‘বাংলাদেশি’ বলে এক আসামের বাঙালি মুসলিম মহিলাকে জোর করে সীমান্ত পার করে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়ার ঘটনায় কড়া অবস্থান নিল গুয়াহাটি হাইকোর্ট। আদালত জানিয়েছে, ওই মহিলাকে আটক করে বাংলাদেশে পাঠানোর সময় প্রয়োজনীয় আইনি নিয়ম মানা হয়নি। এই ঘটনায় আসাম সরকারকে মহিলার পরিবারকে ২ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে আদালত। পাশাপাশি, গোটা ঘটনার তদন্ত করে রিপোর্ট জমা দেওয়ার জন্য আসামের স্বরাষ্ট্র দপ্তরকেও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
মুমতাজ বেগম নামে আসামের ওই মহিলার বিরুদ্ধে নাগাঁওয়ের ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালে মামলা চলছিল। ২০১৯ সালে ওই ট্রাইব্যুনাল তাঁকে বিদেশি বলে ঘোষণা করে। সেই সিদ্ধান্ত মানতে না পেরে মুমতাজ হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন। তাঁর দাবি ছিল, তিনি ভারতের নাগরিক এবং নিজের পক্ষে বেশ কিছু নথিও আদালতে জমা দেন।
মামলাটি শুনতে গিয়ে হাইকোর্ট দেখতে পায়, মুমতাজের দেওয়া সব নথি ট্রাইব্যুনাল ঠিক ভাবে খতিয়ে দেখেনি। এরপর চলতি বছরের এপ্রিল মাসে হাইকোর্ট ট্রাইব্যুনালের আগের সিদ্ধান্ত বাতিল করে দেয়। মামলাটি আবার নতুন করে দেখার জন্য ট্রাইব্যুনালকে নির্দেশ দেওয়া হয়।
এর পর চলতি বছরের গত ৩০ মে মুমতাজ ট্রাইব্যুনালে হাজির হন। সেখানেই তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। পরে তাঁকে একটি আটক কেন্দ্রে রাখা হয়। পরিবারের দাবি, এরপর ১৪ জুন রাতে তাঁদের কিছু না জানিয়েই মুমতাজকে সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
বিষয়টি জানতে পেরে মুমতাজের স্বামী মুজাম্মেল হক গুয়াহাটি হাইকোর্টে মামলা করেন। তিনি আদালতের কাছে জানতে চান, তাঁর স্ত্রীকে কোথায় রাখা হয়েছে এবং কী ভাবে তাঁকে বাংলাদেশে পাঠানো হল। এই ধরনের আবেদনের মাধ্যমে আদালত কাউকে বেআইনি ভাবে আটক করা হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে পারে।
মামলাটির শুনানি হয় বিচারপতি কল্যাণ রাই সুরানা এবং বিচারপতি সুস্মিতা ফুকন খাউন্দের বেঞ্চে। গত ৩ সেপ্টেম্বর আদালত জানায়, কাউকে বিদেশি বলে ঘোষণা করার পর তাঁকে সেই সিদ্ধান্তের কথা জানানো জরুরি। একই সঙ্গে সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আদালতে যাওয়ার সুযোগও দিতে হবে। মুমতাজের ক্ষেত্রে এই নিয়মগুলি ঠিক ভাবে মানা হয়নি বলে আদালতের পর্যবেক্ষণে উঠে আসে।
আদালত আরও জানিয়েছে, কাউকে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নিয়ে যাওয়ার আগে তাঁর পরিবারের অন্তত একজন প্রাপ্তবয়স্ক সদস্যকে বিষয়টি জানানো উচিত। মুমতাজকে বাংলাদেশে পাঠানোর আগে তাঁর পরিবারকে না জানানোর বিষয়টিও আদালতের নজরে এসেছে।
নাগাঁওয়ের ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালের কাজ নিয়েও কড়া মন্তব্য করেছে হাইকোর্ট। আদালতের মতে, এই মামলায় আইন ঠিক ভাবে ব্যবহার করা হয়নি। নাগরিকত্বের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির দেওয়া নথি ও বক্তব্য যথাযথ ভাবে দেখা দরকার বলেও আদালত স্পষ্ট করেছে।
এই ঘটনায় শুধু ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশই দেয়নি গুয়াহাটি হাইকোর্ট। আসাম সরকারের ভূমিকা নিয়েও কড়া মন্তব্য করেছে আদালত। আদালত বলেছে, এই মামলায় ‘আইনের অপব্যবহারের প্রবণতা’ দেখা গিয়েছে। অর্থাৎ, মুমতাজকে আটক করা থেকে শুরু করে বাংলাদেশে পাঠানো পর্যন্ত নিয়ম মেনে সব কিছু করা হয়নি। এই কারণেই মুমতাজের পরিবারকে ২ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে আদালত।
পাশাপাশি গোটা ঘটনার তদন্তের জন্য আসামের স্বরাষ্ট্র দপ্তরকে নির্দেশ দিয়েছে হাইকোর্ট। এবং বলা হয়েছে, বাংলাদেশ থেকে মুমতাজকে খুঁজে বের করে তাঁকে ভারতে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে।
মামলাটির পরবর্তী শুনানি আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর হওয়ার কথা রয়েছে। সেই শুনানিতে মুমতাজকে ভারতে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে কী পদক্ষেপ করা হয়েছে এবং ঘটনার তদন্ত কতদূর এগিয়েছে, তা নিয়ে আদালতে আলোচনা হতে পারে বলে জানা যায়।

