রাজ্যের উচ্চশিক্ষা ক্ষেত্রে বড়সড় প্রশাসনিক রদবদল ঘটাতে এবার কড়া পদক্ষেপ নিল রাজ্য সরকার। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, শিক্ষক ও অশিক্ষক কর্মীদের এক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে বদলির পথ সুগম করতে আনা আইনি সংশোধনী বিলটি পাস হয়ে গেল বিধানসভায়। বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর, রাজ্য বিধানসভার এক দিনের বিশেষ অধিবেশনে তীব্র বাদানুবাদ ও ভোটাভুটির পর সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে পাস হয় বহুচর্চিত ‘দ্য ওয়েস্ট বেঙ্গল ইউনিভার্সিটিজ অ্যান্ড কলেজেস (অ্যাডমিনিস্তরেশন অ্যান্ড রেগুলেশন অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল, ২০২৬।
রাজ্যের উচ্চশিক্ষামন্ত্রী জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায় বিলটি আলোচনার জন্য পেশ করার পর শাসক ও বিরোধী শিবিরের মধ্যে তুমুল বিতর্ক তৈরি হয়। শেষ পর্যন্ত ১৭১ জন বিধায়ক বিলের পক্ষে এবং ১৫ জন বিপক্ষে ভোট দেন। একই দিনে রাজ্যের ২১টি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভিডেন্ট ফান্ড সংক্রান্ত নিয়ম বদল করতে আরেকটি বিলও পাস করানো হয়।
উচ্চশিক্ষা দপ্তর সূত্রে খবর, ২০১৭ সালের মূল আইনের ১১ নম্বর ধারায় এতদিন শুধুমাত্র কলেজের শিক্ষক ও কর্মীদের বদলির আইনি এক্তিয়ার ছিল। কিন্তু রাজ্য সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মীদের জন্য এই ধরনের কোনো সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা ছিল না। নতুন সংশোধনী বিলে একটি নতুন ১৪এ (14A) ধারা যুক্ত করে সেই ঘাটতি পূরণ করা হচ্ছে।
কী এই বিল?
রাজ্যের এক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক এবং অশিক্ষক কর্মীদের বদলির পথ খুলতে চলেছে পশ্চিমবঙ্গ সরকার। মূলত প্রশাসনিক প্রয়োজন এবং নতুন বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে অভিজ্ঞ কর্মীদের দক্ষতা কাজে লাগানোর লক্ষ্যেই ২০১৭ সালের বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ প্রশাসন সংক্রান্ত আইনে নতুন ধারা ১৪এ যুক্ত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
প্রস্তাবিত সংশোধনী অনুযায়ী, প্রশাসনিক প্রয়োজন হলে রাজ্য সরকারের সঙ্গে পরামর্শ করে কোনও বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মীকে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে বদলি করতে পারবেন আচার্য। বদলির পরেও সংশ্লিষ্ট কর্মীর চাকরির নির্ধারিত সুযোগ-সুবিধা বজায় থাকবে বলে প্রস্তাবে জানানো হয়েছে।
নতুন নিয়মে বদলি হওয়া কর্মীদের সামনে দু’টি পথও রাখা হচ্ছে। তাঁরা চাইলে যে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম নিয়োগ পেয়েছিলেন, সেখানে নিজেদের লিয়েন বজায় রাখতে পারবেন। আবার চাইলে নতুন বিশ্ববিদ্যালয়েই স্থায়ীভাবে কাজ চালিয়ে যেতে পারবেন। জনস্বার্থে বদলি হওয়ার পর পুরনো বিশ্ববিদ্যালয়ে লিয়েন না রাখলে সংশ্লিষ্ট কর্মীর সিনিয়রিটি তাঁর প্রাথমিক নিয়োগের তারিখের ভিত্তিতেই নির্ধারিত হবে।
সরকারের যুক্তি, রাজ্যে তৈরি হওয়া নতুন এবং তুলনামূলক ছোট বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে বহু ক্ষেত্রে অভিজ্ঞ শিক্ষক ও কর্মীর প্রয়োজন রয়েছে। পুরনো প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলির অভিজ্ঞ শিক্ষক-কর্মীদের সেখানে কাজে লাগানো গেলে পঠনপাঠনের মানোন্নয়ন, প্রশাসনিক পরিকাঠামো গড়ে তোলা এবং উৎকর্ষকেন্দ্র হিসেবে নতুন প্রতিষ্ঠানগুলিকে বিকশিত করতে সুবিধা হবে।
এই প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী তথা সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, এই বদলির ব্যবস্থা কারও বিরুদ্ধে ক্ষোভ বা শাস্তিমূলক পদক্ষেপ হিসেবে ব্যবহার করা হবে না। বরং পুরনো ও প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে থাকা অভিজ্ঞ এবং পাণ্ডিত্যপূর্ণ শিক্ষকদের নতুন বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে পাঠিয়ে তাঁদের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগানোর লক্ষ্যই সরকারের।
সরকারের বক্তব্য, যাঁদের দীর্ঘদিনের শিক্ষাদান ও প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা রয়েছে, তাঁদের নতুন বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে কাজে লাগানো গেলে সেই প্রতিষ্ঠানগুলি দ্রুত শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে নতুন ও দুর্বল পরিকাঠামোর বিশ্ববিদ্যালয়গুলির উন্নয়নে এই ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে বলে মনে করছে সরকার।
প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় বদলির সঙ্গে যুক্ত খরচও রাজ্য সরকার বহন করতে পারে বলে সরকারি সূত্রে ইঙ্গিত মিলেছে। পাশাপাশি, আচার্যকে সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ হিসেবেও বিবেচনা করার কথা বলা হয়েছে।
তবে প্রস্তাবিত এই ব্যবস্থাকে ঘিরে আশঙ্কাও প্রকাশ করেছেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অধ্যাপক। তাঁর বক্তব্য, রাজ্যের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনও শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীর বহু পদ শূন্য রয়েছে। সেই শূন্যপদ পূরণ এবং সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়গুলির প্রয়োজনীয় উন্নয়নের পরিবর্তে কর্মীদের এক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
অধ্যাপকের আশঙ্কা, বর্তমানে রাজ্যের যে কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও নিজেদের শিক্ষার মান ধরে রাখার চেষ্টা করছে, সেখান থেকে অভিজ্ঞ শিক্ষক বা কর্মীদের অন্যত্র বদলি করা হলে সেই প্রতিষ্ঠানগুলিও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাঁর কথায়, নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অবশ্যই প্রয়োজন, কিন্তু তার জন্য প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলির শক্তি কমিয়ে দেওয়া হলে শেষ পর্যন্ত রাজ্যের সামগ্রিক উচ্চশিক্ষার মানই প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।
যদিও সমস্ত সমালোচনা ও বিরোধিতার কড়া জবাব দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। বিধানসভার অধিবেশনে দাঁড়িয়ে তিনি সাফ জানান, এই বিল বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন এবং সরকারের প্রতি তাদের দায়বদ্ধতার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখবে। যারা দীর্ঘদিন ধরে কলকাতা বা শহরের প্রতিষ্ঠিত বড় বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে চাকরি করছেন, তাঁদের এবার ঝাড়গ্রাম বা কোচবিহারের মতো প্রত্যন্ত এলাকায় গড়ে ওঠা নতুন বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে গিয়ে পড়াতে হবে।
মুখ্যমন্ত্রী কড়া সুরে বলেন, “যাঁরা দেশের ভেতরে থেকে দেশকে অপমান করছেন, তাঁদের পরিষ্কার করা হবে। এই নিয়মে যাঁরা খুশি নন, তাঁরা চাইলে চাকরি ছেড়ে দিতে পারেন।” অভিজ্ঞ শিক্ষকদের এই আদান-প্রদানের ফলে নতুন পরিকাঠামোয় থাকা প্রতিষ্ঠানগুলি ঘুরে দাঁড়াবে এবং রাজ্যের মানবসম্পদের সঠিক ব্যবহার সম্ভব হবে বলেই সওয়াল করেছে সরকার।বিধানসভায় পাস হওয়ার পর বিলটি এখন রাজ্যপালের সম্মতির জন্য পাঠানো হচ্ছে। রাজভবনের সিলমোহর পেলেই গেজেট নোটিফিকেশনের মাধ্যমে বাংলার উচ্চশিক্ষা ইতিহাসে এই নতুন নিয়ম চূড়ান্তভাবে কার্যকর হবে।
প্রিমিয়াম PVC কার্ড অর্ডার করুন
ওয়াটারপ্রুফ • টেকসই • ফাস্ট ডেলিভারি
💬 WhatsApp এ ক্লিক করুন
