2026 FIFA World Cup: বিশ্বের উৎসব নাকি বৈষম্য, বাণিজ্যিকীকরণ ও দ্বিচারিতার প্রতীক?

লিখেছেন: তামিম আখতার (লেখক আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী এবং কোচবিহারের বাসিন্দা। তিনি নিয়মিত সমসাময়িক রাজনীতি ও সামাজিক বিষয় নিয়ে বিশ্লেষণধর্মী লেখালেখি করেন)।

MD 360 NEWS
5 Min Read
WhatsApp_Group
সব খবর মোবাইলে পেতে Whatsapp গ্রুপে জয়েন্ট করুন

বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার আগেই ২০২৬ আসর এমন এক বিতর্কের কেন্দ্রে পৌঁছে গেছে, যা ফুটবলের ইতিহাসে খুব কমই দেখা গেছে।  একসময় আমাদের বলা হয়েছিল দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপ নিরাপত্তাহীন হবে, রাশিয়া বিশ্বকাপ রাজনৈতিক কারণে ব্যর্থ হবে, কাতার বিশ্বকাপ মানবাধিকার প্রশ্নে কলঙ্কিত হবে। পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমের বড় অংশ বছরের পর বছর ধরে এই আয়োজকদের বিরুদ্ধে নেতিবাচক বর্ণনা তৈরি করেছে।  অথচ আজ যখন বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী ও তথাকথিত “গণতান্ত্রিক” রাষ্ট্রগুলোর একটি যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বকাপ আয়োজন করছে, তখন একের পর এক বিতর্ক সামনে এলেও সেই একই তীব্রতা, একই ক্ষোভ বা একই নৈতিক অবস্থান কোথাও দেখা যাচ্ছে না।

Join WhatsApp Channel Join Now
Telegram Group Join Now

বিশ্বকাপকে বলা হয় পৃথিবীর সবার উৎসব। কিন্তু বাস্তবতা হলো, টুর্নামেন্ট শুরুর আগেই বহু দেশ ও জনগোষ্ঠী নিজেদের অবাঞ্ছিত মনে করতে শুরু করেছে।  ইরাকের তারকা ফুটবলার আইমান হুসেইনকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিমানবন্দরে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। ইরাক দলের আলোকচিত্রীকে দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে।  আফ্রিকার অন্যতম সেরা রেফারি সোমালিয়ার ওমর আবদুলকাদির আরতানকে প্রবেশে বাধার মুখে পড়তে হয়েছে।  ইরানি প্রতিনিধিদলকে ঘিরে বিশেষ বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।  প্রশ্ন হচ্ছে, যদি ফুটবল সত্যিই বিশ্বকে একত্রিত করার খেলা হয়, তাহলে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা মানুষদের প্রতি এই সন্দেহ, এই বাধা, এই আমলাতান্ত্রিক দেয়াল কেন?

সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, যেসব মহল কাতার বিশ্বকাপের সময় মানবাধিকার ও বৈষম্যের প্রশ্নে সবচেয়ে বেশি সরব ছিল, তাদের অনেককেই এখন নীরব দেখা যাচ্ছে।  কাতারে “One Love” আর্মব্যান্ড নিয়ে যে তীব্র প্রচারণা হয়েছিল, আজ ভিসা প্রত্যাখ্যান, ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা এবং প্রবেশ-বাধা নিয়ে সেই একই আবেগ কোথায়? কেন ইরানের সঙ্গে আচরণ, কেন সোমালি রেফারির ঘটনা, কেন কিছু দেশের সমর্থকদের ভিসা জটিলতা বৈশ্বিক আলোচনার কেন্দ্রে আসছে না?

এখানেই শেষ নয়।  বিশ্বকাপের আয়োজক দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন নীতিও প্রশ্নের মুখে।  একদিকে রাজনীতিবিদরা বলছেন ফুটবল অভিবাসীদের অবদানে সমৃদ্ধ হয়েছে, অন্যদিকে বাস্তবে বিভিন্ন দেশের সমর্থক, সাংবাদিক ও কর্মকর্তারা প্রবেশ-সংক্রান্ত জটিলতার মুখোমুখি হচ্ছেন।  বিশ্বকাপ যদি সত্যিই “বিশ্বের উৎসব” হয়, তাহলে সেই উৎসবে অংশ নেওয়ার অধিকার কি সবার সমান?

নিরাপত্তা ও আয়োজন নিয়েও প্রশ্ন কম নয়।  কোথাও অনুশীলন কেন্দ্রের আশপাশে গুলির ঘটনা, কোথাও বিষাক্ত সাপের অভিযোগ, কোথাও নিম্নমানের অনুশীলন মাঠ, কোথাও আবার আবহাওয়ার কারণে ঘণ্টার পর ঘণ্টা খেলা বন্ধ।  উত্তর আমেরিকার গ্রীষ্মকালীন আবহাওয়া, বজ্রঝড় ও তাপপ্রবাহ নিয়ে বিশেষজ্ঞরা আগেই সতর্ক করেছিলেন।  এখন সেই আশঙ্কাগুলো বাস্তবে রূপ নিতে শুরু করেছে।  অথচ কাতারের আবহাওয়া নিয়ে যেভাবে বছরের পর বছর সমালোচনা হয়েছে, সেই তুলনায় এসব বিষয়ের আলোচনা অনেক সীমিত।

কিন্তু সাধারণ সমর্থকদের কাছে সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে অর্থনৈতিক দিক থেকে।  বিশ্বকাপের ফাইনালের টিকিটের মূল্য হাজার হাজার ডলারে পৌঁছেছে।  স্টেডিয়ামে এক বোতল পানির দাম কয়েক ডলার, এক গ্লাস বিয়ারের দাম প্রায় বিশ ডলার, সাধারণ খাবারের দামও অনেকের নাগালের বাইরে।  অনেক স্টেডিয়ামে বাইরে থেকে পানি নিয়ে প্রবেশের অনুমতি নেই। ফলে সমর্থকদের সামনে কার্যত ব্যয়বহুল বিকল্প ছাড়া আর কিছু থাকছে না।  যে বিশ্বকাপ একসময় শ্রমজীবী, মধ্যবিত্ত ও সাধারণ মানুষের উৎসব ছিল, তা কি এখন কর্পোরেট অতিথি ও উচ্চ আয়ের দর্শকদের জন্য সংরক্ষিত এক বিলাসী আয়োজনে পরিণত হচ্ছে না?

আরও বড় প্রশ্ন উঠে আসে FIFA-এর ভূমিকা নিয়ে।  সংস্থাটি একদিকে দাবি করে ফুটবল রাজনীতির ঊর্ধ্বে, অন্যদিকে রাজনৈতিক প্রতীক ও বিতর্কে জড়িয়ে পড়ে বারবার।  ফিলিস্তিন-ইসরায়েল ইস্যুতে FIFA-এর আচরণ, Donald Trump-এর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা, তথাকথিত “Peace Prize” প্রদান—সবকিছু মিলিয়ে সংস্থাটির নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন বাড়ছে।  সমালোচকদের মতে, FIFA আজ আর শুধুমাত্র ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা নয়; এটি বৈশ্বিক রাজনীতি, কর্পোরেট স্বার্থ ও ক্ষমতার বলয়ের একটি অংশে পরিণত হয়েছে।

রাশিয়াকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে, যা অনেকের কাছে যৌক্তিক সিদ্ধান্ত। কিন্তু তখন প্রশ্ন ওঠে, আন্তর্জাতিক রাজনীতির ক্ষেত্রে কি সব দেশের জন্য একই মানদণ্ড প্রযোজ্য? কেন কিছু দেশের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়, আবার অন্যদের ক্ষেত্রে নীরবতা দেখা যায়? এই প্রশ্নের উত্তর যতদিন স্পষ্ট না হবে, ততদিন দ্বিচারিতার অভিযোগও থামবে না।

সব মিলিয়ে ২০২৬ বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় সংকট হয়তো মাঠের ফুটবল নয়, বরং বিশ্বাসযোগ্যতার সংকট।  এটি এমন এক বিশ্বকাপ, যেখানে প্রথম বল গড়ানোর আগেই মানুষ ভিসা, সীমান্ত, নিরাপত্তা, বাণিজ্যিকীকরণ, রাজনৈতিক প্রভাব, বৈষম্য ও দ্বৈত মানদণ্ড নিয়ে আলোচনা করছে।  FIFA ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিশ্বকাপ আয়োজন করতে চেয়েছিল।  সংখ্যার বিচারে হয়তো তারা সফল হবে।  কিন্তু একই সঙ্গে তারা হয়তো ইতিহাসের সবচেয়ে বিতর্কিত বিশ্বকাপেরও জন্ম দিতে চলেছে—এক এমন আসর, যা ভবিষ্যতে শুধু গোল, ট্রফি বা চ্যাম্পিয়নের জন্য নয়, বরং বৈশ্বিক রাজনীতি, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং নির্বাচিত নৈতিকতার প্রতীক হিসেবেও স্মরণ করা হতে পারে।

Share This Article