রাজ্যে বিজেপি সরকার গঠনের পর শিক্ষাক্ষেত্রে সংস্কারের প্রয়োজন রয়েছে বলে মন্তব্য করলেন রাজ্যের উচ্চশিক্ষামন্ত্রী জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায়। তাঁর অভিযোগ, গত কয়েক বছরে শিক্ষাক্ষেত্রে ব্যবসা, দুর্নীতি এবং অরাজকতা জায়গা করে নিয়েছিল। এমনকি কোথাও কোথাও কার্যত ‘ডিগ্রি বিক্রির’ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল বলেও দাবি করেন তিনি। এই পরিস্থিতি বদলাতে রাজ্য সরকার একাধিক পদক্ষেপ করছে বলে জানিয়েছেন মন্ত্রী।
শিক্ষাক্ষেত্রে অনিয়ম খতিয়ে দেখতে এবার রাজ্যের বেসরকারি বিএড কলেজগুলির পরিকাঠামো ও কার্যকলাপ নিয়ে পর্যালোচনা শুরু করেছে উচ্চশিক্ষা দফতর। মন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, জুলাই ও অগস্ট মাসে রাজ্যের মোট ৬০২টি বিএড কলেজ পরিদর্শন করা হয়েছে। কলেজগুলিতে নিয়মিত পঠনপাঠন হচ্ছে কি না, পরিকাঠামো কেমন, কত জন পড়ুয়া রয়েছেন এবং প্রতিষ্ঠানগুলি বাস্তবে ঠিকমতো চলছে কি না—সহ একাধিক বিষয় খতিয়ে দেখেছেন পরিদর্শনকারী আধিকারিকেরা।
পরিদর্শনের ফল নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন শিক্ষামন্ত্রী। তাঁর দাবি, ৬০২টি বিএড কলেজের মধ্যে ২৬৫টি প্রতিষ্ঠান শিক্ষক-প্রশিক্ষণ কলেজ হিসাবে চলার মতো অবস্থায় নেই। অর্থাৎ নির্ধারিত পরিকাঠামো ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় মানদণ্ড পূরণ করতে ব্যর্থ হয়েছে ওই প্রতিষ্ঠানগুলি। দফতরের পরিদর্শনে আরও দেখা গিয়েছে, বেশ কিছু কলেজের পরিকাঠামোর অবস্থা অত্যন্ত খারাপ।
সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে কলেজের অস্তিত্ব এবং ঠিকানা নিয়ে। দফতরের দাবি অনুযায়ী, ৫৩টি বিএড কলেজ তাদের নথিতে উল্লেখ করা ঠিকানায় বাস্তবে খুঁজে পাওয়া যায়নি। কোনও কোনও ক্ষেত্রে জায়গাটি তালাবন্ধ ছিল, আবার কোথাও ওই ঠিকানায় অন্য ধরনের কাজ চলছিল বলে পরিদর্শনে উঠে এসেছে। আরও ১৭টি ক্ষেত্রে ফ্ল্যাট বা ড্রয়িংরুমের মতো জায়গায় বিএড কলেজের ঠিকানা দেখানো বা নো-অবজেকশন সার্টিফিকেট নেওয়ার অভিযোগ সামনে এসেছে।
এমনকি একই জায়গায় একাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দেখানোর অভিযোগও সামনে এসেছে বলে জানিয়েছেন মন্ত্রী। অভিযোগ, কোথাও একই পরিকাঠামো ব্যবহার করে বিএড, পলিটেকনিক এবং ফার্মেসি প্রতিষ্ঠান চলার ছবি দেখানো হয়েছে এবং শুধু সাইনবোর্ড পরিবর্তন করে প্রতিষ্ঠান আলাদা বলে দেখানো হয়েছে। তবে এই সমস্ত অভিযোগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলির বক্তব্য এবং পরবর্তী সরকারি পদক্ষেপের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
পরিদর্শনের মূল্যায়নে ১১৪টি কলেজ ১০০-র মধ্যে ৩০-এরও কম নম্বর পেয়েছে বলে দফতর সূত্রে জানানো হয়েছে। অন্যদিকে, ২৬৫টি প্রতিষ্ঠানকে কার্যত অচল বা শিক্ষক-প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান হিসেবে চলার অনুপযুক্ত বলে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে। আরও ১২১টি কলেজের পরিকাঠামো গুরুতর অবস্থায় রয়েছে বলে পরিদর্শনে উঠে এসেছে। তুলনায় ১৫১টি কলেজ ৬৫ থেকে ৮৫ শতাংশ নম্বর পেয়েছে এবং সেগুলির পরিকাঠামো অপেক্ষাকৃত সন্তোষজনক বলে মনে করা হয়েছে।
এই পরিদর্শনের ভিত্তিতেই এবার কড়া পদক্ষেপের পথে হাঁটছে রাজ্য। ইতিমধ্যে ৪৫০টির বেশি বিএড কলেজকে শো-কজ নোটিস পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কলেজগুলিকে তাঁদের অবস্থান ও অনিয়মের অভিযোগের বিষয়ে জবাব দেওয়ার জন্য ২১ দিনের সময় দেওয়া হবে। জবাব সন্তোষজনক না হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আরও কঠোর পদক্ষেপ করা হতে পারে। এমনকি কলেজের অ্যাফিলিয়েশন বা অনুমোদন হারানোর মতো পদক্ষেপও হতে পারে বলে জানিয়েছেন মন্ত্রী।
জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায়ের বক্তব্য, শিক্ষক-প্রশিক্ষণের নামে কোনওভাবেই ‘শিক্ষার দোকান’ চলতে দেওয়া হবে না। বিএড পড়াশোনা ভবিষ্যতের শিক্ষক তৈরির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হওয়ায় প্রতিষ্ঠানগুলির পরিকাঠামো, শিক্ষক, পঠনপাঠন এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থার মান বজায় রাখা জরুরি বলেই মনে করছে রাজ্য সরকার।
রাজ্যে প্রতি বছর বিপুল সংখ্যক পড়ুয়া বিএড কোর্স সম্পূর্ণ করেন। ফলে এই ধরনের প্রতিষ্ঠানগুলির মান এবং অনুমোদন নিয়ে প্রশ্ন উঠলে তার প্রভাব পড়তে পারে শিক্ষক নিয়োগ ও শিক্ষক-প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার উপরও । সেই কারণেই পরিদর্শনের রিপোর্ট খতিয়ে দেখে ধাপে ধাপে ব্যবস্থা নেওয়ার বার্তা দিয়েছে উচ্চশিক্ষা দফতর।
সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলির জবাব এবং পরবর্তী তদন্তের ভিত্তিতেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এখন নজর থাকবে।

