শুধু বিয়ের ছবি দেখিয়ে বা কারও মুখে অভিযোগ তুলেই কোনও পুরুষ ও মহিলাকে স্বামী-স্ত্রী হিসেবে প্রমাণ করা যায় না। আইনিভাবে বিবাহিত প্রমাণিত হতে গেলে নির্ভরযোগ্য সাক্ষী ও উপযুক্ত প্রমাণের প্রয়োজন। দ্বিতীয় বিয়ের অভিযোগে চাকরি হারানো এক রেল সুরক্ষা বাহিনী (আরপিএফ)-র জওয়ানের বরখাস্তের নির্দেশ খারিজ করে বুধবার এমনই গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ করল কলকাতা হাই কোর্ট। বিচারপতি মধুরেশ প্রসাদ এবং বিচারপতি প্রসেনজিৎ বিশ্বাসের ডিভিশন বেঞ্চের এই রায়ের ফলে দীর্ঘ পাঁচ বছর আইনি লড়াইয়ের পর অবশেষে স্বমহিমায় চাকরিতে ফিরছেন ওই জওয়ান। ২০২৪ সালে একক বেঞ্চের দেওয়া রায়ই বহাল রাখল ডিভিশন বেঞ্চ।
ঘটনার সূত্রপাত ২০২০ সালে। ওই সময় রেলের এক কর্মী ও তাঁর প্রথম স্ত্রীর পারিবারিক বিরোধ চরমে পৌঁছায়। প্রথম স্ত্রীর সরাসরি অভিযোগ ছিল, তাঁদের আইনি বিবাহবিচ্ছেদ না হওয়া সত্ত্বেও স্বামী গোপনে দ্বিতীয়বার বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন। এই অভিযোগ পাওয়ার পরেই তদন্ত শুরু করে রেল কর্তৃপক্ষ। এরপর ২০২১ সালের ৩০ এপ্রিল অভিযুক্ত জওয়ানের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক চার্জশিট দাখিল করা হয়। বিভাগীয় তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে দাবি করে তাঁকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়। রেলের এই একতরফা সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কলকাতা হাই কোর্টের দ্বারস্থ হন ওই আরপিএফ কর্মী। তাঁর মূল যুক্তি ছিল, নিছক অভিযোগের ভিত্তিতে দ্বিতীয় বিয়ে প্রমাণিত হতে পারে না এবং রেল কর্তৃপক্ষ যথাযথ তথ্য যাচাই না করেই তাঁর চাকরি কেড়ে নিয়েছে।
মামলার শুনানিতে রেলের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, তদন্ত চলাকালীন অভিযুক্তের প্রথম স্ত্রী নিজে উপস্থিত থেকে স্বামীর দ্বিতীয় বিয়ের কথা সমর্থন করেছিলেন। পাশাপাশি, ‘মৌনীবাবা মঠ’-এর একটি রেজিস্টার এবং একটি বিয়ের ছবিও তদন্তকারীদের হাতে আসে। কিন্তু উভয় পক্ষের সওয়াল-জবাব শোনার পর ডিভিশন বেঞ্চ স্পষ্ট করে জানিয়ে দেয়, অভিযোগকারী যেহেতু খোদ অভিযুক্তের স্ত্রী, তাই তাঁর একপক্ষীয় বক্তব্যকে অন্ধভাবে সত্য মেনে দ্বিতীয় বিয়ে সাব্যস্ত করা যায় না। আদালত জানায়, দ্বিতীয় বিয়ে প্রমাণের জন্য স্বাধীন ও নির্ভরযোগ্য প্রমাণের প্রয়োজন।
আদালতের পর্যবেক্ষণ ছিল, প্রমাণের জন্য পেশ করা বিয়ের ছবিটিতে ঠিক কী ঘটছে বা ছবিতে থাকা ব্যক্তিরাই যে বর-কনে, তার কোনো স্পষ্ট ভিত্তি বা সত্যতা নেই। এমনকি, ঘটনার সত্যতা যাচাই করতে যে ফটোগ্রাফার ছবি তুলেছিলেন, তাঁকেও সাক্ষী হিসেবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়নি। সবচেয়ে বড় কথা, রেল যে মঠের রেজিস্ট্রির ফটোকপি বা জেরক্স কপি জমা দিয়েছিল, তাতে বর, কনে বা কোনো স্বাধীন সাক্ষীরই কোনো স্বাক্ষর বা সই ছিল না। ফলে সেই নথির কোনো আইনি ভিত্তি বা গ্রহণযোগ্যতা থাকতে পারে না।
এই কারণে ডিভিশন বেঞ্চ রেলের সিদ্ধান্ত বাতিল করে দিয়েছে। আদালত নির্দেশ দিয়েছে, আগামী চার সপ্তাহের মধ্যে ওই আরপিএফ কর্মীকে চাকরিতে পুনর্বহাল করতে হবে। চাকরি হারানোর সময়কালের জন্য ‘নোশনাল সার্ভিস বেনিফিট’ও দিতে হবে। অর্থাৎ, পাঁচ বছর পর তিনি আবার চাকরিতে ফিরছেন এবং অনুপস্থিতির সময়ের সুবিধাও পাবেন ।

