অবশেষে দীর্ঘ ৩৩ বছরের আইনি লড়াইয়ের অবসান। উত্তরপ্রদেশের গোরক্ষপুরের বাসিন্দা, বর্তমানে ৭৮ বছর বয়সী মোহাম্মদ নাঈমকে সব অভিযোগ থেকে বেকসুর খালাস দিয়েছে লখনউয়ের বিশেষ এনআইএ (NIA) আদালত। আদালতের স্পষ্ট পর্যবেক্ষণ, রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে মোহাম্মদ নাঈমের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের সপক্ষে কোনো জোরালো বা পর্যাপ্ত প্রমাণ পেশ করা যায়নি।
১৯৯৩ সালের ২৬ জানুয়ারি, প্রজাতন্ত্র দিবসের দিন এই মামলার সূত্রপাত। পুলিশের তৎকালীন অভিযোগ ছিল, গোরক্ষপুরের ইসমাইলপুর এলাকায় কয়েকজন ব্যক্তি কালো পতাকা উত্তোলন করে দেশবিরোধী ও উসকানিমূলক স্লোগান দিচ্ছেন। সে সময় বাবরি মসজিদ ধ্বংসের প্রসঙ্গ টেনে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্টের চেষ্টার অভিযোগও আনা হয়েছিল।
এই ঘটনার জেরে মোহাম্মদ নাঈমসহ বেশ কয়েকজনের বিরুদ্ধে ভারতীয় দণ্ডবিধির ১২৪এ (রাষ্ট্রদ্রোহ), ২৯৫এ (ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত) এবং ১৫৩বি (জাতীয় সংহতির বিরুদ্ধে বক্তব্য) ধারায় মামলা রুজু করে।
দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়া চলাকালীন সরকারি তদন্তকারী সংস্থার প্রমাণের বিভিন্ন ধাপে একাধিক ফাঁকফোকর ও অসঙ্গতি ধরা পড়ে। বিচারক লক্ষ্য করেন যে, পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে চারটি কালো পতাকা উদ্ধারের দাবি করলেও তা আদালতে প্রমাণ হিসেবে জমা দিতে পারেনি। এছাড়া, মামলার অন্যতম এক গুরুত্বপূর্ণ পুলিশ সাক্ষী আদালতে স্বীকার করেন যে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর আগেই অভিযুক্তরা সেখান থেকে সরে গিয়েছিল। পাশাপাশি কোনো ধরনের প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য বা নির্ভরযোগ্য প্রমাণ ছাড়াই কীভাবে মোহাম্মদ নাঈমকে অভিযুক্ত করা হলো, রাষ্ট্র পক্ষ তারও কোনো সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারেনি। অন্যদিকে, মামলার মূল অভিযোগকারী তৎকালীন পুলিশ পরিদর্শককে বারবার সমন পাঠানো সত্ত্বেও তিনি আদালতে জেরার মুখে হাজির হননি। এমনকি দ্বিতীয় তদন্তকারী কর্মকর্তা আদালতে স্বীকার করেন যে তিনি নিজে ঘটনাস্থলে যাননি এবং নতুন কোনো সাক্ষীর বয়ানও রেকর্ড করেননি; বরং কেবল পূর্ববর্তী তদন্তকারী কর্মকর্তার পুরোনো নথির ওপর ভিত্তি করেই চার্জশিট দাখিল করা হয়েছিল।
এই মামলায় মোহাম্মদ নাঈমের আইনজীবী রাহুল সোঙ্কার জানান, ২০০৩ সালেই প্রথম তদন্তকারী কর্মকর্তা প্রমাণের অভাবে মামলাটি বন্ধ করে দেওয়ার সুপারিশ করেছিলেন। কিন্তু সেই রিপোর্ট গ্রহণ করা হয়নি। এরপর ২০০৫ সালে নতুন কোনো সাক্ষ্যপ্রমাণ ছাড়াই পুনরায় চার্জশিট দাখিল করা হয়।
এই দীর্ঘ ৩৩ বছরের বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রিতায় মামলার অন্য দুই অভিযুক্ত মারা যান। ফলে জীবনের শেষবেলায় এসে একেবারে একা হাতেই আইনি লড়াই চালিয়ে যেতে হয় বয়োবৃদ্ধ মোহাম্মদ নাঈমকে।
এই দীর্ঘ ৩৩ বছরের বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রিতায় মামলার অন্য দুই অভিযুক্ত মারা যান। ফলে জীবনের শেষবেলায় এসে একেবারে একা হাতেই আইনি লড়াই চালিয়ে যেতে হয় বয়োবৃদ্ধ মোহাম্মদ নাঈমকে।
গত ৩১ জুলাই লখনউয়ের বিশেষ এনআইএ আদালতের বিচারক উমাকান্ত জিন্দাল রায়ে জানান, রাষ্ট্রপক্ষ মোহাম্মদ নাঈমের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। ফলস্বরূপ, তাঁকে সব অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দিয়ে তাঁর জামিনের বন্ড বাতিল করে আদালত।
রায় ঘোষণার পর আবেগাপ্লুত হয়ে মোহাম্মদ নাঈম গণমাধ্যমকে বলেন, “দীর্ঘ ৩৩ বছর ধরে আমি একটাই কথা বলে এসেছি যে আমি সম্পূর্ণ নির্দোষ। আশা করি, এবার অন্তত মানুষ আমাকে দেশবিরোধী বলা বন্ধ করবে। আমাকে একটি মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো হয়েছিল। আজ এত বছর পর অবশেষে সত্যের জয় হলো।”

