ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এমন কিছু নাম রয়েছে, যাদের ছাড়া সেই ইতিহাস কখনোই পূর্ণ হয় না। মহাত্মা গান্ধী, ভগত সিং, চন্দ্রশেখর আজাদ, খান আব্দুল গফফার খান, ক্ষুদিরাম বসু, মাস্টারদা সূর্য সেন—এই সব নামের সঙ্গে সমান গুরুত্বে উচ্চারিত হয় আরেকটি নাম, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু।
কিন্তু তাঁকে শুধু একজন স্বাধীনতা সংগ্রামী বললে ভুল হবে। তিনি ছিলেন একাধারে সংগঠক, দূরদর্শী রাজনীতিবিদ, দক্ষ প্রশাসক, অসাধারণ বক্তা এবং এমন একজন নেতা, যিনি বিশ্বাস করতেন স্বাধীনতা কখনও প্রার্থনা করে পাওয়া যায় না, তা অর্জন করতে হয় সংগ্রাম করে।
তাঁর বিখ্যাত আহ্বান—”তোমরা আমাকে রক্ত দাও, আমি তোমাদের স্বাধীনতা দেব“—আজও কোটি ভারতীয়ের মনে দেশপ্রেমের আগুন জ্বালিয়ে দেয়।
আবার তাঁর আরেকটি ভবিষ্যদ্বাণীও ইতিহাসে অমর হয়ে আছে,
ভারত পুনরায় স্বাধীন হইবেই হইবে। এবং স্বাধীনতার সূর্য উদয়ের খুব বেশি বিলম্বও নাই।
এই আত্মবিশ্বাসই ছিল সুভাষচন্দ্র বসুর সবচেয়ে বড় শক্তি। তিনি বিশ্বাস করতেন, ব্রিটিশ সাম্রাজ্য যত শক্তিশালীই হোক, একদিন না একদিন ভারত স্বাধীন হবেই।
যে সময়ে জন্ম নিলেন সুভাষ
উনিশ শতকের শেষভাগ। তখন ভারত সম্পূর্ণ ব্রিটিশ শাসনের অধীনে। ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহ দমন করার পর ব্রিটিশ সরকার আরও কঠোরভাবে ভারত শাসন শুরু করেছে।
দেশের সম্পদ বিদেশে পাচার হচ্ছে, কৃষকরা দারিদ্র্যের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন, শিক্ষিত তরুণদের জন্য সরকারি চাকরি ছাড়া অন্য কোনো বড় সুযোগ নেই। একদিকে পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রসার ঘটছে, অন্যদিকে ভারতীয়দের মনে জাতীয়তাবোধও ধীরে ধীরে জাগতে শুরু করেছে।
রাজা রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, স্বামী বিবেকানন্দ—এই সব মনীষীদের চিন্তাভাবনা নতুন ভারতের স্বপ্ন দেখাচ্ছিল। এই পরিবর্তনের সময়েই জন্ম নেন সুভাষচন্দ্র বসু। ১৮৯৭ সালের ২৩ জানুয়ারি উড়িষ্যার কটক শহরে জন্মগ্রহণ করেন সুভাষচন্দ্র বসু।
তাঁর বাবা জানকীনাথ বসু ছিলেন কটকের অন্যতম খ্যাতনামা আইনজীবী। পরে তিনি সরকারি আইনজীবী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। সমাজে তাঁর যথেষ্ট সম্মান ও প্রভাব ছিল। মা প্রভাবতী দেবী ছিলেন ধর্মপ্রাণ, স্নেহশীলা এবং অত্যন্ত আদর্শবাদী নারী। পরিবারে মোট ১৪ জন সন্তান ছিল। তাঁদের মধ্যে সুভাষ ছিলেন নবম। শৈশব থেকেই বাড়ির পরিবেশ ছিল শিক্ষানুরাগী এবং শৃঙ্খলাপূর্ণ। বাবা চাইতেন ছেলে বড় হয়ে উচ্চশিক্ষিত হোক এবং ব্রিটিশ প্রশাসনের উচ্চপদে চাকরি করুক। কিন্তু ভাগ্য তাঁর জন্য অন্য পথ লিখে রেখেছিল।
শৈশবেই অন্যরকম সুভাষ
ছোটবেলা থেকেই সুভাষ ছিলেন শান্ত, ভদ্র এবং আত্মমর্যাদাবোধসম্পন্ন। খেলাধুলার চেয়ে বই পড়তেই তাঁর বেশি আগ্রহ ছিল। ইতিহাস, দর্শন, ধর্ম, সাহিত্য সবকিছু নিয়েই কৌতূহল ছিল তাঁর।
প্রথমে তিনি কটকের প্রোটেস্ট্যান্ট ইউরোপিয়ান স্কুলে (বর্তমান স্টুয়ার্ট স্কুল) ভর্তি হন। পরবর্তীতে পড়াশোনা শুরু করেন র্যাভেনশ কলেজিয়েট স্কুলে। এই স্কুলেই তাঁর জীবনের মোড় ঘুরে যায়।
র্যাভেনশ কলেজিয়েট স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন বেণীমাধব দাস। তিনি শুধু পাঠ্যবই পড়াতেন না, ছাত্রদের মধ্যে দেশপ্রেম, সততা, মানবিকতা এবং আত্মমর্যাদাবোধ গড়ে তুলতেন।
সুভাষচন্দ্র পরে স্মৃতিচারণ করে লিখেছিলেন, বেণীমাধব দাসের কাছ থেকেই তিনি প্রথম উপলব্ধি করেছিলেন যে শিক্ষা মানে শুধু পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়া নয়, একজন ভালো মানুষ হয়ে ওঠাও শিক্ষার অংশ। এই সময়ই তিনি স্বামী বিবেকানন্দের লেখা পড়তে শুরু করেন। বিবেকানন্দের সেই বিখ্যাত আহ্বান ,
উঠো, জাগো, লক্ষ্য না পাওয়া পর্যন্ত থেমো না
এই কথায় তরুণ সুভাষের মনে গভীর ছাপ ফেলে। তনি উপলব্ধি করেন, দেশের জন্য কিছু করতে হলে আগে নিজেকে গড়ে তুলতে হবে।
সুভাষের ছাত্রজীবন
সুভাষচন্দ্র ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র। শিক্ষকদের প্রশ্ন করতেন, নতুন বিষয় জানার চেষ্টা করতেন এবং পাঠ্যবইয়ের বাইরে প্রচুর বই পড়তেন। তাঁর সহপাঠীরা পরে স্মরণ করেছেন, খুব অল্প বয়স থেকেই তাঁর মধ্যে নেতৃত্ব দেওয়ার এক অসাধারণ ক্ষমতা ছিল। স্কুলে কোনো সমস্যা হলে অনেকেই তাঁর কাছে আসতেন। তিনি যুক্তি দিয়ে কথা বলতেন এবং অন্যদের বোঝাতে পারতেন।
এদিকে সুভাষ ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষা দিলে , পরীক্ষায় ভালো ফল করার পর ১৯১৩ সালে তিনি কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হন।
সেই সময় প্রেসিডেন্সি কলেজ ছিল ব্রিটিশ ভারতের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর একটি। এখানে পড়াশোনা করতেন দেশের সেরা মেধাবীরা। কিন্তু কলকাতায় এসে সুভাষচন্দ্র নতুন এক বাস্তবতার মুখোমুখি হন। তিনি দেখলেন, অনেক ছাত্রের একমাত্র লক্ষ্য ভালো চাকরি। দেশ তখন পরাধীন, কিন্তু সেই বিষয়টি নিয়ে অনেকের মধ্যে তেমন আগ্রহ নেই। এতে তিনি হতাশ হন।
প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়াকালীষ একদিন কলেজের ইংরেজ অধ্যাপক ই. এফ. ওটেন ভারতীয়দের সম্পর্কে অপমানজনক মন্তব্য করেন। এই মন্তব্যে ছাত্রদের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। পরবর্তীতে অধ্যাপক ওটেনের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। ব্রিটিশ প্রশাসন এই ঘটনার জন্য সুভাষচন্দ্রকে দায়ী করে। যদিও তিনি সরাসরি হামলায় অংশ নিয়েছিলেন কি না, তা নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে এখনও মতভেদ রয়েছে। তবে এই ঘটনার পর তাঁকে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে বহিষ্কার করা হয়। এই ঘটনা তাঁর জীবনের প্রথম বড় রাজনৈতিক অভিঘাত হিসেবে ধরে ইতিহাসবিদরা।
এরপর সুভাষ বুঝতে পারলেন, ব্রিটিশ শাসন শুধু দেশের স্বাধীনতাই কেড়ে নেয়নি, ভারতীয়দের আত্মসম্মানও পদদলিত করছে।
তাই তিনি প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে বহিষ্কারের পর স্কটিশ চার্চ কলেজে ভর্তি হন। সেখানে দর্শনশাস্ত্র নিয়ে পড়াশোনা করেন। ভারতীয় দর্শন, পাশ্চাত্য দর্শন, গীতা, উপনিষদ, বেদান্ত সবকিছুই গভীর মনোযোগ দিয়ে অধ্যয়ন করেন। এই সময় তাঁর রাজনৈতিক চিন্তাভাবনা আরও পরিণত হতে শুরু করে। তিনি উপলব্ধি করেন, একটি জাতির মুক্তির জন্য শুধু আবেগ দিয়ে কিছু হবে না, এরজন্য প্রয়োজন সুস্পষ্ট পরিকল্পনা, সংগঠন এবং নেতৃত্বের দরকার।
তখন সাল ১৯১৯ প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হলেও বিশ্বজুড়ে অস্থিরতা তখনও কাটেনি। একই সময়ে ভারতের ইতিহাসে ঘটে যায় জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড। ১৩ এপ্রিল অমৃতসরে নিরস্ত্র মানুষের ওপর ব্রিটিশ সেনাদের নির্বিচার গুলিবর্ষণ গোটা দেশকে স্তম্ভিত করে দেয়। এই ঘটনার প্রতিবাদে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ব্রিটিশ সরকারের দেওয়া ‘নাইট‘ উপাধি ফিরিয়ে দেন।
জালিয়ানওয়ালাবাগের এই হত্যাকাণ্ড তরুণ সুভাষচন্দ্র বসুর মনেও গভীর প্রভাব ফেলে। এমন সময়, ১৯১৯ সালের সেপ্টেম্বরে তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য ইংল্যান্ডে পাড়ি জমান। তবে তাঁর এই যাত্রা শুধু পড়াশোনার জন্য ছিল না; ইংল্যান্ডে গিয়েই তিনি এমন কিছু সিদ্ধান্ত নেন, যা পরবর্তীতে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে।
এরপর ১৯১৯ সালের সেপ্টেম্বরে সুভাষচন্দ্র বসু ইংল্যান্ডে পৌঁছান। পরিবারের ইচ্ছা ছিল তিনি ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিস (আইসিএস) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ব্রিটিশ সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হবেন। সে সময় আইসিএস ছিল ব্রিটিশ ভারতের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ চাকরিগুলোর একটি। এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া ছিল অত্যন্ত কঠিন, আর যারা সফল হতেন, তারা সমাজে বিশেষ সম্মান ও প্রভাবের অধিকারী হতেন। ইংল্যান্ডে গিয়ে তিনি কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিৎসউইলিয়াম হলে ভর্তি হন। পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি ইউরোপের রাজনীতি, ইতিহাস, দর্শন এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নিয়ে গভীরভাবে অধ্যয়ন করতে শুরু করেন। তিনি বুঝতে পারেন, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের শক্তির পাশাপাশি তাদের দুর্বলতাও রয়েছে। একই সঙ্গে তিনি উপলব্ধি করেন, ভারতের স্বাধীনতা অর্জন করতে হলে শুধু আবেগে কিছু হবে না, দরকার সুসংগঠিত নেতৃত্ব, পরিকল্পনা এবং আত্মত্যাগের।
যদি তিনি আইসিএস পরীক্ষা দেওয়া থেকে বিরত থাকেনি, মাত্র কয়েক মাসের প্রস্তুতিতেই ১৯২০ সালের আইসিএস পরীক্ষায় চতুর্থ স্থান অর্জন করেন সুভাষ। তাঁর এই সাফল্যে পরিবার, বন্ধু এবং শুভাকাঙ্ক্ষীরা আনন্দিত হন। অনেকেই মনে করেছিলেন, সুভাষচন্দ্রের সামনে উজ্জ্বল প্রশাসনিক জীবনের দরজা খুলে গেছে। কিন্তু তাঁর নিজের মনের মধ্যে তখন চলছিল অন্য এক লড়াই।
তিনি ভাবতে শুরু করেন, যে সরকার নিজের দেশকে পরাধীন করে রেখেছে, সেই সরকারের কর্মকর্তা হয়ে কীভাবে দেশের মানুষের সেবা করা সম্ভব? ব্যক্তিগত সাফল্য এবং দেশের প্রতি দায়িত্ব—এই দুইয়ের মধ্যে তিনি দ্বিতীয়টিকেই বেছে নিলেন।
অবশেষে ১৯২১ সালে তিনি আইসিএসের চাকরি থেকে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেন। এমন সিদ্ধান্ত সে সময় খুব কম মানুষই কল্পনা করতে পেরেছিলেন। কারণ আইসিএস শুধু একটি চাকরি ছিল না, এটি ছিল ক্ষমতা, সম্মান এবং নিশ্চিত ভবিষ্যতের প্রতীক। সেই সুযোগ নিজের ইচ্ছায় ছেড়ে দেওয়া ছিল সুভাষের জন্য এক অসাধারণ আত্মত্যাগ।
বড় ভাই শরৎচন্দ্র বসুকে লেখা এক চিঠিতে সুভাষ লিখেছিলেন, “বহু কষ্ট এবং আত্মত্যাগের মধ্য দিয়েই শুধু একটি জাতিকে আমরা নির্মাণ করতে পারি।” এই একটি বাক্যেই তাঁর জীবনদর্শন স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
চাকরি ছেড়ে দেশে ফিরে তিনি দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের সঙ্গে দেখা করেন। চিত্তরঞ্জন দাশ তখন বাংলার অন্যতম জনপ্রিয় জাতীয়তাবাদী নেতা। তিনি খুব দ্রুত সুভাষচন্দ্রের মেধা, নেতৃত্বের ক্ষমতা এবং দেশপ্রেম উপলব্ধি করেন। তাঁর উৎসাহেই সুভাষচন্দ্র সক্রিয়ভাবে স্বাধীনতা আন্দোলনে যোগ দেন। এরপরেই অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি কলকাতা কর্পোরেশনের প্রশাসনিক কাজে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পান। পরে দেশবন্ধু যখন কলকাতার মেয়র নির্বাচিত হন, তখন সুভাষচন্দ্র কর্পোরেশনের প্রধান নির্বাহী আধিকারিক হিসেবে কাজ করেন। এই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তিনি প্রশাসনিক দক্ষতার পরিচয় দেন এবং সাধারণ মানুষের সমস্যার সমাধানে আন্তরিকভাবে কাজ করেন। একই সময়ে তিনি কংগ্রেসের যুব সংগঠনের সঙ্গেও যুক্ত হন। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে তরুণদের স্বাধীনতা আন্দোলনে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানাতে শুরু করেন। তাঁর বক্তৃতা ছিল স্পষ্ট, যুক্তিনির্ভর এবং উদ্দীপনামূলক। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি যুবসমাজের অন্যতম জনপ্রিয় নেতা হয়ে ওঠেন। ব্রিটিশ সরকার অবশ্য তাঁর এই উত্থান ভালোভাবে নেয়নি। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ভূমিকার কারণে তাঁকে একাধিকবার গ্রেপ্তার করা হয়। পরে কারাবাস, নজরদারি এবং সরকারি হয়রানি তাঁর জীবনের নিয়মিত অংশ হয়ে ওঠে। কিন্তু কোনো বাধাই সুভাষ কে তাঁর লক্ষ্য থেকে সরাতে পারেনি।
সুভাষচন্দ্র বিশ্বাস করতেন, ভারতের স্বাধীনতা কেবল রাজনৈতিকভাবে স্বাধীনতা নয়; একটি আধুনিক, শিক্ষিত, বৈজ্ঞানিক ও আত্মনির্ভর রাষ্ট্র গড়াও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তাই তিনি স্বাধীনতার পাশাপাশি ভবিষ্যতের ভারত কেমন হবে, সেই পরিকল্পনাও করতে শুরু করেছিলেন।
এরপর , ১৯২০ এর দশকের শেষভাগ এবং ১৯৩০ এর দশকে সুভাষচন্দ্র বসু ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের অন্যতম জনপ্রিয় নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন। তাঁর সাংগঠনিক দক্ষতা, স্পষ্ট বক্তব্য এবং আপসহীন মনোভাব তাঁকে তরুণদের কাছে বিশেষভাবে জনপ্রিয় করে তোলে। তিনি বিশ্বাস করতেন, শুধু দাবি জানিয়ে নয়, প্রয়োজনে কঠোর সংগ্রামের মাধ্যমেও স্বাধীনতা অর্জন করতে হবে।
১৯২৮ সালে কলকাতায় অনুষ্ঠিত কংগ্রেসের অধিবেশনে তিনি পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি জোরালোভাবে তুলে ধরেন। তখন কংগ্রেসের অনেক শীর্ষ নেতা ব্রিটিশদের কাছ থেকে ধাপে ধাপে স্বায়ত্তশাসনের পক্ষে ছিলেন। কিন্তু সুভাষচন্দ্র এবং জওহরলাল নেহরু মনে করতেন, ভারতের লক্ষ্য হওয়া উচিত সম্পূর্ণ স্বাধীনতা। পরে এই দাবিই কংগ্রেসের মূল অবস্থানে পরিণত হয়।
স্বাধীনতা আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকার কারণে সুভাষচন্দ্রকে বারবার কারাবরণ করতে হয়। ব্রিটিশ সরকার তাঁকে বিপজ্জনক রাজনৈতিক নেতা হিসেবে দেখত। জেলজীবনে তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে চিকিৎসার জন্য তাঁকে ইউরোপে যাওয়ার অনুমতি দিলে।
ইউরোপে অবস্থানকালে তিনি ইতালি, জার্মানি, অস্ট্রিয়া, আয়ারল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশ সফর করেন। বিশ্বের বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যবস্থা, অর্থনীতি এবং প্রশাসনিক কাঠামো সম্পর্কে তিনি ধারণা নেন। একই সময়ে তিনি ‘The Indian Struggle‘ বইয়ের প্রথম খণ্ড লেখেন, যেখানে ১৯২০ থেকে ১৯৩৪ সালের ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাস তুলে ধরেন। বইটি প্রকাশের পর ব্রিটিশ সরকার ভারতে এর প্রচার নিষিদ্ধ করে দেয়।
১৯৩৮ সালে গুজরাটের হরিপুরা অধিবেশনে সুভাষচন্দ্র বসু ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচিত হন। সভাপতি হিসেবে তিনি স্বাধীন ভারতের জন্য একটি আধুনিক রাষ্ট্রের পরিকল্পনা তুলে ধরেন। শিল্পায়ন, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, পরিকল্পিত অর্থনীতি এবং শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর তিনি বিশেষ গুরুত্ব দেন। তাঁর এই দূরদর্শী চিন্তাভাবনা সে সময় অনেকের প্রশংসা কুড়ায়। ১৯৩৯ সালে ত্রিপুরী অধিবেশনে তিনি আবারও কংগ্রেস সভাপতি নির্বাচিত হন। তবে এবার মহাত্মা গান্ধী সমর্থিত প্রার্থী পট্টাভি সীতারামাইয়াকে পরাজিত করে তিনি জয়ী হন। এই নির্বাচন কংগ্রেসের ভেতরে বড় ধরনের মতবিরোধ সৃষ্টি করে। যদিও তিনি নির্বাচনে জয়ী হয়েছিলেন, কিন্তু কার্যকরভাবে কাজ করার মতো সমর্থন পাননি।
এদিকে ইউরোপে যখন যুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছিল এবং তখন সুভাষ সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে বড় আন্দোলন গড়ে তোলার কথা ভাবেন। অন্যদিকে গান্ধীজি অহিংস আন্দোলনের পথেই এগিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। এই আদর্শগত মতপার্থক্য ক্রমশ বাড়তে থাকলে। একসময় ১৯৩৯ সালের এপ্রিলে সুভাষচন্দ্র কংগ্রেস সভাপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেন। একই বছর তিনি ফরওয়ার্ড ব্লক নামে নতুন রাজনৈতিক সংগঠন গঠন করেন। এর উদ্দেশ্য ছিল স্বাধীনতার দাবিতে সব জাতীয়তাবাদী শক্তিকে একত্রিত করতে হবে।
অপরদিকে, ব্রিটিশ সরকার তাঁর কর্মকাণ্ড নিয়ে আরও উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। আবারও ১৯৪০ সালে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। জেলে তিনি অনশন শুরু করলে তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে। পরে সরকার তাঁকে মুক্তি দিলেও কলকাতার বাড়িতে ফেরেন। যদিও বিট্রিশরা কলকাতার এলগিন রোডের বাড়িতে কঠোর নজরদারির মধ্যে গৃহবন্দি করে রাখে সুভাষ কে। কিন্তু সুভাষচন্দ্র থেমে থাকার মানুষ ছিলেন না। ১৯৪১ সালের ১৬ জানুয়ারি মাসে গভীর রাতে তিনি এক দুঃসাহসিক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেন। দাড়ি-গোঁফ বাড়িয়ে, পাঠান ব্যবসায়ীর ছদ্মবেশ ধারণ করে তিনি বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়েন। তাঁর ভাতিজা শিশির কুমার বসু গাড়ি চালিয়ে তাঁকে তৎকালীন বিহারের গোমোহ রেলস্টেশনে পৌঁছে দেন। সেখান থেকে তিনি ট্রেনে পেশোয়ার যান, পরে আফগানিস্তানের কাবুলে পৌঁছান। এরপর সোভিয়েত ইউনিয়ন হয়ে জার্মানিতে পৌঁছাতে সক্ষম হন।
এই পলায়ন ছিল ব্রিটিশ গোয়েন্দাদের জন্য এক বড় ধাক্কা। কড়া নজরদারির মধ্যেও কীভাবে তিনি দেশ ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন, তা নিয়ে ব্রিটিশ প্রশাসন দীর্ঘদিন বিস্মিত ছিল।
জার্মানিতে পৌঁছে সুভাষচন্দ্র ভারতীয় যুদ্ধবন্দিদের নিয়ে একটি বাহিনী গঠনের চেষ্টা শুরু করেন এবং বিদেশে বসেই ভারতের স্বাধীনতার জন্য আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ে উদ্যোগ নেন। তবে খুব দ্রুত তিনি বুঝতে পারেন, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ভারতীয়দের নিয়ে আরও বড় একটি সামরিক শক্তি গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে। সেই সময় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় হাজার হাজার ভারতীয় যুদ্ধবন্দি এবং প্রবাসী ভারতীয় ছিলেন, যাদের নিয়ে একটি শক্তিশালী বাহিনী গড়ে তোলার সুযোগ ছিল সুভাষের। সেই লক্ষ্যেই তিনি ১৯৪৩ সালে দীর্ঘ ও ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রযাত্রা করে জাপানে পৌঁছান। এরপর তিনি সিঙ্গাপুরে যান, যেখানে তাঁর সঙ্গে দেখা হয় প্রবীণ বিপ্লবী রাসবিহারী বসুর। তিনি আজাদ হিন্দ ফৌজের নেতৃত্ব আনুষ্ঠানিকভাবে সুভাষচন্দ্র বসুর হাতে তুলে দেন। সেই সময় থেকেই সুভাষচন্দ্র বসু সবার কাছে আরও বেশি পরিচিত হয়ে ওঠেন ‘নেতাজি‘ নামে।
নেতৃত্ব হাতে নেওয়ার পর তিনি আজাদ হিন্দ ফৌজকে নতুনভাবে সংগঠিত করেন। প্রবাসী ভারতীয়, যুদ্ধবন্দি এবং স্বাধীনতাকামী তরুণদের নিয়ে তিনি একটি সুশৃঙ্খল বাহিনী গড়ে তোলেন। সৈনিকদের উদ্দেশে তিনি বলতেন,
স্বাধীনতা কেউ দান করে না, সংগ্রাম করেই তা অর্জন করতে হয়।
তাঁর সেই ঐতিহাসিক আহ্বান,
তোমরা আমাকে রক্ত দাও, আমি তোমাদের স্বাধীনতা দেব
এই কথা মুহূর্তেই লাখো মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে এবং স্বাধীনতার লড়াইয়ে নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি করে।
১৯৪৩ সালের ২১ অক্টোবর নেতাজি আজাদ হিন্দ সরকার গঠনের ঘোষণা দেন। এটি ছিল ভারতের বাইরে গঠিত প্রথম অস্থায়ী স্বাধীন সরকার। এই সরকারের রাষ্ট্রপ্রধান, প্রধানমন্ত্রী এবং যুদ্ধমন্ত্রী সব দায়িত্বই তিনি নিজে পালন করেন। জাপান, জার্মানি, ইতালিসহ কয়েকটি দেশ এই সরকারকে স্বীকৃতি দেয়। পরে আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের প্রশাসনিক দায়িত্বও আজাদ হিন্দ সরকারের হাতে তুলে দেওয়া হয়। নেতাজি এই দুটি দ্বীপের নাম রাখেন ‘শহীদ‘ ও ‘স্বরাজ‘।
আজাদ হিন্দ ফৌজে নারীদের জন্যও একটি বিশেষ বাহিনী গঠন করা হয়, যার নাম ছিল রানি ঝাঁসি রেজিমেন্ট। ক্যাপ্টেন লক্ষ্মী স্বামীনাথনের নেতৃত্বে গঠিত এই বাহিনীতে বহু নারী যোগ দেন। সে সময় নারীদের নিয়ে সামরিক বাহিনী গঠন ছিল অত্যন্ত সাহসী ও ব্যতিক্রমী উদ্যোগ।
এদিকে ১৯৪৪ সালে আজাদ হিন্দ ফৌজ জাপানি বাহিনীর সহযোগিতায় ভারতের উত্তর-পূর্ব সীমান্তের দিকে অগ্রসর হয়। এরপর মণিপুরের মোইরাংয়ে আজাদ হিন্দ ফৌজ স্বাধীন ভারতের পতাকা উত্তোলন করে। এটি ছিল ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের এক স্মরণীয় মুহূর্ত। তবে এরপর ইম্ফল ও কোহিমার যুদ্ধে জাপানের পরাজয়ের ফলে পুরো পরিস্থিতি বদলে যায়। খাদ্য, অস্ত্র ও রসদের অভাবে আজাদ হিন্দ ফৌজকে ধীরে ধীরে পিছু হটতে হয়।
যদিও সামরিকভাবে এই অভিযান সফল হয়নি সুভাষের আজাদ হিন্দ ফৌজ, তবুও আজাদ হিন্দ ফৌজ ভারতীয়দের মনে স্বাধীনতার নতুন আশা জাগিয়ে তুলেছিল। যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর আজাদ হিন্দ ফৌজের কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দিল্লির লালকেল্লায় বিচার শুরু হলে সারা দেশে তীব্র প্রতিবাদ ছড়িয়ে পড়ে। কংগ্রেস, মুসলিম লীগসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এই বিচারের বিরোধিতা করে। ইতিহাসবিদদের অনেকের মতে, এই ঘটনাগুলো ব্রিটিশ সরকারকে বুঝিয়ে দেয় যে ভারতে তাদের শাসন দীর্ঘদিন ধরে টিকিয়ে রাখা আর সম্ভব নয়।
এদিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধও শেষের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। জাপান আত্মসমর্পণ করার পর নেতাজি নতুন পরিকল্পনা নিয়ে অন্যত্র যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ১৯৪৫ সালের ১৮ আগস্ট তাইওয়ানের তৎকালীন তাইহোকু বিমানবন্দর থেকে উড্ডয়নের কিছুক্ষণ পর তাঁর যাত্রীবাহী জাপানি সামরিক বিমানটি দুর্ঘটনার কবলে পড়ে। জাপানি সূত্রে দাবি করা হয়, গুরুতর দগ্ধ অবস্থায় তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হলেও সেদিনই তাঁর মৃত্যু হয়।
কিন্তু এই ঘটনাকে সবাই মেনে নেননি। অনেকের বিশ্বাস ছিল, নেতাজি সেই দুর্ঘটনায় মারা যাননি। স্বাধীনতার পর তাঁর মৃত্যুর সত্যতা জানতে ভারত সরকার একাধিক তদন্ত কমিশন গঠন করে। তবে বিভিন্ন কমিশনের প্রতিবেদনে ভিন্ন ভিন্ন মত উঠে আসায় তাঁর মৃত্যুর রহস্য আজও পুরোপুরি উন্মোচিত হয়নি।
উল্লেখ্য যে, কটকের এক সাধারণ পরিবারে জন্ম নেওয়া সেই ছেলেটি একদিন হয়ে উঠেছিলেন কোটি কোটি মানুষের ‘নেতাজি’। জীবনের প্রতিটি বাঁকে তিনি ব্যক্তিগত সাফল্যের চেয়ে দেশের স্বার্থকে বড় করে দেখেছিলেন। আইসিএসের মতো সম্মানজনক চাকরি ত্যাগ করা, বারবার কারাবরণ, গৃহবন্দি অবস্থা থেকে দুঃসাহসিকভাবে দেশত্যাগ, বিদেশের মাটিতে আজাদ হিন্দ ফৌজ গঠন এবং স্বাধীনতার জন্য শেষ পর্যন্ত লড়াই ও সবকিছুই প্রমাণ করে, তাঁর কাছে স্বাধীনতা ছিল জীবনের চেয়েও বড় আদর্শ।

