রুটিরুজির টানে ভিন্রাজ্যে গিয়ে চরম বিপাকে মুর্শিদাবাদের ২৩ জন পরিযায়ী শ্রমিক। ছত্তীসগঢ়ের বিলাসপুরে ‘বাংলাদেশি’ সন্দেহে তাঁদের গ্রেপ্তার করেছে স্থানীয় পুলিশ বলে অভিযোগ। এই ঘটনায় তীব্র চাঞ্চল্য ও উদ্বেগ ছড়িয়েছে মুর্শিদাবাদের সুতি ও সামশেরগঞ্জ এলাকায়। ধৃতদের ফেরাতে ইতিমধ্যেই স্থানীয় প্রশাসনের দ্বারস্থ হয়েছেন পরিবারের সদস্যেরা।
স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, সুতি ও সামশেরগঞ্জ এলাকার বেশ কয়েক জন যুবক গত কয়েক বছর ধরে কাজের সূত্রে ছত্তীসগঢ়ের বিভিন্ন এলাকায় যাতায়াত করেন। তাঁদের মধ্যে অনেকে গত ১০-১২ বছর ধরে রায়পুর, বিলাসপুর-সহ বিভিন্ন এলাকায় ফেরিওয়ালার কাজ করছেন। বাড়ি বাড়ি ঘুরে রান্নার বাসনপত্র বিক্রি করেই তাঁদের অনেকের সংসার চলে বলে পরিবারের দাবি।
পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, গত ৪ সেপ্টেম্বর বিলাসপুরের গণেশনগর, চুচিয়াপাড়া এলাকায় তাঁরা যে বাড়িতে থাকতেন, সেখানে আচমকাই অভিযান চালায় স্থানীয় পুলিশ। সেখান থেকে মুর্শিদাবাদের শ্রমিকদের থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। পরে বাংলাদেশি সন্দেহে তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে অভিযোগ। রবিবার তাঁদের বিলাসপুর জেলা আদালতে পেশ করা হয়। এর পর তাঁদের রায়পুরের একটি ‘হোল্ডিং ক্যাম্পে’ পাঠানো হয়েছে বলে পরিবারের দাবি।
পরিবারের বক্তব্য, তাঁদের প্রত্যেকের কাছেই ভারতীয় নাগরিকত্বের প্রমাণ হিসাবে আধার কার্ড, ভোটার কার্ড, স্কুলের শংসাপত্র-সহ বিভিন্ন সরকারি নথি রয়েছে। তাঁদের অভিযোগ, নথি থাকা সত্ত্বেও কী ভাবে বাংলাদেশি সন্দেহে তাঁদের গ্রেপ্তার করা হল, তা তাঁরা বুঝতে পারছেন না।
বাংলাদেশি সন্দেহে গ্রেপ্তার হওয়া পরিযায়ী শ্রমিক নাসিরউদ্দিন শেখের পরিবারের এক সদস্যের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে সামশেরগঞ্জের হিরানন্দপুর গ্রামে তাঁদের বসবাস। নাসিরউদ্দিনও প্রায় ১০-১২ বছর ধরে ছত্তীসগঢ়ে ফেরিওয়ালার কাজ করেন। প্রশাসনের কাছে পরিবারের আবেদন, প্রয়োজন হলে মুর্শিদাবাদে এসে তাঁদের নথিপত্র যাচাই করা হোক।
অন্যদিকে, মুস্তাকিন শেখের স্ত্রী নুসরত বেগমের অভিযোগ, শুক্রবার দুপুরে পুলিশ আচমকাই তাঁদের থাকার জায়গায় পৌঁছয়। সেই সময় বাকিরা রান্নার কাজে ব্যস্ত ছিলেন। মুস্তাকিন শৌচাগারে থাকায় প্রথমে তাঁকে পাওয়া যায়নি। পরে ফোন করে ডেকে নিয়ে গিয়ে তাঁকেও গ্রেপ্তার করা হয় বলে তাঁর দাবি।
আটক ২৩ জনের বেশির ভাগই এ বারের বিধানসভা নির্বাচনে ভোট দিয়েছেন। পরিবারের সদস্যদের ফোনও পুলিশ নিয়ে নিয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন তিনি। ফলে বাংলাদেশী সন্দেহ গ্রেপ্তার হওয়া ২৩ জন ব্যক্তি বর্তমানে কোথায় রয়েছেন, কী অবস্থায় আছেন— তা নিয়ে উদ্বেগে পরিবারগুলি।
এবার এই ঘটনায় সরব হয়েছেন তৃণমূলের রাজ্যসভার সাংসদ সামিরুল ইসলাম। সমাজমাধ্যমে একটি পোস্ট করে তিনি দাবি করেন, সুতি থানা এলাকার ২৩ জন পরিযায়ী শ্রমিককে বাংলাদেশি সন্দেহে ছত্তীসগঢ়ে আটক করা হয়েছে। তাঁদের সকলেই মুর্শিদাবাদ জেলার বাসিন্দা এবং ভারতীয় নাগরিক বলে দাবি করেছেন তিনি।
সামিরুলের দাবি, গত ৪ সেপ্টেম্বর বিলাসপুর জেলার সিরগিটি থানার পুলিশ গণেশনগর, চুচিয়াপাড়া এলাকা থেকে ওই শ্রমিকদের আটক করে। বর্তমানে তাঁদের রায়পুরের একটি হোল্ডিং ক্যাম্পে রাখা হয়েছে বলেও দাবি তাঁর।
বাংলাভাষী মানুষকে ‘বাংলাদেশি’ সন্দেহে এভাবে হেনস্থা করার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে তৃণমূল সাংসদ সামিরুল ইসলাম বলেন, “বাংলা আমাদের মাতৃভাষা। খোদ কেন্দ্রীয় সরকারও সম্প্রতি বাংলাকে ‘ধ্রুপদি ভাষা’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। তাই শুধু ভাষার ভিত্তিতে কাউকে এভাবে দাগিয়ে দেওয়া বা হেনস্থা করা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।”
তিনি আরও স্পষ্ট করে দেন যে, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া এবং সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়া কোনো পরিযায়ী শ্রমিককে এভাবে বৈষম্যের শিকার করা সম্পূর্ণ বেআইনি। ছত্তীসগঢ়ে আটকে থাকা মুর্শিদাবাদের ওই শ্রমিকদের অবিলম্বে মুক্তির দাবি তুলেছেন সাংসদ। একইসঙ্গে, গোটা ঘটনার একটি ন্যায্য, নিরপেক্ষ এবং আইনসম্মত পর্যালোচনার জন্য তিনি ইতিমধ্যেই পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ, ছত্তীসগঢ় পুলিশ এবং রায়পুরের পুলিশ কমিশনারের কাছে লিখিত আবেদন জানিয়ে প্রয়োজনীয় ও দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণের আর্জি জানান।
সামিরুল ইসলামের পোস্টে দেওয়া তালিকা অনুযায়ী, আটক শ্রমিকেরা হলেন— ইগাজুল শেখ, ইসলাম শেখ, কিরণ শেখ, ইব্রাহিম শেখ, এনজামুল শেখ, সফিকুল আলম, মোসিকুল শেখ, শিব মণ্ডল, সাবির শেখ, সফিকুল ইসলাম, লালটু শেখ, সেন্টু শেখ, আসগর শেখ, নাসিকুর শেখ, রাহুল খান, সানিউল শেখ, আলাউদ্দিন শেখ, মতিন শেখ, নাসিরউদ্দিন শেখ, মোস্তাকিন শেখ, জসিম হক, বুদ্ধু শেখ এবং মোকিম শেখ।
এদিকে বিজেপির জঙ্গিপুর সাংগঠনিক জেলা সভাপতি সুবল চন্দ্র ঘোষের বক্তব্য, একসঙ্গে এত জনকে গ্রেপ্তারের পিছনে নিশ্চয়ই কোনও কারণ রয়েছে। দলীয় স্তরে তাঁরা বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখছেন বলেও জানিয়েছেন তিনি।

