রিজে ঠাঁস করে রাখা হয়েছে পচা মাংস ও মাছ। রান্নাঘর বা খাবার তৈরি করার জায়গাগুলিতে ইঁদুর ও তেলাপোকার অবাধ বিচরণ তো বটেই, এমনকি ফিনাইল বা নন-ফুড আইটেমের মতো মারাত্মক জিনিসও পড়ে থাকতে দেখা গেছে প্রক্রিয়াকরণ এলাকার কাছাকাছি। বহু প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেই ছিল না বৈধ FSSAI ম্যানুফ্যাকচারিং লাইসেন্স। নজিরবিহীনভাবে কর্মীদের নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা বা খাবারে ব্যবহৃত জলের ল্যাব টেস্ট রিপোর্টটুকুও দেখাতে পারেননি কর্তৃপক্ষ। ঢাকনা ছাড়া ময়লার বাক্স এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে তৈরি হচ্ছিল পুজোর বাজার মাতানোর খাবারগুলি।
পুরসভার কমিশনার স্মিতা পাণ্ডে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, পুর আইনে সরাসরি লাইসেন্স পাকাপাকিভাবে বাতিলের এককালীন কড়া ব্যবস্থা না থাকায় আপাতত দুই সপ্তাহের জন্য এই সমস্ত প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স সাসপেন্ড করা হলো। এই নির্দিষ্ট চোদ্দো দিনের মধ্যে অভিযুক্ত খাদ্য ব্যবসায়ীদের পুরসভার কাছে কাতারবন্দি হয়ে জবাবদিহি করতে হবে এবং সমস্ত ত্রুটি দ্রুত সংশোধন করতে হবে। অন্যথায় ভবিষ্যতে আরও কঠোর আইনি পদক্ষেপের মুখে পড়তে হবে তাদের।
কলকাতা পুরসভার এই বিশেষ অভিযানে যে সমস্ত খাবারের দোকান, রেস্তোরাঁ ও মিষ্টির প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে লাইসেন্স সাসপেনশন বা বাতিলের সুপারিশ করা হয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে এম/এস গিরিশ চন্দ্র দে অ্যান্ড কোং, এম/এস দুর্গা প্রসাদ চৌরাসিয়া, মেরাকি বেকারি অ্যান্ড কনফেকশনারি, শ্রী কৃষ্ণ সুইটস, জেপ্টো লিমিটেড (কিরানাকার্ট টেকনোলজিস), এম/এস শ্রী ব্রজরাজ, বলরাম মল্লিক ও রাধারমণ মল্লিক (বি. এল. সাহা রোড), এম/এস মা কালী মিষ্টান্ন ভাণ্ডার, এম/এস শ্যামা সুইটস, এস এস এন্টারপ্রাইজ, মনোজ কুমার শাহ, কুমার পাল সিং (বালিগঞ্জ প্লেস), রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার হসপিটালিটি প্রাইভেট লিমিটেড, এশিয়া হাউস / বরুন রাজগারিয়া, এম/এস কুর্তি পাট্টা, এম/এস ভোলানাথ শ্রীমানী অভিজাত মিষ্টান্ন বিক্রেতা, এম/এস মাত্রী মিষ্টান্ন ভাণ্ডার, এম/এস হোলা – আদিরা রেস্তোরাঁ এলএলপি, এম/এস দ্য নিউ পৌষী সুইটস, এম/এস সীতলা মিষ্টান্ন ভাণ্ডার, এম/এস মহাপ্রভু মিষ্টান্ন ভাণ্ডার, এম/এস গোল্ডেন গেট, এফ এন বি মার্কেটিং লিমিটেড (চাগ্রাম), ওয়াটগঞ্জের দাদা বৌদি হোটেল, ঠাকপুকুরের নিউ রাজলক্ষ্মী মিষ্টান্ন ভাণ্ডার ও ডেন্সজং কিচেন, এম/এস সাফিয়া হোটেল, পাণ্ডে ধাবা, পার্ক স্ট্রিটের এম/এস ডন জিওভানি’স, মির্জা গালিব স্ট্রিটের পার্ক ম্যানশনের এম/এস করিম’স, এম/এস মা অভয়া সুইটস, এম/এস শ্রীমা সুইটস, গোবিন্দ মিষ্টি, জোকার ডায়মন্ড পার্কের গঙ্গা, আহমদ আলী-জাকির হোসেন ও এমডি. সাহনাওয়াজ, এম/এস বিরিয়ানি কর্নার, এম/এস শম্ভু অয়েল মিল, এম/এস মিস্ট অ্যান্ড মোরসেলস, এম/এস শক্তি মিষ্টান্ন ভাণ্ডার এবং এম/এস মিঠাই ভাণ্ডার; পাশাপাশি পুরসভার প্রাথমিক তালিকায় আরসালান, মিষ্টিমুখ এবং শিমলা ফুডের মতো প্রথম সারির নামী রেস্তোরাঁ ও খাদ্য বিপণিগুলির নামও বিশেষভাবে অন্তর্ভুক্ত ছিল।




