বকরি ঈদের আগে রাজ্যজুড়ে পশু কুরবানি এবং বিশেষ করে গরু ও মহিষ জবাই সংক্রান্ত রাজ্য সরকারের কড়া নির্দেশিকার ওপর কোনো স্থগিতাদেশ দিল না কলকাতা হাইকোর্ট। সরকারের এই সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে আদালতে একাধিক জনস্বার্থ মামলা দায়ের করা হয়েছিল। বৃহস্পতিবার প্রধান বিচারপতি সুজয় পাল এবং বিচারপতি পার্থ সারথি সেনের ডিভিশন বেঞ্চে এই সংক্রান্ত মোট ১১টি মামলার শুনানি হয়। দীর্ঘ শুনানির পর আদালত স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, গরু জবাই করা কুরবানির কোনো অপরিহার্য বা বাধ্যতামূলক অংশ নয়। অন্য পশু দিয়েও কুরবানি সম্পন্ন করা সম্ভব।
এই পর্যবেক্ষণের সাথে সাথেই মামলাগুলি খারিজ করে রাজ্য সরকারের নোটিশ বহাল রাখার নির্দেশ দেয় হাইকোর্ট।
গত ১৩ মে সরকারের পক্ষ থেকে একটি বিশেষ নির্দেশিকা জারি করা হয়েছিল, যেখানে ১৯৫০ সালের পশু সংরক্ষণ আইন এবং ২০১৮ সালে হাইকোর্টের দেওয়া রায় কড়াকড়িভাবে মেনে চলার নির্দেশ দেওয়া হয়। এই নোটিশ অনুযায়ী, উপযুক্ত অনুমতি বা ‘ফিটনেস সার্টিফিকেট’ ছাড়া কোনো গরু বা মহিষ জবাই করা যাবে না। কেউ যদি গরু কুরবানি দিতে চান, তবে তাকে লিখিত প্রমাণ দিতে হবে যে পশুটির বয়স ১৪ বছরের বেশি এবং সেটি আর প্রজনন বা কাজের উপযোগী নয়। তবে পশুটি যদি বয়সের ভারে অক্ষম, গুরুতর আঘাতপ্রাপ্ত বা অনিরাময়যোগ্য রোগে আক্রান্ত হয়, তবেই কেবল ১৪ বছরের আগে সার্টিফিকেট সাপেক্ষে জবাইয়ের অনুমতি মিলবে।
নতুন এই নিয়ম অনুযায়ী, পশু জবাইয়ের এই প্রয়োজনীয় সার্টিফিকেট দেবেন এলাকার পৌরসভার প্রধান অথবা পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি। তবে এই সার্টিফিকেটে অবশ্যই সরকারি ভেটেনারি বা পশু চিকিৎসক কর্মকর্তার স্বাক্ষর থাকতে হবে। এর পাশাপাশি, রাস্তার ধারে বা প্রকাশ্য স্থানে যেকোনো ধরনের কসাইখানা ও পশু কুরবানি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
safiyarrahaman57@okicici
এখন থেকে শুধুমাত্র প্রশাসন বা পৌরসভার নির্ধারিত নির্দিষ্ট কসাইখানায় (Slaughterhouse) গিয়েই পশু কুরবানি দেওয়া যাবে। এই নিয়ম অমান্য করলে ১৯৫০ সালের আইন অনুযায়ী ৬ মাসের কারাদণ্ড, ১ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আদালতে শুনানির সময় মামলাকারীদের পক্ষে আইনজীবী ইমতিয়াজ আহমেদ প্রশ্ন তোলেন যে, ঈদের মুখে এত বিপুল সংখ্যক পশুর ফিটনেস সার্টিফিকেট দেওয়ার মতো প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো বা পর্যাপ্ত কসাইখানা রাজ্যে কোথায় আছে? রাজ্যজুড়ে এত কম সময়ে ১৪ বছরের বেশি বয়সী গরু খুঁজে কুরবানি দেওয়া কার্যত অসম্ভব বলেও তিনি দাবি করেন। অন্যদিকে, অন্য এক মামলাকারীর পক্ষে আইনজীবী দেবযানী দাশগুপ্ত ধর্মীয় কারণে যেকোনো ধরনের প্রাণী বলি বা কুরবানি পুরোপুরি বন্ধ করার আর্জি জানান। তিনি সুপ্রিম কোর্টের পূর্ববর্তী নির্দেশের হাওয়ালা দিয়ে বলেন, প্রকাশ্য স্থানে কুরবানি দেওয়া আইনত নিষিদ্ধ।
সব পক্ষের বক্তব্য শোনার পর ডিভিশন বেঞ্চ স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, ধর্মীয় আবেগ ও রীতিনীতিকে সম্মান জানিয়েও সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ লঙ্ঘন করা যাবে না। প্রকাশ্য স্থানে কোনোভাবেই পশু কুরবানি দেওয়া চলবে না। তবে ১৯৫০ সালের আইনের ১২ নম্বর ধারা (যা বিশেষ ক্ষেত্রে বা ধর্মীয় উৎসবে ছাড় দেওয়ার ক্ষমতা রাখে) বলবৎ করার বিষয়ে কোনো শিথিলতা আনা যায় কি না, সেই বিষয়ে আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে রাজ্য সরকারকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে কলকাতা হাইকোর্ট।

