বাংলাদেশি সন্দেহে গ্রেফতারির পর আড়াই মাসেরও বেশি সময় কেটে গিয়েছে। কিন্তু এখনও জেলেই রয়েছেন উত্তর দিনাজপুরের করণদিঘির বাঘরই গ্রামের ৬৬ বছরের জলিল আখতার। পরিবারের দাবি, জলিল এ দেশেরই নাগরিক। তাঁর নাগরিকত্বের পক্ষে জমির দলিল, ভোটার সংক্রান্ত নথি-সহ একাধিক সরকারি কাগজপত্র রয়েছে। এমনকি ২০২৬ সালের এসআইআর (SIR)-এর ফাইনাল ভোটার তালিকাতেও তাঁর নাম রয়েছে বলে দাবি পরিবারের।

পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, জুন মাসের শেষ দিকে রাতে ডালখোলা থানার পুলিশ জলিলকে তাঁর বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যায়। পরিবারের অভিযোগ, ঘুমন্ত অবস্থায় তাঁকে বাড়ি থেকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। পরে পুলিশ জানায়, জলিল বাংলাদেশি বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। বৈধ নাগরিকত্বের নথি দেখালে তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হবে বলেও পরিবারের সদস্যদের জানানো হয়েছিল বলে দাবি।
এর পরেই শুরু হয় নথিপত্র জোগাড়ের দৌড়। পরিবারের তরফে জলিলের নাগরিকত্বের সমর্থনে একাধিক কাগজপত্র পুলিশের কাছে জমা দেওয়া হয়। পরিবারের দাবি, ১৯৬৭ সালে তাঁর বাবার নামে জমি কেনার দলিল রয়েছে। ২০০২ সালের ভোটার তালিকাতেও জলিলের নাম ছিল। ২০২৬ সালের ভোটার সংক্রান্ত নথিতেও তাঁর নাম রয়েছে। আধার, প্যান, জব কার্ড এবং স্থানীয় পঞ্চায়েতের দেওয়া শংসাপত্রও রয়েছে বলে দাবি পরিবারের।

শুধু তাই নয়, পরিবারের বক্তব্য, চলতি বছর ভোটেও নিজের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন জলিল। তাঁর ভোটার সংক্রান্ত তথ্য-স্লিপেও নাম রয়েছে। সেই নথিতে জলিল আখতারকে ৬৬ বছর বয়সি ভোটার হিসেবে দেখানো হয়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে, নাগরিকত্ব নিয়ে এতগুলি নথি থাকা সত্ত্বেও কেন তাঁকে বিদেশি সন্দেহে গ্রেফতার করা হল?

পরিবারের দাবি, গ্রেফতারের পর জলিলকে প্রথমে ফুলবাড়ি এবং পরে চাকুলিয়ার হোল্ডিং সেন্টারে রাখা হয়েছিল। পরে ২২ অগস্ট তাঁকে ইসলামপুর আদালতে পেশ করা হয়। তাঁর বিরুদ্ধে ফরেনার্স অ্যাক্টে মামলা করা হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
পরিবারের তরফে আইনজীবীর মাধ্যমে আদালতে নাগরিকত্বের পক্ষে বিভিন্ন নথি জমা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এখনও জামিন মেলেনি জলিলের। আগামী ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ মামলার পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য হয়েছে। আপাতত ইসলামপুর জেলেই রয়েছেন তিনি।
জলিলের আইনজীবী মুক্তার আহমেদের দাবি, নাগরিকত্বের পক্ষে একাধিক নথি আদালতে পেশ করা হলেও বার বার শুনানির তারিখ পড়ছে। তাঁর কথায়, ‘‘ওই ব্যক্তি যে এ দেশের নাগরিক, তার প্রমাণ হিসেবে সমস্ত কাগজপত্র দাখিল করা হয়েছে। তার পরেও একের পর এক শুনানির তারিখ পড়ছে।’’
জলিলের মেয়ে কুলসুম খাতুনের অভিযোগ, ‘‘বাংলাদেশি সন্দেহে বাড়ি থেকে বাবাকে তুলে নিয়ে গিয়েছিল ডালখোলা থানার পুলিশ। পরের দিন পুলিশ জানিয়েছিল, বৈধ কাগজপত্র নিয়ে এলে বাবাকে ছেড়ে দেওয়া হবে। আমরা সমস্ত কাগজপত্র দিয়েছি। কিন্তু এখনও বাবা জেলে।’’
পরিবারের দাবি, জলিলের বয়স হয়েছে। তাঁর শারীরিক সমস্যাও রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে জেলে থাকার কারণে তাঁর শারীরিক ও মানসিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন পরিবারের সদস্যেরা। কুলসুমের কথায়, ‘‘বাবার অনেক বয়স। হাই ডায়াবিটিস রয়েছে। বিনা দোষে এই হয়রানির ধকল বাবা আর সহ্য করতে পারছেন না।’’

ইসলামপুর পুলিশ জেলার পুলিশ সুপার রাকেশ সিং জানিয়েছেন, ফরেনার্স অ্যাক্টে জলিলকে গ্রেফতার করে আদালতে পেশ করা হয়েছে। বিষয়টি এখন আদালতের বিচারাধীন। ফলে এ বিষয়ে পুলিশের তরফে বিস্তারিত মন্তব্য করা হয়নি।
অন্য দিকে, ঘটনায় ‘ষড়যন্ত্রের’ অভিযোগ তুলেছেন ভোটাধিকার সুরক্ষা সমন্বয় সমিতির আহ্বায়ক দুলাল রাজবংশী। তাঁর প্রশ্ন, জলিল যদি বৈধ ভারতীয় নাগরিক না হন, তা হলে তাঁর স্ত্রী, পুত্র এবং কন্যাদের নাগরিকত্ব নিয়ে একই প্রশ্ন ওঠার কথা। কিন্তু তাঁদের বিরুদ্ধে এমন কোনও পদক্ষেপ করা হয়নি কেন—সেই প্রশ্নই তুলেছেন তিনি।
