রাজ্যের ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা SIR-কে ঘিরে এবার সামনে এল ট্রাইব্যুনালগুলির বিপুল মামলার চাপের ছবি। মুর্শিদাবাদ সংক্রান্ত আপিলের দায়িত্বে থাকা কলকাতা হাই কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি ইন্দ্রজিৎ চট্টোপাধ্যায় SIR ট্রাইব্যুনালের দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ানোর ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। প্রধান বিচারপতিকে চিঠি দিয়ে নিজের সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন তিনি। তাঁর চিঠিতে মূলত দীর্ঘ যাতায়াত, খারাপ রাস্তা এবং বিপুল কাজের চাপের কথা উঠে এসেছে।
বিচারপতি চট্টোপাধ্যায়ের ট্রাইব্যুনাল জোকায়। অন্যদিকে তাঁর বাড়ি সল্টলেকে। প্রতিদিন বাড়ি থেকে জোকা যাওয়া এবং ফেরার পথে প্রায় ৭০ কিলোমিটার যাতায়াত করতে হচ্ছে বলে তিনি জানিয়েছেন। যাতায়াতে একদিকে প্রায় দু’ঘণ্টা সময় লাগছে। ফলে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কাজের জন্য দীর্ঘ সময় বাইরে থাকতে হচ্ছে তাঁকে।
চিঠিতে রাস্তার বেহাল দশা এবং যানজটের সমস্যার কথাও উল্লেখ করেছেন বিচারপতি। তাঁর বক্তব্য, এই পরিস্থিতিতে প্রতিদিন দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে ট্রাইব্যুনালে পৌঁছনো এবং একই সঙ্গে বিপুল সংখ্যক আপিলের দায়িত্ব সামলানো কঠিন হয়ে পড়ছে। তিনি এমনও জানিয়েছেন, ট্রাইব্যুনালের জায়গা যদি সল্টলেকের কাছাকাছি, নির্দিষ্ট দূরত্বের মধ্যে সরানো হয়, তাহলে কাজ চালিয়ে যাওয়ার বিষয়টি তিনি বিবেচনা করতে পারেন। বাড়ি থেকে কাজ করার বিকল্পও তিনি খোলা রেখেছেন।
তবে শুধু যাতায়াতের সমস্যাই নয়, ট্রাইব্যুনালের মামলার সংখ্যাও যথেষ্ট বড়। দ্য টেলিগ্রাফের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিচারপতি চট্টোপাধ্যায়ের হাতে প্রায় ৫ লাখ ৩০ হাজার আপিল বিচারাধীন রয়েছে। তাঁর ট্রাইব্যুনালে এখনও পর্যন্ত ৪২৫টি আপিলের নিষ্পত্তি হয়েছে। তার মধ্যে ৩৫০ জন আবেদনকারীর নাম ভোটার তালিকায় পুনর্বহাল হয়েছে এবং ৭৫ জনের নাম বাদ রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে। অর্থাৎ নিষ্পত্তি হওয়া মামলাগুলির মধ্যে প্রায় ৮২ শতাংশ ক্ষেত্রে আবেদনকারীদের নাম পুনর্বহাল করা হয়েছে।
বিচারপতি চট্টোপাধ্যায়ের বক্তব্য অনুযায়ী, বর্তমানে দিনে প্রায় ১০টি আপিলের বেশি নিষ্পত্তি করা সম্ভব হচ্ছে না। সেই গতিকে ভিত্তি করে হিসাব করলে তাঁর হাতে থাকা বিপুল সংখ্যক মামলার নিষ্পত্তিতে প্রায় ১৪৫ বছর পর্যন্ত সময় লেগে যেতে পারে। এই হিসাবটি বর্তমান নিষ্পত্তির গতির ভিত্তিতে করা হয়েছে, বাস্তবে মামলার সংখ্যা, কাজের দিন এবং নিষ্পত্তির গতি বদলালে সময়ও বদলাতে পারে।
মুর্শিদাবাদের ক্ষেত্রে মামলার চাপ আরও স্পষ্ট। অন্য একটি প্রতিবেদনে ওই জেলার জন্য ৭,৪৭,৬২১টি আপিল এখনও বিচারাধীন থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। বিচারপতি চট্টোপাধ্যায় মুর্শিদাবাদের ১১টি বিধানসভা কেন্দ্রের আপিলের দায়িত্বে রয়েছেন। জেলার বাকি ১১টি বিধানসভা কেন্দ্রের আপিল অন্য এক অবসরপ্রাপ্ত হাই কোর্টের বিচারপতি পরিচালনা করছেন।
SIR এর পর ভোটার তালিকায় নাম বাদ পড়া বা নাম সংক্রান্ত সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিলের শুনানির জন্য রাজ্যে একাধিক ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের পর কলকাতা হাই কোর্টের উদ্যোগে এই ট্রাইব্যুনালগুলি কাজ শুরু করে। মোট ১৯টি আপিল ট্রাইব্যুনালে বিপুল সংখ্যক মামলা জমা পড়েছে।
ইন্দ্রজিৎ চট্টোপাধ্যায় গত এপ্রিল থেকে SIR আপিল ট্রাইব্যুনালের দায়িত্বে রয়েছেন। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তিনি ইতিমধ্যেই ৪২৫টি আপিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। কিন্তু হাতে থাকা মামলার সংখ্যা এবং প্রতিদিনের কাজের সীমাবদ্ধতার কারণে বাকি মামলাগুলি দ্রুত শেষ করা নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
তাঁর পদত্যাগের বিষয়টি নিয়ে অবশ্য এখনও একটি বিকল্প পথ খোলা রয়েছে। বিচারপতি জানিয়েছেন, ট্রাইব্যুনালের শুনানি কেন্দ্র সল্টলেকের কাছাকাছি করা হলে তিনি দায়িত্ব চালিয়ে যেতে পারেন। তাঁর চিঠিতে বাড়ি থেকে কাজ করার সম্ভাবনার কথাও উল্লেখ রয়েছে। অন্যদিকে, Times of India-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২ নভেম্বর ২০২৬ থেকে দায়িত্ব চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয় বলে তিনি জানিয়েছেন।
ফলে ইন্দ্রজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের চিঠি সামনে আসার পর SIR ট্রাইব্যুনালগুলিতে জমে থাকা মামলার চাপ নতুন করে আলোচনায় এসেছে। একদিকে রয়েছে বিচারপতিদের দীর্ঘ যাতায়াত ও কাজের পরিকাঠামোর সমস্যা, অন্যদিকে রয়েছে কয়েক লক্ষ আপিল দ্রুত নিষ্পত্তি করার প্রয়োজন। এই বিপুল মামলার চাপ কীভাবে কমানো হবে, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
প্রিমিয়াম PVC কার্ড অর্ডার করুন
ওয়াটারপ্রুফ • টেকসই • ফাস্ট ডেলিভারি
💬 WhatsApp এ ক্লিক করুন
