স্বাধীনতার আগের রাতেই উত্তপ্ত হয়ে উঠল নদিয়ার কৃষ্ণনগর। তৃণমূল কংগ্রেসের কৃষ্ণনগরের সাংসদ মহুয়া মৈত্রকে গভীর রাতে সার্কিট হাউস খালি করার নির্দেশ দেওয়াকে কেন্দ্র করে রাজ্য রাজনীতিতে শুরু হয়েছে তীব্র চাপানউতোর। প্রশাসনের তরফে একদিকে সার্কিট হাউসের রক্ষণাবেক্ষণের কথা বলা হলেও, অন্যদিকে এই ঘটনাকে ঘিরে প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার এবং একজন মহিলা সাংসদকে হেনস্থার অভিযোগ তুলেছে তৃণমূল।
ঘটনার সূত্রপাত গত ১৪ আগস্ট সন্ধ্যায়। মহুয়া মৈত্রর দাবি অনুযায়ী, তিনি ওই দিন সন্ধ্যা সাড়ে ছ’টা নাগাদ কৃষ্ণনগর সার্কিট হাউসে পৌঁছন এবং তাঁকে সেই ঘরটিই বরাদ্দ করা হয়, যেখানে তিনি সাধারণত অবস্থান করেন। এরপর রাত ৯টা ২০ মিনিটে তাঁর নির্দিষ্ট ঘরেই রাতের খাবার পৌঁছে দেওয়া হয়। সব কিছু স্বাভাবিক থাকলেও এর কিছুক্ষণ পরেই ছন্দপতন ঘটে। রাত ৯টা ৪৭ মিনিটে প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাঁকে আচমকা ফোন করে ঘর খালি করে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
পরিস্থিতি আরও জটিল হয় যখন রাত ১০টা ৫২ মিনিটে তাঁর কাছে একটি লিখিত নির্দেশ এসে পৌঁছায়। নদিয়া জেলা প্রশাসনের গত ১২ আগস্টের ওই নির্দেশিকায় জানানো হয়েছিল, বার্ষিক রক্ষণাবেক্ষণ, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও অন্যান্য জরুরি কাজের জন্য ১৪ আগস্ট সন্ধ্যা থেকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত কৃষ্ণনগরের নদিয়া সার্কিট হাউস সমস্ত পরিষেবার জন্য বন্ধ থাকবে। তবে ১৩ আগস্টের আগে যেসব বুকিং নিশ্চিত হয়েছিল, সেগুলিকে এই নিয়মের আওতা থেকে ছাড় দেওয়ার কথাও বলা হয়। মহুয়ার প্রশ্ন, যদি রক্ষণাবেক্ষণের জন্যই সার্কিট হাউস বন্ধ থাকার কথা থাকে, তবে তাঁকে সন্ধ্যায় ঘরে ঢুকতে দেওয়া এবং রাতের খাবার দেওয়ার পরও কেন শেষ মুহূর্তে এমন নির্দেশ দেওয়া হলো? সেই নির্দেশের ছবিও সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশ করেন মহুয়া
পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে যখন সার্কিট হাউসের বাইরে একটি বিশাল জনতা জমায়েত হয়ে ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগান দিতে শুরু করে বলে অভিযোগ করেন সাংসদ। নিজের সংসদীয় এলাকার সার্কিট হাউসে একজন নির্বাচিত সাংসদের থাকার পূর্ণ অধিকার রয়েছে বলে দাবি করে মহুয়া স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে, প্রশাসনের এই নির্দেশ মেনে তিনি রাতের বেলায় সার্কিট হাউস ছেড়ে কোথাও যাবেন না।
উল্লেখ্য, আদালতের নির্দেশে একটি মামলার তদন্তে সহযোগিতা করতে গত ১৪ আগস্ট নদিয়ার হোগলবেড়িয়া থানায় হাজিরা দিয়ে কৃষ্ণনগরে ফিরেছিলেন মহুয়া। হোগলবেড়িয়া থানায় হাজিরার পর মহুয়া কৃষ্ণনগরে ফেরেন। আর সেই রাতেই সার্কিট হাউস খালি করার নির্দেশকে কেন্দ্র করে নতুন করে রাজনৈতিক চাপানউতোর শুরু হয়।
এই ঘটনার তীব্র নিন্দা করে আসরে নেমেছেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। সোশ্যাল মিডিয়ায় মহুয়ার ভিডিও বার্তা শেয়ার করে তিনি সরাসরি নিশানা করেছেন প্রশাসনকে। অভিষেকের প্রশ্ন, একদিকে স্বাধীনতা দিবসের মঞ্চে নারীশক্তি ও নারী ক্ষমতায়নের বড় বড় কথা বলা হবে, আর অন্যদিকে রাজনৈতিকভাবে চ্যালেঞ্জ জানানো একজন মহিলা সাংসদকে ভয় দেখাতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করা হবে—এই দ্বিচারিতা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।
শুধু তৃণমূল কংগ্রেসই নয়, এই ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিরোধী শিবিরের নেতারাও। কংগ্রেস নেতা পবন খেরা তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন, একজন বর্তমান মহিলা সাংসদকে মধ্যরাতে সার্কিট হাউস থেকে জোর করে বের করে দেওয়ার চেষ্টা চলছে, অথচ বাইরে একটি উন্মত্ত জনতা তাঁর অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে রয়েছে। তিনি প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও মুখ্যমন্ত্রীর কাছে অবিলম্বে ওই সাংসদের যথাযথ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জোরালো দাবি জানিয়েছেন।
