রাখিবন্ধন উৎসবের মঞ্চ থেকে দেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও ‘আজাদি’ স্লোগান প্রসঙ্গে মুখ খুলেছিলেন বঙ্গ বিজেপির মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর লড়াই, মাতঙ্গিনী হাজরার আত্মত্যাগ এবং দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামীদের বলিদানের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “দেশের বাইরে তো শত্রুরা আছে। দেশের ভিতর থেকে আমরা খুব কষ্ট লাগে যখন দেখি কলকাতার রাস্তায় আজাদি, আজাদি। কীসের আজাদি ভাই? আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামীদের ত্যাগ, নেতাজির লড়াই, মাতঙ্গিনী হাজরার বলিদান মনে রাখতে হবে। আমরা তো ১৯৪৫ সালে স্বাধীনতা পেয়েছি।” তাঁর এই বক্তব্যের শেষ অংশ নিয়েই শুরু হয়েছে প্রশ্ন।
তাহলে কি ভারত ১৯৪৭ এর দুই বছর আগেই স্বাধীন হয়েছিল?

ইতিহাসের স্বীকৃত তথ্য ও দাপ্তরিক দলিলপত্র অনুযায়ী, ভারত ১৯৪৫ সালে নয়, বরং স্বাধীনতা লাভ করেছে ১৯৪৭ সালের আগস্ট মাসে। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের আনুষ্ঠানিক অবসানের মাধ্যমেই মূলত ভারতীয় উপমহাদেশে এই নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছিল। ১৯৪৭ সালের জুলাই মাসে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে পাস হওয়া ‘Indian Independence Act, 1947’-এর মাধ্যমে ভারত ও পাকিস্তান—দুটি নতুন ডোমিনিয়নের সৃষ্টি হয়।
ভারত প্রতি বছর ১৫ অগাস্ট স্বাধীনতা দিবস পালন করে। ২০২৬ সালে ভারত ৮০তম স্বাধীনতা দিবস উদযাপন করেছে। ১৪ অগাস্টের শেষ এবং ১৫ অগাস্টের সূচনালগ্নে, অর্থাৎ মধ্যরাতে ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটে এবং ভারত স্বাধীনতা লাভ করে। ভারতের শেষ ভাইসরয় লর্ড লুই মাউন্টব্যাটেন ১৫ অগাস্ট তারিখটি বেছে নিয়েছিলেন। এর সঙ্গে ১৯৪৫ সালের একটি ঘটনার যোগও রয়েছে।
কী হয়েছিল ১৯৪৫ সালে?
১৯৪৫ সালের ১৫ অগাস্ট দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে জাপান মিত্রশক্তির কাছে আত্মসমর্পণের ঘোষণা করে। এই ঘটনাটি মাউন্টব্যাটেনের কাছে ব্যক্তিগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। সেই কারণেই ১৫ অগাস্ট তারিখটি ভারতের স্বাধীনতার জন্য বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে ওই ঘটনার প্রভাব ছিল বলে ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা রয়েছে।
অর্থাৎ, ১৯৪৫ সাল ভারতের স্বাধীনতার বছর নয়; বরং ১৯৪৫ সালের ১৫ অগাস্টের একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক ঘটনা ১৯৪৭ সালে ভারতের স্বাধীনতার তারিখ নির্ধারণের সঙ্গে সম্পর্কিত।
আসলে ১৯৪৫ সাল ভারতের স্বাধীনতার বছর নয়; তবে সে বছরের ১৫ আগস্টের একটি বড় আন্তর্জাতিক ঘটনা ১৯৪৭ সালে আমাদের স্বাধীনতার তারিখ নির্ধারণের পেছনে ভূমিকা রেখেছিল (দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানের আত্মসমর্পণের দিনটিকে লর্ড মাউন্টব্যাটেন ভারতের স্বাধীনতার তারিখ হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন)।
এরপর আসে সেই ঐতিহাসিক মুহূর্ত—ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীন হওয়ার ঠিক প্রাক্কালে জওহরলাল নেহরু তাঁর অমর ভাষণ ‘Tryst with Destiny’ দেন। অতপর ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট নবগঠিত ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি দিল্লির লালকেল্লায় জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন। আর তখন থেকেই এই দিনটি ভারতের গৌরবময় স্বাধীনতা দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে।
তবে ১৯৪৫ সালের ১৫ অগাস্ট ভারতের জন্য না হলেও আরেকটি দেশের ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিন ছিলো। সেদিনই কোরীয় উপদ্বীপে জাপানি ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান ঘটে। ১৯১০ সাল থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত কোরিয়া জাপানের ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানের পরাজয়ের পর ১৫ অগাস্ট কোরীয় উপদ্বীপ জাপানের শাসন থেকে মুক্ত হয়।
এই দিনটি উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়ায় ‘মুক্তি দিবস’ হিসেবে পালিত হয়। দক্ষিণ কোরিয়ায় এর নাম ‘গওয়াংবোকজল’, যার অর্থ স্বাধীনতার আলো ফিরে আসা। উত্তর কোরিয়াতেও ১৫ অগাস্টকে জাপানি ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্তির দিন হিসেবে স্মরণ করা হয়।
তবে এখানেও একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। ১৯৪৫ সালে কোরিয়া জাপানি শাসন থেকে মুক্তি পেলেও তখনই উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়া নামে দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র তৈরি হয়নি। ১৯৪৮ সালে পৃথক সরকার গঠনের মাধ্যমে বর্তমান উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় কাঠামো প্রতিষ্ঠিত হয়।
ফলে ১৯৪৫ সালের সঙ্গে ‘স্বাধীনতা’র সম্পর্ক থাকলেও ভারতের ক্ষেত্রে সেই বছরটি স্বাধীনতার বছর নয়। ভারতের স্বাধীনতার স্বীকৃত তারিখ ১৫ অগাস্ট ১৯৪৭।
প্রসঙ্গত, খোদ রাজ্যের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর একটি সাম্প্রতিক মন্তব্য ঘিরে রাজনৈতিক মহলে শোরগোল পড়ে গিয়েছে। প্রকাশ্য মঞ্চে তাঁর মুখে “১৯৪৫ সালে স্বাধীনতা পেয়েছি” মন্তব্যটি শোনার পর থেকেই শুরু হয়েছে নানামুখী বিতর্ক। রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠেছে, মুখ্যমন্ত্রী কি ইচ্ছাকৃতভাবে ১৯৪৫ সালের কোনো বিশেষ ঐতিহাসিক ঘটনার দিকে ইঙ্গিত করতে চেয়েছিলেন, নাকি স্রেফ অসাবধানতাবশত ভুল সাল উচ্চারণ করেছেন?

যারা ভারতের স্বাধীনতার সাল নিয়ে বিভ্রান্তিতে আছেন, তাদের জন্য এটিই সবচেয়ে বড় প্রমাণ। ১৯৪৭ সালের ১৫ই আগস্ট সকালের এই সংবাদপত্রটি স্পষ্ট করে দেয় যে, ওই দিনই দেশজুড়ে স্বাধীনতার সূর্য উদিত হয়েছিল, ১৯৪৫ সালে নয়।

