‘বাংলাদেশি’ সন্দেহে গ্রেফতার হওয়ার পর টানা ৮৮ দিন জেলে থাকার পর অবশেষে জামিন পেলেন উত্তর দিনাজপুরের করণদিঘির বালিয়ামোড়ের ৬৬ বছরের বাসিন্দা জলিল আখতার। ইসলামপুর আদালতের নির্দেশে শর্তসাপেক্ষে জেল থেকে মুক্তি পেয়েছেন তিনি। জলিলের মুক্তির পরই পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন রাজ্যসভার সাংসদ সামিরুল ইসলাম।
পরিবারের দাবি, জলিল ভারতেরই নাগরিক। তাঁর কাছে ভোটার পরিচয়পত্র, আধার, রেশন কার্ড ও প্যান কার্ড-সহ একাধিক সরকারি নথি রয়েছে। পরিবারের দাবি, ২০০২ সালের ভোটার তালিকাতেও তাঁর নাম ছিল। ২০২৬ সালের SIR-এর চূড়ান্ত ভোটার তালিকাতেও তাঁর নাম রয়েছে। চলতি বছর তিনি নিজের ভোটও দিয়েছেন বলে পরিবারের তরফে জানানো হয়েছে।
গত ১৯ জুন রাতে করণদিঘির বালিয়ামোড় এলাকা থেকে জলিলকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যায় ডালখোলা থানার পুলিশ। পরিবারের অভিযোগ, ঘুমন্ত অবস্থায় তাঁকে নিয়ে যাওয়ার পর বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী সন্দেহে তাঁর বিরুদ্ধে ফরেনার্স অ্যাক্টে মামলা রুজু করা হয়। প্রথমে তাঁকে ফুলবাড়ি হোল্ডিং সেন্টার ও পরে চাকুলিয়ার ডিটেনশন ক্যাম্পে রাখা হয়। এরপর তাঁকে জেল হেফাজতে পাঠানো হয়।
জলিলের মেয়ে কুলসুম খাতুনের অভিযোগ ছিল, বাবাকে নিয়ে যাওয়ার পর পুলিশ জানিয়েছিল বৈধ কাগজপত্র দেখাতে পারলে তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হবে। পরিবারের তরফে প্রয়োজনীয় নথি জমা দেওয়া হলেও জলিলকে দীর্ঘদিন জেলে থাকতে হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন তিনি। ৬৬ বছরের জলিলের শারীরিক অবস্থাও নিয়ে উদ্বেগে ছিল পরিবার। কুলসুমের দাবি, তাঁর বাবার হাই ডায়াবিটিস রয়েছে এবং দীর্ঘদিন ধরে এই পরিস্থিতির ধকল তাঁর পক্ষে অত্যন্ত কঠিন হয়ে উঠেছিল।
এর পর দীর্ঘ আইনি লড়াই চলে। সম্প্রতি ইসলামপুর মহকুমা আদালতে মামলার শুনানিতে জলিলের পক্ষে বিভিন্ন নথি পেশ করা হয়। তাঁর ভোটার পরিচয়পত্র, আধার ও রেশন কার্ড-সহ নাগরিকত্বের দাবির সমর্থনে একাধিক কাগজপত্র আদালতে তুলে ধরা হয়। শুনানির পর তদন্তে সহযোগিতা এবং মামলার নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত নিজের এলাকা না ছাড়ার শর্তে তাঁর জামিন মঞ্জুর করে আদালত। ৮৮ দিনের বন্দিদশার পর অবশেষে জেল থেকে বেরিয়ে আসেন জলিল।
জলিলের আইনজীবী সাহিদ রেজা জানান, দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর এই জামিন সম্ভব হয়েছে । মামলার বিভিন্ন দিক আদালতে তুলে ধরার পাশাপাশি জলিলের পক্ষে প্রয়োজনীয় নথিও পেশ করা হয়েছিল বলে জানান তিনি।
অন্য দিকে, পুলিশের ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন জলিলের মাসতুতো ভাই মতিউর রহমান। তাঁর অভিযোগ, জলিলকে ঘিরে তৈরি হওয়া ঘটনায় শুধু তিনি নন, তাঁর পুরো পরিবারকেই দীর্ঘদিন ধরে ভোগান্তির মধ্যে পড়তে হয়েছে। অপ্রয়োজনীয় ভাবে একটি পরিবারকে এমন পরিস্থিতির মধ্যে ঠেলে দেওয়া হয়েছে বলেও দাবি তাঁর।
জলিলের মুক্তির পর সোশ্যাল মিডিয়ায় সরব হন রাজ্যসভার সাংসদ সামিরুল ইসলাম। আদালতের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, জলিলের ভোটার কার্ড, আধার ও রেশন কার্ডের মতো সরকারি নথি থাকা সত্ত্বেও কেন তাঁকে শুধুমাত্র বাংলাদেশি সন্দেহে এত দিন হয়রানির মুখে পড়তে হল। গ্রেফতারের আগে পুলিশ ওই নথিগুলি যথাযথ ভাবে যাচাই করেছিল কি না, সেই প্রশ্নও তুলেছেন তিনি।
সামিরুলের অভিযোগ, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ভারতীয় নাগরিক হিসেবে থাকা এক ব্যক্তিকে শুধুমাত্র সন্দেহের ভিত্তিতে এমন পরিস্থিতির মধ্যে পড়তে হয়েছে। এই ঘটনার জন্য কে দায় নেবে এবং অভিযুক্ত পুলিশ আধিকারিকদের বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না, সেই প্রশ্নও তুলেছেন তিনি। পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গ পুলিশকে গোটা বিষয়টি দ্রুত খতিয়ে দেখার আবেদন জানিয়েছেন সাংসদ।
জলিলকে আটক করার পর থেকেই প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন ভোটাধিকার সুরক্ষা সমন্বয় সমিতির আহ্বায়ক দুলাল রাজবংশী। তাঁর প্রশ্ন ছিল, জলিল যদি বৈধ ভারতীয় নাগরিক না হন, তা হলে তাঁর স্ত্রী, ছেলে ও মেয়ের নাগরিকত্ব নিয়েও একই ধরনের প্রশ্ন ওঠার কথা। কিন্তু তাঁদের বিরুদ্ধে একই ধরনের কোনও পদক্ষেপ করা হয়নি কেন—সেই প্রশ্নই তুলেছিলেন তিনি।
প্রিমিয়াম PVC কার্ড অর্ডার করুন
ওয়াটারপ্রুফ • টেকসই • ফাস্ট ডেলিভারি
💬 WhatsApp এ ক্লিক করুন
