২ অক্টোবর। আজ মহাত্মা গান্ধীর ১৫৭তম জন্মবার্ষিকী। দেশজুড়ে পালিত হচ্ছে গান্ধী জয়ন্তী। একই সঙ্গে দিনটি রাষ্ট্রপুঞ্জের আন্তর্জাতিক অহিংসা দিবস হিসেবেও পরিচিত। এই বিশেষ দিনে মহাত্মা গান্ধীর অহিংসার দর্শন ও নোবেল শান্তি পুরস্কারকে ঘিরে তাঁর দীর্ঘ ইতিহাস ফের সামনে এসেছে।
মহাত্মা গান্ধী ছিলেন অহিংস আন্দোলনের অন্যতম প্রধান প্রতীক। সত্যাগ্রহ, অহিংসা এবং আত্মত্যাগের মাধ্যমে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনের যে পথ তিনি দেখিয়েছিলেন, তা শুধু ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামেই নয়, পরবর্তীকালে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের শান্তি ও মানবাধিকার আন্দোলনেও প্রভাব ফেলেছে। কিন্তু এত বড় আন্তর্জাতিক প্রভাব থাকা সত্ত্বেও জীবদ্দশায় নোবেল শান্তি পুরস্কার পাননি তিনি।
গান্ধী জয়ন্তীর দিন নোবেল প্রাইজের পক্ষ থেকে সমাজমাধ্যমে মহাত্মা গান্ধীর একটি বক্তব্য স্মরণ করা হয়েছে। সেখানে লেখা হয়েছে, “There are many causes that I am prepared to die for but no causes that I am prepared to kill for.”
যার বাংলা অর্থ দাঁড়ায়, এমন অনেক কারণ রয়েছে যার জন্য তিনি মরতেও প্রস্তুত, কিন্তু এমন কোনও কারণ নেই যার জন্য তিনি কাউকে হত্যা করতে প্রস্তুত। গান্ধীর অহিংস দর্শনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত এই বক্তব্যটিই তাঁর জন্মবার্ষিকীতে তুলে ধরেছে নোবেল প্রাইজ।
একই পোস্টে নোবেল প্রাইজ জানিয়েছে, মহাত্মা গান্ধী নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য ১২ বার মনোনীত হয়েছিলেন। তবে কোনও বছরই তাঁর হাতে ওঠেনি এই আন্তর্জাতিক সম্মান। nobelprize.org এর বিস্তারিত ঐতিহাসিক নথিতেও গান্ধীর নোবেল মনোনয়ন এবং তাঁকে পুরস্কার না দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা রয়েছে।
নোবেলপ্রাইজ অর্গানাইজেশনের ‘Mahatma Gandhi, the missing laureate’ শীর্ষক লেখায় বলা হয়েছে, গান্ধী ১৯৩৭, ১৯৩৮, ১৯৩৯ এবং ১৯৪৭ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনীত হন। ১৯৪৮ সালেও তাঁর নাম মনোনয়নের তালিকায় আসে, তবে তার কয়েক মাস আগেই ৩০ জানুয়ারি তাঁর মৃত্যু হয়েছিল। সেই সময় নোবেল কমিটি তাঁকে মরণোত্তর পুরস্কার দেওয়ার সম্ভাবনাও বিবেচনা করেছিল।
তাহলে প্রশ্ন উঠতেই পারে, এতবার মনোনীত হওয়ার পরও কেন গান্ধীর হাতে ওঠেনি নোবেল শান্তি পুরস্কার? নোবেল প্রাইজ কমিটির প্রকাশিত নথিতে সেই সময়ের নোবেল কমিটির আলোচনার বিস্তারিত তথ্য রয়েছে। সেখানে দেখা যায়, গান্ধীর অহিংস আন্দোলন নিয়ে প্রশংসার পাশাপাশি তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েও কমিটির সদস্যদের মধ্যে প্রশ্ন ছিল। বিশেষ করে ১৯৪৭ সালে ভারত-পাকিস্তান সংঘাতের সময় তাঁর ভূমিকা নিয়ে কমিটির সদস্যদের মধ্যে মতপার্থক্য তৈরি হয়। সেই পরিস্থিতিতে গান্ধীকে শান্তি পুরস্কার দেওয়া উচিত কি না, তা নিয়ে শেষ পর্যন্ত ঐকমত্যে পৌঁছতে পারেনি কমিটি।
বিশেষ করে ১৯৪৭ সালের পরিস্থিতি গান্ধীর নোবেল মনোনয়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ভারত স্বাধীন হওয়ার পর দেশভাগকে কেন্দ্র করে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে তীব্র সংঘাত চলছিল। হিন্দু-মুসলিম হিংসা থামাতে গান্ধী তখন সক্রিয়ভাবে কাজ করছিলেন। নোবেল কমিটির সদস্যদের মধ্যে তাঁর ভূমিকা ও অহিংসার দর্শন নিয়ে আলোচনা হলেও শেষ পর্যন্ত তাঁকে পুরস্কার দেওয়া হয়নি।
তবে নোবেল শান্তি পুরস্কার না পেলেও গান্ধীর প্রভাব থেমে থাকেনি। দক্ষিণ আফ্রিকায় আইনজীবী হিসেবে কাজ করার সময় থেকেই বৈষম্য ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে তাঁর রাজনৈতিক ভাবনার বিকাশ শুরু হয়। সেখানেই তিনি সত্যাগ্রহ ও অহিংস প্রতিরোধের পদ্ধতি নিয়ে কাজ করেন। ১৯১৫ সালে ভারতে ফিরে আসার পর স্বাধীনতা আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন এবং ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে একের পর এক অহিংস আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন।
গান্ধীর অহিংসার ধারণা ছিল শুধু রাজনৈতিক কৌশল নয়, তাঁর কাছে এটি ছিল একটি নৈতিক অবস্থান। সত্যাগ্রহের মাধ্যমে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা, আইন অমান্য করলে তার শাস্তি গ্রহণ করা এবং প্রতিপক্ষের প্রতি ঘৃণা না রেখে নিজের দাবিতে অটল থাকার কথা তিনি তুলে ধরেছিলেন।
ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের পাশাপাশি হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতি এবং সমাজের পিছিয়ে থাকা মানুষের অধিকার নিয়েও গান্ধী কাজ করেছিলেন। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর সাম্প্রদায়িক হিংসা থামাতে তাঁর ভূমিকা বিশেষভাবে আলোচিত হয়। দিল্লি, কলকাতা-সহ বিভিন্ন জায়গায় তিনি শান্তির আবেদন করেন এবং মানুষের মধ্যে সম্প্রীতি ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেন।
গান্ধীর প্রভাব ভারতীয় সীমানার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। তাঁর অহিংস আন্দোলনের দর্শন পরবর্তীকালে বিশ্বের বিভিন্ন মানবাধিকার ও নাগরিক অধিকার আন্দোলনকে প্রভাবিত করে। তাঁর সত্যাগ্রহ ও অহিংস প্রতিরোধের ধারণা নিয়ে আজও বিভিন্ন দেশে আলোচনা হয়।
গান্ধীর জীবনের সঙ্গে আরও নানা তথ্য জড়িয়ে রয়েছে। তিনি ১৮৬৯ সালের ২ অক্টোবর গুজরাটের পোরবন্দরে জন্মগ্রহণ করেন। লন্ডনে আইন নিয়ে পড়াশোনা করার পর আইনজীবী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরে দক্ষিণ আফ্রিকায় গিয়ে দীর্ঘ সময় কাজ করেন। সেখানকার অভিজ্ঞতাই তাঁর রাজনৈতিক ও সামাজিক চিন্তাভাবনার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়।
‘মহাত্মা’ নামে পরিচিত হওয়ার ক্ষেত্রেও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে গান্ধীর সম্পর্কের প্রসঙ্গ প্রায়ই সামনে আসে। তবে ‘মহাত্মা’ উপাধিটি রবীন্দ্রনাথই প্রথম দিয়েছিলেন—এই প্রচলিত দাবির ঐতিহাসিক সূত্র নিয়ে গবেষকদের মধ্যে আলোচনা রয়েছে। তাই বিষয়টি নিঃসংশয়ে দাবি করার বদলে গান্ধী ও রবীন্দ্রনাথের পারস্পরিক শ্রদ্ধার সম্পর্কটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
১৯৩০ সালে মার্কিন সংবাদপত্র Time গান্ধীকে ‘Man of the Year’ হিসেবে নির্বাচিত করেছিল—যে স্বীকৃতি পরবর্তীকালে ‘Person of the Year’ নামে পরিচিত হয়। তাঁর নেতৃত্ব, অহিংস আন্দোলন এবং ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে ভূমিকার কারণে সেই সময় আন্তর্জাতিক মহলে গান্ধীর প্রভাব কতটা ছিল, তারও একটি উদাহরণ এটি।
১৯৪৮ সালের ৩০ জানুয়ারি দিল্লিতে প্রার্থনাসভায় যাওয়ার সময় মহাত্মা গান্ধীকে নাথুরাম গডসে গুলি করে হত্যা করেন। মাত্র কয়েক মাস আগেই দেশ স্বাধীন হয়েছিল। কিন্তু স্বাধীন ভারতের প্রথম দিকের সেই অস্থির সময়ে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও অহিংসার বার্তা ছড়িয়ে যেতে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত কাজ করেছিলেন গান্ধী।
আজ তাঁর ১৫৭তম জন্মবার্ষিকীতে তাই ফের সামনে এসেছে সেই অহিংসার দর্শন।
প্রিমিয়াম PVC কার্ড অর্ডার করুন
ওয়াটারপ্রুফ • টেকসই • ফাস্ট ডেলিভারি
💬 WhatsApp এ ক্লিক করুন
