পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক মানচিত্রে ২০২৬ সালের ৯ মে তারিখটি এক নতুন সূর্যোদয়ের সাক্ষী হতে চলেছে। তিন দশকের বাম শাসন এবং পরবর্তী দেড় দশকের তৃণমূল জমানার অবসান ঘটিয়ে এই প্রথম কোনো বিজেপি নেতা বাংলার মুখ্যমন্ত্রীর কুর্সিতে বসতে চলেছেন। আর এই মহাকাব্যিক পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন মেদিনীপুরের ভূমিপুত্র শুভেন্দু অধিকারী। কাঁথি পুরসভার এক সাধারণ কাউন্সিলর থেকে আজ নবান্নের অলিন্দে শেষ কথা হয়ে ওঠার এই সফরটি যেমন কণ্টকাকীর্ণ, তেমনই নাটকীয় মোড়ে ঠাসা। মূলত শুভেন্দু অধিকারীর এই উত্তরণ কেবল একজন ব্যক্তির জয় নয়, বরং বাংলার রাজনীতির দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত সমীকরণগুলো ভেঙে চুরমার করে দেওয়ার এক সফল আখ্যান।
শুভেন্দুর রাজনীতির হাতেখড়ি হয়েছিল ঘরের আঙিনাতেই। ১৯৭০ সালের ১৫ ডিসেম্বর পূর্ব মেদিনীপুরের অধিকারী পরিবারে তাঁর জন্ম। বাবা শিশির অধিকারী ছিলেন রাজ্য ও জাতীয় রাজনীতির এক অবিসংবাদিত নাম। পারিবারিক উত্তরসূরি হিসেবে রাজনীতির অ আ ক খ শিখলেও শুভেন্দু নিজের পরিচিতি তৈরি করেছিলেন কঠোর পরিশ্রম আর অদম্য জেদ দিয়ে। রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষ করে তিনি যখন ময়দানে নামেন, তখনই তাঁর সাংগঠনিক দক্ষতার আঁচ পেয়েছিল রাজনৈতিক মহল। ১৯৯৫ সালে কংগ্রেসের টিকিটে কাঁথি পুরসভার কাউন্সিলর নির্বাচিত হওয়া ছিল সেই দীর্ঘ লড়াইয়ের প্রথম সোপান। সেই শুরু, এরপর থেকে আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি অধিকারীদের এই কনিষ্ঠ যোগ্য উত্তরসূরিকে।
১৯৯৮ সালে তৃণমূল কংগ্রেসের জন্মলগ্নেই তিনি মমতাপন্থী হিসেবে নিজেকে মেলে ধরেন। তবে শুভেন্দু অধিকারীর প্রকৃত উত্থান এবং ‘জননেতা’ হয়ে ওঠার শুরু ২০০৭ সালের নন্দীগ্রাম আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। রাসায়নিক হাব বিরোধী সেই গণআন্দোলনে ‘ভূমি উচ্ছেদ প্রতিরোধ কমিটি’র প্রধান কাণ্ডারি হিসেবে তিনি তৎকালীন বাম সরকারের রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছিলেন। নন্দীগ্রামের সেই রক্তাক্ত মাটিই শুভেন্দুকে বাংলার ঘরে ঘরে পরিচিতি দেয় এবং ২০১১ সালে রাজ্যে পরিবর্তনের পথ প্রশস্ত করে। তাঁর নিপুণ সাংগঠনিক জালে ধরা দিয়েই তৃণমূল দক্ষিণবঙ্গের জেলাগুলোতে নিজেদের আধিপত্য কায়েম করেছিল। ২০০৯ ও ২০১৪ সালে তমলুক লোকসভা থেকে রেকর্ড ভোটে সাংসদ নির্বাচিত হয়ে তিনি দিল্লির দরবারেও মেদিনীপুরের দাপট বজায় রেখেছিলেন।
২০১৬ সালে রাজ্যে তৃণমূল দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় আসার পর শুভেন্দু পরিবহণ ও সেচ দপ্তরের মতো গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রকের দায়িত্ব সামলান। তবে প্রশাসনের চেয়েও তাঁর বেশি ঝোঁক ছিল সংগঠনের ওপর। মুর্শিদাবাদ, মালদা থেকে শুরু করে উত্তরবঙ্গের প্রান্তিক জেলাগুলোতে তৃণমূলের সংগঠনকে একহাতে সাজিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু এই ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তাই একসময় দলের অন্দরে বিবাদের বীজ বপন করে। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের পর যখন পেশাদার ভোটকুশলী সংস্থা আই-প্যাক (I-PAC) এবং অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাতে দলের নিয়ন্ত্রণ যেতে শুরু করে, তখন থেকেই শুভেন্দুর সাথে শীর্ষ নেতৃত্বের দূরত্ব তৈরি হয়। শুভেন্দু মনে করতেন, এসি ঘরে বসে ল্যাপটপে চালানো রাজনীতি আর ধুলোবালির মাঠের রাজনীতির মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাৎ। এই আদর্শগত সংঘাত এবং সম্মানের লড়াই থেকেই ২০২০ সালের ১৭ ডিসেম্বর মেদিনীপুরের মাটিতে অমিত শাহের উপস্থিতিতে তিনি গেরুয়া শিবিরে যোগ দেন, যা ছিল তৃণমূলের ইতিহাসে সবথেকে বড় ভাঙন।
২০২১-এর নির্বাচনে নিজের গড় নন্দীগ্রামে সরাসরি মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে পরাজিত করে তিনি নিজেকে ‘জায়ান্ট কিলার’ হিসেবে বিশ্বমঞ্চে প্রতিষ্ঠিত করেন। বিরোধী দলনেতা হিসেবে বিধানসভায় তাঁর আক্রমণাত্মক মেজাজ এবং শাসকের দুর্নীতির বিরুদ্ধে লাগাতার সোচ্চার হওয়া বাংলার রাজনীতিতে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছিল। তবে ২০২৬-এর নির্বাচন ছিল তাঁর জীবনের চূড়ান্ত অগ্নিপরীক্ষা। এবার তিনি কেবল নন্দীগ্রাম জয় করেননি, বরং মমতার খাসতালুক হিসেবে পরিচিত ভবানীপুর থেকেও বিপুল ব্যবধানে জয় ছিনিয়ে এনেছেন। ভবানীপুরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরাজয় আর বিজেপির ২০৭টি আসনে জয়লাভ—সবটাই শুভেন্দুর রণকৌশলের ফসল বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। একদা তৃণমূলের যে সেনাপতি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জয় সুনিশ্চিত করতেন, আজ সেই সেনাপতিই নিজের দক্ষতায় বাংলার প্রথম বিজেপি মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে ইতিহাস গড়তে চলেছেন।

