রাজ্যে ওবিসি সংরক্ষণ ঘিরে এবার বড়সড় প্রশাসনিক পদক্ষেপের পথে হাঁটল নবান্ন। কলকাতা হাইকোর্টের ঐতিহাসিক রায়ের পর গত ১৮ মে রাজ্যের Backward Classes Welfare Department নতুন বিজ্ঞপ্তি জারি করে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, আপাতত শুধুমাত্র ৬৬টি স্বীকৃত ওবিসি জাতি বা সম্প্রদায়ই সরকারি চাকরি ও উচ্চশিক্ষায় ৭ শতাংশ সংরক্ষণের সুবিধা পাবে। একইসঙ্গে রাজ্যজুড়ে ২০১১ সালের পর ইস্যু হওয়া বিপুল সংখ্যক কাস্ট সার্টিফিকেটও নতুন করে খতিয়ে দেখার প্রস্তুতি শুরু হয়েছে বলে প্রশাসনিক সূত্রে খবর।
গত বছরের ২২ মে কলকাতা হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিল, ২০১০ সালের পর পশ্চিমবঙ্গে যেভাবে নতুন করে একাধিক সম্প্রদায়কে OBC তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল এবং OBC-A ও OBC-B মিলিয়ে ১৭ শতাংশ সংরক্ষণ চালু হয়েছিল, সেই পুরো প্রক্রিয়াতেই আইনি ত্রুটি রয়েছে। ফলে আদালত ১০ শতাংশ এবং ৭ শতাংশ এই দুই ভাগে সংরক্ষণের ব্যবস্থাকে বাতিল করে দেয়। তবে একইসঙ্গে আদালত জানিয়েও দেয়, ২০১০ সালের আগে রাজ্যের ওবিসি তালিকায় থাকা মূল ৬৬টি সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রে এই রায়ের কোনো প্রভাব পড়বে না।
হাইকোর্টের সেই নির্দেশ মেনেই এবার রাজ্য সরকার নতুন বিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্ট করে দিয়েছে, আপাতত এই ৬৬টি সম্প্রদায়কেই বৈধ ওবিসি তালিকার অন্তর্ভুক্ত ধরা হবে এবং তারাই ৭ শতাংশ সংরক্ষণের সুবিধা পাবেন।
সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে থাকা ৬৬টি অনগ্রসর সম্প্রদায়ের (ওবিসি) তালিকায় রয়েছে— কাপালী, বৈশ্য কাপালী, কুর্মি, সূত্রধর, কর্মকার, কুম্ভকার, স্বর্ণকার, তেলী বা কলু, নাপিত, যোগী-নাথ, পল্লব গোপ, বল্লভ গোপ, যাদব গোপ, গোপ, আহির, যাদব, গোয়ালা, ময়রা (হালুই), মোদক (হালুই), বারুজীবী, সাতচাষী, মালাকার, জোলা (আনসারী-মোমিন), কাঁসারী, তাঁতি-তন্তুবায়, ধানক, শাঁখাকার, কেওরি-কৈরি, রাজু, নাগর, করণী, সরাক, তাম্বুলী-তামালী, কোস্তা-কোষ্ঠা, রনিওয়ার-রৌনিয়ার, খ্রিস্টধর্মে ধর্মান্তরিত তপশিলি জাতি ও তাঁদের উত্তরসূরি, লাখেরা-লাহেরা, ফকির-সাঁই, কাহার, বেতকর, চিত্রকার, ভুজেল, নেওয়ার, মাঙ্গার, নেমবাং, সাম্পাং, বুংছেং, থামী, জোগী, ধিমল, হাওয়ারী-ধোবি (তপশিলি জাতিভুক্ত বাদে), ভর, খণ্ডাইত, গাঙ্গোত, তুরহা, ধুনিয়া, পাটিদার, কসাই, হেলে-হালিয়া-চাষী কৈবর্ত, দাস কৈবর্ত, বংশী বর্মন, নস্য-সেখ, পাহাড়িয়া মুসলিম, খেন (নন-বেনিয়া ক্যাটেগরি), শুক্লি, সুনুওয়ার, ভরভুজা, দেওয়ান, রাই (চামলিং সহ), রায়ীন (কুঞ্জড়া), শেরশাবাদিয়া, দেবাঙ্গ, হাজ্জাম (মুসলিম) এবং চৌধুলি (মুসলিম) সম্প্রদায়।
অন্যদিকে, এই সিদ্ধান্তের পাশাপাশি রাজ্যে কাস্ট সার্টিফিকেট যাচাই প্রক্রিয়াও আরও কড়া হতে চলেছে বলে প্রশাসনিক সূত্রে খবর। জানা গেছে, ২০১১ সালের পর থেকে ইস্যু হওয়া প্রায় ১ কোটি ৬৯ লক্ষ SC, ST এবং OBC সার্টিফিকেট ধাপে ধাপে পুনরায় খতিয়ে দেখা হবে। যার মধ্যে ‘দুয়ারে সরকার‘ ক্যাম্পের মাধ্যমে বিলি হওয়া প্রায় ৪৮ লক্ষ সার্টিফিকেটও রয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, অনেক ক্ষেত্রে সঠিক নিয়ম না মেনেই এই শংসাপত্রগুলি দেওয়া হয়েছিল।
এখন থেকে প্রত্যেক আবেদনকারীর পুরনো নথিপত্র, পারিবারিক ইতিহাস এবং তথ্যের সত্যতা নতুন করে জেলা প্রশাসন খতিয়ে দেখবে। বিশেষ করে, সাম্প্রতিক ভোটার তালিকা সংশোধন (SIR) প্রক্রিয়ায় যে ২৭ লক্ষ মানুষের নাম বাদ পড়েছে, তাদের এবং তাদের পরিবারের কাস্ট সার্টিফিকেট বাধ্যতামূলকভাবে তদন্ত করা হবে। তদন্তে কোনো জালিয়াতি বা ত্রুটি ধরা পড়লে সেই সার্টিফিকেট সাথে সাথে বাতিল করা হবে এবং কড়া আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

