‘কত দিন অত্যাচার চলবে?’ ক্যামাক স্ট্রিটে তৃণমূলের দফতরে হামলার অভিযোগকে কেন্দ্র করে এ বার দিল্লিতে গিয়ে ধর্নায় বসার হুঁশিয়ারি দিলেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সভানেত্রী তথা রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বৃহস্পতিবার ফেসবুক লাইভে এসে রাজ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, পুলিশের ভূমিকা, দলীয় কার্যালয়ে হামলা এবং নাগরিক অধিকার নিয়ে একাধিক অভিযোগ তোলেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, রাজনৈতিক ‘অত্যাচার’ বন্ধ না হলে গণতান্ত্রিক পথে দিল্লিতে গিয়ে প্রতিবাদ করবেন তিনি।
বৃহস্পতিবার ভোরে কলকাতার ক্যামাক স্ট্রিটে তৃণমূলের একটি দফতরে হামলা ও ভাঙচুরের অভিযোগ ওঠে। তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় সেই ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ সমাজমাধ্যমে প্রকাশ করেন। তাঁর অভিযোগ, ভোর সাড়ে ৪টে নাগাদ কয়েক জন দুষ্কৃতী দফতরে ঢুকে ভাঙচুর চালায় এবং সেখানে থাকা কর্মীদের হেনস্থা করে। দফতর থেকে বিভিন্ন সামগ্রী নিয়ে যাওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়।
সন্ধ্যায় বিষয়টি নিয়ে মুখ খোলেন মমতা। তাঁর অভিযোগ, বিজেপির লোকজনই ওই হামলার পিছনে রয়েছে। দফতরে থাকা কর্মীদের আটকে রেখে হেনস্থা করা হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। মমতার কথায়, কলকাতার বুকে পুলিশের নাকের ডগায় এমন ঘটনা ঘটেছে। এই ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।
মমতা জানান, শুধু ক্যামাক স্ট্রিট নয়, রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় তৃণমূলের কর্মী-সমর্থকদের উপর হামলা, দলীয় কার্যালয় দখল এবং মামলা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। তাঁর দাবি, রাজ্যে তৃণমূলের চার হাজারেরও বেশি দলীয় কার্যালয় দখল বা লুট করা হয়েছে। বহু কর্মীর বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
পুলিশের ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে মমতা বলেন, পুলিশকে মানুষের ‘রক্ষক’ হিসাবেই কাজ করতে হবে। তাঁর অভিযোগ, পুলিশের একাংশ রাজনৈতিক কর্মীদের উপর চাপ তৈরি করছে এবং সাধারণ মানুষকেও নানা ভাবে হয়রানির মুখে পড়তে হচ্ছে। তবে একই সঙ্গে সব পুলিশকর্মীকে তিনি দায়ী করছেন না বলেও জানান। আইন মেনে মানুষের পাশে থাকা পুলিশকর্মীদের প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা রয়েছে বলে জানান তৃণমূল নেত্রী।
এর পরেই দিল্লিতে আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দেন মমতা। তিনি বলেন, এই পরিস্থিতির পরিবর্তন না হলে প্রয়োজনে দিল্লিতে গিয়ে ধর্নায় বসবেন। এমনকি বিজেপি নেতাদের বাড়ির সামনেও গণতান্ত্রিক প্রতিবাদ করার কথা বলেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, সাধারণ মানুষের শান্তিতে বাঁচার অধিকার রয়েছে এবং রাজনৈতিক মতের কারণে কাউকে সেই অধিকার থেকে বঞ্চিত করা উচিত নয়।
ভোটার তালিকা নিয়েও এ দিন কেন্দ্রের বিরুদ্ধে সরব হন মমতা। তাঁর অভিযোগ, যোগ্য নাগরিকদের নাম বাদ দেওয়ার মাধ্যমে তাঁদের অধিকার ক্ষুণ্ণ করা হচ্ছে। নাম বাদ দেওয়ার বদলে প্রকৃত ভোটারদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার উপর জোর দেওয়া উচিত বলে দাবি করেন তিনি। বাংলার সংস্কৃতি, শিক্ষা ও পরিচয় নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন মমতা।
রাজ্যের বিভিন্ন জেলার রাজনৈতিক পরিস্থিতির কথাও তুলে ধরেন তিনি। কোচবিহার, বাঁকুড়া, হাওড়া, হুগলি-সহ বিভিন্ন জায়গায় রাজনৈতিক কর্মী ও সাধারণ মানুষকে হেনস্থার অভিযোগ করেন মমতা। কোথায় কে যাবে বা কার সঙ্গে দেখা করবে, তা রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা হচ্ছে বলেও অভিযোগ তাঁর।
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়েও বক্তব্য রাখেন মমতা। সংবাদমাধ্যমের দফতরে হামলা, সাংবাদিকদের কাজের ক্ষেত্রে বাধা এবং ডিজিটাল মিডিয়ার কর্মীদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপের অভিযোগ তুলে তিনি প্রশ্ন করেন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে এমন পরিস্থিতি কেন তৈরি হচ্ছে। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়, প্রেসিডেন্সি এবং বারাসত বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনাও তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে।
নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নিয়েও কেন্দ্রকে নিশানা করেন মমতা। জিরে, পেঁয়াজ, আদা, আলু-সহ বিভিন্ন পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির কারণে সাধারণ মানুষের উপর চাপ বাড়ছে বলে দাবি করেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, মানুষের দৈনন্দিন সমস্যা সমাধান করাই সরকারের প্রধান দায়িত্ব হওয়া উচিত।
অন্য দিকে, ক্যামাক স্ট্রিটের ঘটনায় বিজেপির যোগ থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বিজেপি বিধায়ক সজল ঘোষ। তাঁর দাবি, ঘটনাটিকে রাজনৈতিক ভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। দফতরে গভীর রাতে তৃণমূল কর্মীদের উপস্থিতি নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। ওই ঘটনায় পুলিশ ইতিমধ্যেই কয়েক জনকে গ্রেফতার করেছে বলে জানা গিয়েছে।
সব মিলিয়ে ক্যামাক স্ট্রিটের ঘটনা ঘিরে রাজ্য রাজনীতিতে নতুন করে চাপানউতোর শুরু হয়েছে। মমতার দিল্লিতে গিয়ে ধর্নায় বসার হুঁশিয়ারি এবং বিজেপির পাল্টা বক্তব্যের জেরে রাজনৈতিক সংঘাত আগামী দিনে আরও বাড়তে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

