বঙ্গে ক্ষমতা দখলের পরেই ১৯৫০ সালের পুরোনো ও কঠোর পশু সংরক্ষণ আইন কড়াভাবে বলবৎ করার কথা ঘোষণা করেছে বিজেপি সরকার। আর নবান্নের এই নয়া নির্দেশিকাকে কেন্দ্র করেই রাজ্য রাজনীতি তথা সমাজজীবনে এক অভূতপূর্ব উলটপুরাণ দেখল পশ্চিমবঙ্গ। দীর্ঘদিনের চেনা সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের বৃত্ত ভেঙে এবার খোদ মুসলিম সমাজের একটি বড় অংশ এবং শীর্ষস্থানীয় ধর্মীয় নেতৃত্ব গরুকে দেশের ‘জাতীয় পশু’ বা ‘রাষ্ট্রীয় পশু’ হিসেবে ঘোষণা করার দাবিতে সরব হয়েছেন। নাখোদা মসজিদের ইমাম মাওলানা মোহাম্মদ শফিক কাসমি থেকে শুরু করে জমিয়ত উলামায়ে হিন্দের সভাপতি মাওলানা আরশাদ মাদানী এবং অল ইন্ডিয়া মুসলিম জামাত প্রধান মাওলানা রাজভি সহ সকলেই বর্তমান আবহে অত্যন্ত ইতিবাচক ও দূরদর্শী অবস্থান গ্রহণ করেছেন।
মুসলিম নেতাদের মতে, গরুকে রাষ্ট্রীয় পশুর মর্যাদা দিলে এর বাণিজ্যিক বেচাকেনা ও কোরবানি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে, যার ফলে গরুর নাম করে দেশজুড়ে চলা সমস্ত বিতর্ক, সাম্প্রদায়িক হিংসা এবং নিরীহ মানুষদের ওপর ‘মব লিঞ্চিং’ বা গণপিটুনির মতো জঘন্য অপরাধের চিরতরে অবসান ঘটবে। এই প্রসঙ্গে জমিয়ত সভাপতি আরশাদ মাদানী প্রশ্ন তোলেন, দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ গরুকে শুধু পবিত্র বলেই মনে করেন না, তাঁরা গরুকে মায়ের মর্যাদাও দেন; তবে সরকার এখনও কেন গরুকে জাতীয় পশুর স্বীকৃতি দিচ্ছে না?
রাজনৈতিক এই সামাজিক রদবদলের আঁচ এসে পড়েছে বাংলার গ্রামীণ অর্থনীতি ও সমাজজীবনেও, যার জেরে তৈরি হয়েছে এক অদ্ভুত বৈপরীত্য। বাংলার ইতিহাসে এই প্রথম মুসলিম সমাজের একটি বড় অংশ প্রকাশ্যে গরু কোরবানির বিরোধিতা করছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়া একাধিক ভিডিও চিত্রে দেখা যাচ্ছে, এবার খোদ মুসলিম যুবকরাই ‘গো-রক্ষক’ এর ভূমিকা পালন করছেন। তাঁরা গবাদিপশু বোঝাই ট্রাক বা গরুকে হাঁটে নিয়ে যাওয়া পথরোধ করে হিন্দু বিক্রেতাদের সনির্বন্ধ অনুরোধ করছেন, “যাকে আপনারা মা বলেন, তাকে সামান্য টাকার লোভে কেন বিক্রি করছেন? একে বাড়ি ফিরিয়ে নিয়ে গিয়ে সেবা করুন। আপনারা গরু বেচে মুনাফা লুটবেন, আর আমাদের জেলে যেতে হবে, তা আর হতে দেওয়া যায় না।” বেশ কয়েকজন মুসলিম ইনফ্লুয়েন্সারও এবার ঈদে গরু না কেনার জন্য প্রকাশ্য প্রচারণা শুরু করেছেন। এই বয়কটের ধাক্কায় চরম সংকটে পড়েছেন গ্রামীণ হিন্দু গবাদিপশু খামারি ও কৃষকরা। হাটে কোনো ক্রেতা না থাকায় শুকনো মুখে, তীব্র আর্থিক অনিশ্চয়তা ও হতাশা নিয়ে তাঁদের ফিরতে হচ্ছে।
দিনকয়েক আগে হিঙ্গলগঞ্জের বিজেপি বিধায়ক রেখা পাত্র একটি গরুর ট্রাক থামিয়ে গরুর ‘জন্ম শংসাপত্র‘ দাবি করার পর থেকেই এই আতঙ্ক ও বয়কট আরও ছড়ায়। যদিও আইএসএফ বিধায়ক নওশাদ সিদ্দিকী দরিদ্র পশু ব্যবসায়ী, পরিবহন শ্রমিক ও কৃষকদের আর্থিক বিপর্যয়ের হাত থেকে বাঁচাতে আইনের ১২ নম্বর ধারার আওতায় ধর্মীয় প্রয়োজনে জবাইয়ের বিশেষ ছাড় চেয়ে মুখ্যমন্ত্রীকে চিঠি দিয়েছেন, তবে সাধারণ মুসলিম সমাজ সামাজিক মাধ্যমে নওশাদ সিদ্দিকীর এই পদক্ষেপের সমালোচনা করে বলেন, “এটা চলতে দিন। আমরা আর গরু খেতে চাই না, এবার ব্যবসায়ীরা নিজেদের ভুল বুঝুক।“
অন্য দিকে, বখরি ঈদের আগে রাজ্যজুড়ে পশু কোরবানি এবং বিশেষ করে গরু ও মহিষ জবাই সংক্রান্ত রাজ্য সরকারের কড়া নির্দেশিকার ওপর কোনো ধরনের অন্তর্বর্তী স্থগিতাদেশ দিতে অস্বীকার করেছে কলকাতা হাইকোর্ট। সরকারের এই সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে আদালতে মোট ১১টি জনস্বার্থ মামলা দায়ের করা হয়েছিল। প্রধান বিচারপতি সুজয় পাল এবং বিচারপতি পার্থ সারথি সেনের ডিভিশন বেঞ্চে দীর্ঘ শুনানির পর আদালত জানিয়ে দেয়, গরু জবাই করা কোরবানির কোনো অপরিহার্য বা বাধ্যতামূলক অংশ নয় এবং অন্য পশু দিয়েও এটা পালন সম্পন্ন করা সম্ভব। এটা বলার পরেই মামলাগুলি খারিজ করে রাজ্য সরকারের নোটিশ বহাল রাখার নির্দেশ দেয় আদালত। নবান্নের পক্ষ থেকে জারি করা ওই বিশেষ নির্দেশিকায় ১৯৫০ সালের পশু সংরক্ষণ আইন এবং ২০১৮ সালের হাইকোর্টের রায় কড়াকড়িভাবে মেনে চলতে বলা হয়েছে।
এই নিয়ম অনুযায়ী, উপযুক্ত অনুমতি বা ‘ফিটনেস সার্টিফিকেট’ ছাড়া কোনো গরু বা মহিষ জবাই করা যাবে না। কেউ যদি গরু কোরবানি দিতে চান, তবে তাঁকে লিখিত প্রমাণ দিতে হবে যে সংশ্লিষ্ট পশুর বয়স কমপক্ষে ১৪ বছর এবং সেটি আর প্রজনন বা কৃষিকাজের উপযোগী নয়। তবে পশুটি যদি বয়সের ভারে অক্ষম, গুরুতর আঘাতপ্রাপ্ত বা অনিরাময়যোগ্য রোগে আক্রান্ত হয়, তবেই কেবল ১৪ বছরের আগে সার্টিফিকেট সাপেক্ষে জবাইয়ের অনুমতি মিলবে।
নতুন এই নিয়ম অনুযায়ী, পশু জবাইয়ের প্রয়োজনীয় শংসাপত্র দেবেন এলাকার পুরপ্রধান অথবা পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি, তবে তাতে সরকারি পশু চিকিৎসকের (ভেটেনারি অফিসার) স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক। এর পাশাপাশি, রাস্তাঘাট বা যেকোনো প্রকাশ্য স্থানে পশু কোরবানি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। প্রশাসন নির্ধারিত নির্দিষ্ট কসাইখানায় (Slaughterhouse) গিয়ে এবং সম্পূর্ণ পর্দার আড়ালে এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে, যাতে অন্য কোনো নাগরিকের ধর্মানুভূতিতে আঘাত না লাগে বা কেউ বিব্রত বোধ না করেন। এই নিয়ম অমান্য করলে ১৯৫০ সালের আইন অনুযায়ী ৬ মাসের কারাদণ্ড ও জরিমানার বিধান রয়েছে।

