নির্বাচন কমিশনের অন্দরের মতপার্থক্য এ বার প্রকাশ্যে। দেশের ভোট পরিচালনার দায়িত্বে থাকা তিন সদস্যের কমিশনে গত ১০ মাসে অন্তত ১৪ বার লিখিত আপত্তি জানিয়েছেন দুই নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিংহ সঁধু এবং বিবেক জোশী। ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, কমিশনের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়ে তাঁরা আপত্তি জানিয়েছিলেন। এমনও হয়েছে, একই দিনে চার বার আপত্তি নথিভুক্ত করা হয়েছে।
কমিশনের তিন সদস্য হলেন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার এবং দুই নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিংহ সঁধু ও বিবেক জোশী। প্রতিবেদনে দাবি, ভোটার তালিকায় নতুন নাম তোলা, নাম বাদ দেওয়া, বাদ পড়া নাম ফেরানো এবং ভোটার তালিকার তথ্য ব্যবস্থাপনা-সহ একাধিক বিষয়ে দুই কমিশনারের আপত্তি ছিল।
নতুন ভোটার হিসেবে ভোটার তালিকায় নাম তুলতে ‘ফর্ম ৬’ পূরণ করতে হয়। সম্প্রতি সেই ফর্মে একটি নতুন তথ্য জানানোর নিয়ম করা হয়েছিল। আবেদনকারীকে জানাতে হত, তাঁর বাবা বা পিতামহের নাম আগের বিশেষ ভোটার তালিকা সংশোধন বা এসআইআর-এর তালিকায় ছিল কি না।
এই পরিবর্তন নিয়েই আপত্তি জানান সুখবীর সিংহ সঁধু। ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ১৩ অগস্ট তিনি এই পরিবর্তনকে ‘অবৈধ ও অননুমোদিত’ বলে আপত্তি জানান। তাঁর প্রশ্ন ছিল, সংশ্লিষ্ট আইন বা বিধি পরিবর্তন না করে শুধু কমিশনের সিদ্ধান্তে ফর্ম ৬-এ এমন নতুন শর্ত যোগ করা যায় কি না। নতুন ভোটারের নাম নথিভুক্ত করার সময় তাঁর বাবা বা পিতামহের পুরনো ভোটার তালিকায় থাকার তথ্য কেন প্রয়োজন এবং সেই তথ্য কী ভাবে ব্যবহার করা হবে, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।
ভোটার তালিকার ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা নিয়েও দুই কমিশনারের আপত্তির কথা উঠে এসেছে। এত দিন ভোটার তালিকা সংক্রান্ত বিভিন্ন কাজের জন্য ‘ইআরওনেট’ ব্যবস্থা ব্যবহার করা হত। বর্তমানে সেই তথ্য ‘ইসিআইনেট’ ব্যবস্থায় রাখা হচ্ছে। এই পরিবর্তনের ফলে স্থানীয় স্তরের নির্বাচনী নিবন্ধন আধিকারিক বা ইআরও-দের ক্ষমতা আগের তুলনায় কমে যাচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন সঁধু এবং জোশী বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
ভোটার তালিকায় নাম যোগ করা, সংশোধন করা বা নাম বাদ দেওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজে স্থানীয় আধিকারিকদের ভূমিকা কতটা থাকছে, সেই বিষয়েও তাঁদের আপত্তি ছিল বলে প্রতিবেদনে দাবি। একই সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের ডিরেক্টর জেনারেল সীমা খন্নার ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন সঁধু। ভোটার তালিকার পোর্টাল নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে একজন তথ্যপ্রযুক্তি আধিকারিকের এতটা ক্ষমতা থাকার আইনি ভিত্তি কী, তা স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন বলে তাঁর বক্তব্য ছিল।
পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকা ঘিরে আরও একটি প্রশ্ন উঠেছে ১৬.১০ লক্ষ আবেদনকে কেন্দ্র করে। সুপ্রিম কোর্টে নির্বাচন কমিশনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এসআইআর-এর পর পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকা সংক্রান্ত মোট ৩৮.৩১ লক্ষ আবেদন জমা পড়ে। এর মধ্যে ২২.২১ লক্ষ আবেদন করেছিলেন এমন ভোটারেরা, যাঁদের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়েছিল এবং তাঁরা নাম ফেরানোর আবেদন করেন। অন্য দিকে, ১৬.১০ লক্ষ আবেদন করা হয় ভোটার তালিকায় থাকা নাম বাদ দেওয়ার দাবিতে।
এই ১৬.১০ লক্ষ আবেদন নিয়েই প্রশ্ন তোলেন সঁধু। তিনি জানতে চান, নির্বাচন কমিশনের হয়ে এত বিপুল সংখ্যক নাম বাদ দেওয়ার আবেদন কারা করেছিলেন এবং তাঁদের এই আবেদন করার অনুমতি কে দিয়েছিল। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, এই প্রক্রিয়া সম্পর্কে সঁধু নিজে, অন্য নির্বাচন কমিশনার বিবেক জোশী এবং পশ্চিমবঙ্গের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক—কেউই আগে থেকে অবহিত ছিলেন না বলে সঁধুর বক্তব্য ছিল।
এত বিপুল সংখ্যক নাম বাদ দেওয়ার আবেদন কী ভাবে জমা পড়ল, তার পিছনে কী প্রক্রিয়া ছিল এবং কার অনুমোদন ছিল—সেই প্রশ্নই মূলত তুলেছিলেন সঁধু। ফলে শুধু ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার বিষয়টি নয়, সেই আবেদনগুলির উৎস এবং প্রক্রিয়াও এখন আলোচনার কেন্দ্রে।
এই রিপোর্ট প্রকাশ্যে আসার পর নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে রাজনৈতিক চাপানউতোরও শুরু হয়েছে। বিরোধী দলের একাধিক নেতা কমিশনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিও উঠেছে। সাম্প্রতিক নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন তুলে কোথাও কোথাও পুনর্নির্বাচনের দাবিও জানানো হয়েছে।
কংগ্রেস-সহ বিরোধী দলের নেতারা ভোটার তালিকা এবং এসআইআর নিয়ে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকার সমালোচনা করেছেন। নির্বাচন কমিশনের দুই সদস্যের লিখিত আপত্তির খবর সামনে আসার পর সেই বিতর্ক আরও জোরালো হয়েছে। তবে রাজনৈতিক নেতাদের এই বক্তব্য তাঁদের নিজস্ব রাজনৈতিক অবস্থান এবং অভিযোগ হিসাবেই এসেছে।
অন্য দিকে, কমিশনের অন্দরে মতপার্থক্যের যে ছবি প্রকাশ্যে এসেছে, তা নিয়ে নির্বাচন কমিশন নিজেই পাল্টা ব্যাখ্যা দিয়েছে। কমিশনের বক্তব্য, তিন সদস্যের মধ্যে কোনও বিষয়ে মতের পার্থক্য থাকা অস্বাভাবিক নয়। সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে কোনও কমিশনার নিজের মতামত বা আপত্তি নথিভুক্ত করতেই পারেন। সেটিকে কমিশনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের সঙ্গে মতবিরোধ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই বলে কমিশনের বক্তব্য।
নির্বাচন কমিশনের দাবি, এসআইআর-সহ সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তই তিন সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিশনে আলোচনা করে নেওয়া হয়েছে। গত ১০ মাসে প্রায় ৪০টি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং সেগুলির সিদ্ধান্ত তিন কমিশনারের সম্মতির ভিত্তিতেই হয়েছে বলে কমিশনের তরফে জানানো হয়েছে।
প্রিমিয়াম PVC কার্ড অর্ডার করুন
ওয়াটারপ্রুফ • টেকসই • ফাস্ট ডেলিভারি
💬 WhatsApp এ ক্লিক করুন
