নির্বাচন কমিশনের অন্দরে মতবিরোধের খবর প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে জোর বিতর্ক। অভিযোগ উঠেছিল, মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের সঙ্গে বাকি দুই নির্বাচন কমিশনারের একাধিক বিষয়ে মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে। সেই বিতর্কের মধ্যেই শনিবার নির্বাচন সদনে বৈঠকে বসল কমিশনের তিন সদস্যের পূর্ণ বেঞ্চ।
শনিবার বিকেল ৩টেয় এই বৈঠক হয়। বৈঠকে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের সঙ্গে ছিলেন নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু এবং বিবেক জোশী। বৈঠকের পর একটি বিস্তারিত প্রেস নোট প্রকাশ করে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে নির্বাচন কমিশন।
কমিশনের বক্তব্য, এসআইআর বা ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন, ফর্ম ৬, ইসিআইনেট পোর্টাল এবং বিভিন্ন রাজ্যে ভোটার তালিকা সংক্রান্ত কাজ নিয়ে বৈঠকে একাধিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কমিশনের দাবি, এই সিদ্ধান্তগুলির ক্ষেত্রে পূর্ণ কমিশনের সর্মথন ও অনুমোদন রয়েছে।
এসআইআর চলাকালীন যেসব ভোটারকে তথ্যের অসঙ্গতি বা ভোটার তালিকার সঙ্গে তথ্য মেলেনি—এই ধরনের কারণে নোটিস দেওয়া হয়েছে, তাঁদের প্রত্যেককে শুনানির জন্য ইআরও বা এইআরও অফিসে যেতে হবে না বলে জানিয়েছে কমিশন।
নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট ভোটারদের বাড়িতে যাবেন বুথ লেভেল অফিসার বা বিএলও। তাঁরা প্রয়োজনীয় নথি সংগ্রহ করবেন। এরপর সেই নথি ইসিআইনেট পোর্টালে আপলোড করা হবে। নথি দেখে ভোটারের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন সংশ্লিষ্ট ইলেক্টোরাল রেজিস্ট্রেশন অফিসার বা ইআরও।
তবে কোনও বিশেষ পরিস্থিতিতে ইআরও মনে করলে শুনানি করা হতে পারে। কমিশনের নির্দেশ, প্রয়োজন হলে সেই শুনানি সম্ভব হলে অনলাইনেই করার ব্যবস্থা করতে হবে।
শুধু তাই নয়, কোনও ভোটারের পক্ষে তাঁর পরিবারের প্রাপ্তবয়স্ক সদস্যও শুনানিতে উপস্থিত হতে পারবেন। সেক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ভোটারকে তাঁকে অনুমতি দিতে হবে।
অর্থাৎ এসআইআর-এর নোটিস পাওয়া প্রত্যেক ব্যক্তিকে শুধুমাত্র শুনানির জন্য ইআরও বা এইআরও অফিসে ছুটতে হবে না। প্রয়োজনীয় নথি সংগ্রহের ক্ষেত্রে বিএলও-রাই বাড়িতে গিয়ে নথি নেবেন।
এছাড়াও এদিন নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, এসআইআর ইতিমধ্যেই ২০টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে সম্পূর্ণ হয়েছে। এর মধ্যে পশ্চিমবঙ্গ ও বিহারও রয়েছে।
এসআইআর চলাকালীন যাঁদের নাম ভোটার তালিকায় বাদ পড়েছে, অথবা এসআইআর শেষ হওয়ার পর যাঁদের নাম বাদ পড়েছে, তাঁরাও ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করার জন্য সংশ্লিষ্ট ইআরও-র কাছে আবেদন করতে পারবেন।
নতুন ভোটার বা প্রথমবার ভোট দিতে চলা ব্যক্তিরাও নাম তোলার জন্য আবেদন করতে পারবেন। এ জন্য সংশ্লিষ্ট ইআরও-র কাছে আবেদন করতে হবে। রাজ্যগুলির মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক বা সিইও-দের এই প্রক্রিয়ায় প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করার নির্দেশ দিয়েছে কমিশন। নাম বাদ পড়া ভোটারদের নতুন করে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার জন্য বিশেষ উদ্যোগ নেওয়ার কথাও জানিয়েছে কমিশন।
গোয়ার ক্ষেত্রেও ভোটার তালিকা নিয়ে একটি তথ্য দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। কমিশনের দাবি, এসআইআর-এ বাদ পড়া ৯৭ জন ভোটারের মধ্যে ইতিমধ্যেই ৮১ জন ফর্ম ৬ পূরণ করেছেন।
বাকি ভোটারদের কাছ থেকেও ফর্ম সংগ্রহ করার জন্য সংশ্লিষ্ট বিএলও-দের বাড়ি বাড়ি যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
নতুন ভোটার হিসেবে নাম তোলার জন্য ফর্ম ৬-এর সঙ্গে যে ঘোষণা বা ডিক্লারেশন দিতে হচ্ছে, তা নিয়েও সম্প্রতি প্রশ্ন উঠেছিল।
এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য, এসআইআর-এর ক্ষেত্রে ফর্ম ৬-এর সঙ্গে থাকা ডিক্লারেশনের বৈধতা সুপ্রিম কোর্ট বহাল রেখেছে।
তবে এসআইআর-এর সময়সীমার বাইরে সাধারণভাবে ভোটার তালিকায় নাম তোলার ক্ষেত্রে ১৯৬০ সালের রেজিস্ট্রেশন অব ইলেক্টরস রুলস অনুযায়ী প্রযোজ্য নিয়ম ও ফর্ম ব্যবহার করা হবে।
ভোটার তালিকা সংক্রান্ত তথ্য ব্যবহারের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের ইসিআইনেট পোর্টালের ভূমিকা নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছিল।
এদিন কমিশন জানিয়েছে, আধিকারিকদের তাঁদের আইনগত দায়িত্ব অনুযায়ী ইসিআইনেট ব্যবহারের অধিকার দেওয়া হয়। অর্থাৎ প্রত্যেক আধিকারিক তাঁর দায়িত্ব অনুযায়ী নির্দিষ্ট তথ্য ও ব্যবস্থায় প্রবেশ করতে পারেন।
তবে ইসিআইনেট ব্যবস্থা আইন ও নিয়ম অনুযায়ী ঠিকভাবে কাজ করছে কি না, তা নতুন করে পর্যালোচনা করা হবে।
এর জন্য একজন সিনিয়র ডেপুটি নির্বাচন কমিশনারের নেতৃত্বে একটি কমিটি তৈরি করা হবে। ওই কমিটিতে আইআইটি বা আইআইআইটি-র একজন স্বাধীন বিশেষজ্ঞও থাকবেন।
কমিশনের বক্তব্য, গত কয়েক মাসে বিভিন্ন রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকদের দেওয়া পরামর্শের ভিত্তিতে ইসিআইনেট পোর্টালে বেশ কিছু পরিবর্তন ইতিমধ্যেই করা হয়েছে। ভবিষ্যতে আরও কোনও পরিবর্তনের প্রয়োজন হলে সেটিও করা হবে।
জ্ঞানেশ কুমারকে ঘিরে সাম্প্রতিক বিতর্কের অন্যতম বিষয় ছিল ক্যাবিনেট সচিবকে পাঠানো একটি চিঠি। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছিল, কমিশনের দুই সদস্য বিভিন্ন বিষয়ে আপত্তি জানিয়ে চিঠি পাঠিয়েছিলেন।
এ বিষয়ে কমিশন জানিয়েছে, ক্যাবিনেট সচিবকে পাঠানো চিঠিটি কোনও নীতিগত সিদ্ধান্ত বা কমিশনের তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগ নিয়ে ছিল না।
কমিশনের দাবি, চিঠিটি মূলত কমিশনে ডেপুটেশনে থাকা এক আধিকারিকের কাজের ধরন এবং দায়িত্ব পালনের বিষয় নিয়ে ছিল।
ওই আধিকারিকের কাজ পুনর্বণ্টন সংক্রান্ত যে নির্দেশ জারি হয়েছিল, দুই নির্বাচন কমিশনারের নির্দেশের পরে তা কার্যকর করা হয়নি বলেও জানিয়েছে কমিশন। একই সঙ্গে তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের উপর ডেপুটি নির্বাচন কমিশনারের তদারকির দায়িত্বও কখনও প্রত্যাহার করা হয়নি বলে স্পষ্ট করেছে নির্বাচন কমিশন।
সাম্প্রতিক বিতর্কের অন্যতম বিষয় ছিল এসআইআর। অভিযোগ উঠেছিল, এসআইআর নিয়ে জ্ঞানেশ কুমারের কয়েকটি সিদ্ধান্তের সঙ্গে বাকি দুই নির্বাচন কমিশনারের মতপার্থক্য ছিল।
তবে শনিবারের প্রেস নোটে নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, ২৪ জুন ২০২৫-এ বিভিন্ন রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে এসআইআর শুরু করার নির্দেশ পূর্ণ কমিশনের সর্বসম্মত অনুমোদনেই জারি করা হয়েছিল। পরে এসআইআর-এর বিভিন্ন পর্যায়ের সময়সূচিও কমিশনের সর্বসম্মত অনুমোদনেই জারি করা হয় বলে জানিয়েছে ইসি।
কমিশনের আরও বক্তব্য, ২৭ মে ২০২৬-এ সুপ্রিম কোর্টও এসআইআর সংক্রান্ত ওই নির্দেশ বহাল রেখেছে।
অর্থাৎ, কমিশনের অন্দরে মতপার্থক্যের খবর নিয়ে বিতর্ক তৈরি হলেও, এসআইআর-এর মূল সিদ্ধান্তগুলি সর্বসম্মতভাবেই নেওয়া হয়েছিল বলে শনিবারের বিবৃতিতে স্পষ্ট করেছে নির্বাচন কমিশন।
এদিকে, এসআইআর চলাকালীন যেসব ভোটারের নাম ‘আনম্যাপড’ বা ‘লজিক্যাল ডিসক্রেপেন্সি’-র কারণে নোটিস পেয়েছে, তাঁদের জন্যও কিছুটা স্বস্তির ব্যবস্থা করেছে কমিশন। এখন থেকে প্রয়োজনীয় নথি সংগ্রহ করতে বিএলও-রা ওই ভোটারদের বাড়িতে যেতে পারবেন। নথিগুলি ইসিআইনেটে আপলোড করা হবে। এরপর ইআরও সেই নথি দেখে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেবেন।
এই ধরনের ভোটারদের সাধারণভাবে ইআরও বা এইআরও-র দফতরে গিয়ে হাজির হতে হবে না। বিশেষ কোনও পরিস্থিতিতে শুনানির প্রয়োজন হলে ইআরও তা ঠিক করবেন। সেক্ষেত্রে অনলাইনে শুনানির ব্যবস্থাও করা যেতে পারে। কোনও ভোটার নিজে উপস্থিত হতে না পারলে তাঁর পরিবারের প্রাপ্তবয়স্ক কোনও সদস্যকেও অনুমতি দিয়ে শুনানিতে পাঠানো যাবে।
যাঁরা রাতের আশ্রয়কেন্দ্রে থাকেন, শ্রমিক, গৃহহীন বা আর্থিক ভাবে পিছিয়ে থাকা মানুষ—তাঁদের ভোটার তালিকায় নাম তোলার ক্ষেত্রে যাতে সমস্যা না হয়, সে জন্য বিশেষ ব্যবস্থা করার নির্দেশও দিয়েছে কমিশন। জেলা প্রশাসনকে পর্যাপ্ত হেল্প ডেস্ক এবং বিশেষ শিবির করার কথা বলা হয়েছে।
এসআইআর-এর সময় কারও নাম বাদ পড়ে গেলেও তাঁর জন্য আবেদন করার সুযোগ থাকছে। কমিশন জানিয়েছে, এসআইআর শেষ হওয়ার পরেও যাঁদের নাম তালিকায় নেই, তাঁরা সংশ্লিষ্ট ইআরও-র কাছে ফর্ম ৬ জমা দিয়ে ভোটার তালিকায় নাম তোলার আবেদন করতে পারবেন। নতুন ভোটার বা প্রথম বার ভোট দিতে চলেছেন এমন তরুণ-তরুণীরাও এই সুযোগ পাবেন।
এই বিষয়ে রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক, জেলা নির্বাচনী আধিকারিক এবং ইআরও-দের বিশেষ উদ্যোগ নিতে বলা হয়েছে। বাদ পড়া যোগ্য ভোটারদের চিহ্নিত করে তাঁদের আবেদন করার সুযোগ করে দেওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।
গোয়ার ক্ষেত্রেও বাদ পড়া ভোটারদের নিয়ে কাজ শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছে কমিশন। সেখানে মোট ৯৭ জন ভোটারকে বিএলও-রা চিহ্নিত করেছিলেন। তাঁদের মধ্যে ৮১ জন ইতিমধ্যেই ফর্ম ৬ জমা দিয়েছেন বলে জানিয়েছে ইসি।
ইসিআইনেট নিয়েও নতুন করে পর্যালোচনার সিদ্ধান্ত হয়েছে। কমিশন জানিয়েছে, মাঠপর্যায়ের আধিকারিকরা তাঁদের দায়িত্ব অনুযায়ী ইসিআইনেটে প্রয়োজনীয় তথ্য ব্যবহারের সুযোগ পাবেন। পাশাপাশি আইআইটি বা আইআইআইটি-র বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি কমিটি ইসিআইনেটের কাজ পর্যালোচনা করবে। আইন ও নিয়ম মেনে এই ব্যবস্থা চলছে কি না, তা খতিয়ে দেখে কমিশনকে রিপোর্ট দেওয়া হবে।
ক্যাবিনেট সচিবকে পাঠানো চিঠি নিয়েও কমিশন নিজেদের অবস্থান জানিয়েছে। কমিশনের দাবি, ওই চিঠি কোনও নীতি বা ইসির তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের সিদ্ধান্ত নিয়ে ছিল না। বরং কমিশনে ডেপুটেশনে থাকা এক আধিকারিকের কাজের বিষয়েই চিঠিটি পাঠানো হয়েছিল। ওই আধিকারিকের দেওয়া কাজ ভাগ করে দেওয়ার নির্দেশ দুই কমিশনারের নির্দেশের পর কার্যকর করা হয়নি বলেও জানিয়েছে কমিশন।
এছাড়া দিল্লি ও মহারাষ্ট্রে ভোটার তালিকা নিয়ে দাবি ও আপত্তি জানানোর সময়সীমাও বাড়ানো হয়েছে। দিল্লিতে ৩০ অক্টোবর পর্যন্ত এবং মহারাষ্ট্রে ১২ অক্টোবর পর্যন্ত দাবি ও আপত্তি জানানো যাবে। সেই আবেদনগুলি নিষ্পত্তির জন্যও আলাদা সময়সীমা নির্ধারণ করেছে কমিশন।
শনিবারের বৈঠকে ভবিষ্যতে কমিশনের কাজের পদ্ধতি নিয়েও কিছু সিদ্ধান্ত হয়েছে। এখন থেকে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকের আগে আলোচ্যসূচি কমিশনারদের কাছে পাঠানো হবে এবং বৈঠকের পরে তার কার্যবিবরণী তৈরি করা হবে। আধিকারিকদের বার্ষিক মূল্যায়ন এবং বিদেশ সফরের ক্ষেত্রেও কিছু নিয়ম স্পষ্ট করেছে কমিশন।
প্রিমিয়াম PVC কার্ড অর্ডার করুন
ওয়াটারপ্রুফ • টেকসই • ফাস্ট ডেলিভারি
💬 WhatsApp এ ক্লিক করুন
