এতদিন অনেকেই মনে করতেন, ভারতীয় পাসপোর্ট থাকলেই সেটিই তাঁর নাগরিকত্বের সবচেয়ে বড় প্রমাণ। কিন্তু এবার সেই ধারণায় বদল আনল কেন্দ্রের বিদেশ মন্ত্রক (MEA)। ১৪তম পাসপোর্ট সেবা দিবসে মন্ত্রক জানায়, “পাসপোর্ট শুধু বিদেশে যাতায়াতের জন্য দেওয়া একটি সরকারি নথি। এটি নাগরিকত্বের চূড়ান্ত প্রমাণ নয়।” ফলে এবার কোনো ব্যক্তির নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠলে শুধু পাসপোর্ট দেখিয়েই তা প্রমাণ করা যাবে না।
এই ঘোষণার পর নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে, যদি পাসপোর্টই নাগরিকত্বের চূড়ান্ত প্রমাণ না হয়, তাহলে নাগরিকত্ব প্রমাণের জন্য কোন নথি লাগবে? তবে এ বিষয়ে এখনও কেন্দ্র সরকার স্পষ্ট কোনো একক নথির নাম জানায়নি।
এর আগেও এই বিষয়টি নিয়ে আদালতে আলোচনা হয়েছে। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা SIR মামলার শুনানিতে সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছিল, আধার কার্ড নাগরিকত্বের প্রমাণ নয়। একইভাবে ভোটার কার্ডও নাগরিকত্বের নথি হিসেবে ধরা হয় না। ভোটার কার্ড মূলত ভোট দেওয়ার অধিকার এবং পরিচয় প্রমাণের জন্য ব্যবহার করা হয়। তাই আধার ও ভোটার কার্ডের পর এবার পাসপোর্ট নিয়েও বিদেশ মন্ত্রকের এই ব্যাখ্যা নতুন করে আলোচনা সমালোচনা শুরু হয়েছে।
এদিন বিদেশ মন্ত্রক জানিয়েছে, বর্তমানে পাসপোর্ট পাওয়ার প্রক্রিয়া আগের তুলনায় অনেক সহজ ও দ্রুত হয়েছে। ২০২৫ সালে সারা দেশে প্রায় ১ কোটি ৫০ লক্ষ পাসপোর্ট ও সংশ্লিষ্ট পরিষেবা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ১ কোটি ৩৯ লক্ষ ছিল নতুন পাসপোর্ট। পুলিশ ভেরিফিকেশন সম্পন্ন হলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে মাত্র ৬ কর্মদিবসের মধ্যেই পাসপোর্ট ইস্যু করা হচ্ছে।
এছাড়া পাসপোর্ট সেবা কেন্দ্র (PSK) এবং পোস্ট অফিস পাসপোর্ট সেবা কেন্দ্র (POPSK) এ অধিকাংশ আবেদনকারীর কাজ ৪৫ মিনিটেরও কম সময়ে শেষ হচ্ছে। যেখানে ১০ বছর আগে আমাদের দেশে পাসপোর্ট বানানোর অফিস ছিল মাত্র ৭৭টি। এখন সরকার সেই অফিস বাড়িয়ে করেছে ৫৪৫টি! অর্থাৎ, আগের চেয়ে প্রায় ৬ গুণ বেশি অফিস তৈরি হয়েছে। এর ফলে সাধারণ মানুষকে এখন আর পাসপোর্ট বানানোর জন্য দূর-দূরান্তে বা বড় শহরে ছুটে যেতে হচ্ছে না। ঘরের কাছেই খুব সহজে পাসপোর্টের কাজ মিটে যাচ্ছে।
বিদেশ মন্ত্রক আরও জানিয়েছে, বিদেশে ঘোরার জন্য ভারতীয় পাসপোর্টের ক্ষমতা এখন অনেক বেশি। ২০১৯ সালে যেখানে ভারতীয়রা ১৬টি দেশে ভিসা ছাড়াই যেতে পারতেন, বর্তমানে সেই সংখ্যা বেড়ে ২৭টি হয়েছে। এছাড়া ৪৭টি দেশ ভারতীয়দের ‘ভিসা অন অ্যারাইভাল’ এবং ৬৬টি দেশ ‘ই-ভিসা’র সুবিধা দিচ্ছে। আগে যত দেশে ভিসা ছাড়া যাওয়া যেত, এখন তার চেয়ে অনেক বেশি দেশে সহজে যাওয়া যায় বলে জানায় বিদেশ মন্ত্রক।
প্রসঙ্গত, ভারতে নাগরিকত্ব সংক্রান্ত সব নিয়ম নাগরিকত্ব আইন, ১৯৫৫ অনুযায়ী নির্ধারণ করা হয়। এই আইনেই বলা আছে, কে কীভাবে ভারতীয় নাগরিক হবেন এবং কোন ক্ষেত্রে নাগরিকত্বের দাবি করা যাবে। সময়ের সঙ্গে প্রয়োজন অনুযায়ী এই আইনে কয়েকবার পরিবর্তন আনা হয়েছে। ১৯৮৬ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে মোট ছয়বার আইন সংশোধন হয়েছে, যার মধ্যে দু’বার সংশোধন হয়েছে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আমলে।
তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কোনো ব্যক্তির নাগরিকত্ব নিয়ে আইনি প্রশ্ন উঠলে শুধু পাসপোর্ট, আধার বা ভোটার কার্ড দেখেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় না। প্রয়োজন অনুযায়ী জন্ম শংসাপত্র, নাগরিকত্ব বা নিবন্ধনের নথি এবং অন্যান্য সরকারি কাগজপত্রও যাচাই করা হতে পারে।

