গণতন্ত্রের অন্যতম ভিত্তি হলো ভিন্নমত প্রকাশের অধিকার। কিন্তু সরকারের নীতির সমালোচনা বা ক্ষমতাসীন দলের বিরুদ্ধে স্লোগান দিলেই কি একজন নাগরিককে শাস্তির মুখে পড়তে হবে? এই প্রশ্নকেই সামনে এনে গুরুত্বপূর্ণ রায় দিয়েছে বোম্বে হাইকোর্ট। মামলার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন এসডিপিআই নেতা সাঈদ আহমদ আব্দুল ওয়াহিদ চৌধুরী। অভিযোগ, তিনি কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের বিভিন্ন নীতির বিরোধিতা করে মিছিল ও প্রতিবাদ কর্মসূচির আয়োজন করেছিলেন। পাশাপাশি কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের বিরুদ্ধেও স্লোগান ও সমালোচনা করেছিলেন।
এসব ঘটনাকে ভিত্তি করেই মুম্বাই পুলিশ তাঁকে এক বছরের জন্য মুম্বাই ও পার্শ্ববর্তী এলাকা থেকে বহিষ্কারের নির্দেশ দেয়। শেষ পর্যন্ত পুলিশের সেই সিদ্ধান্তই বাতিল করে দেয় বোম্বে হাইকোর্ট। শুধু বহিষ্কারাদেশই বাতিল নয়, শুনানির সময় মুম্বাই পুলিশের ভূমিকাও কড়া প্রশ্নের মুখে পড়ে। বিচারপতি মাধব জে. জামদার স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “পুলিশ কোনো মুখ্যমন্ত্রী বা প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত কর্মচারী নয়, তারা জনগণের সেবক।”
মামলা সূত্রে জানা গেছে, নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ), জ্ঞানবাপী মসজিদসহ কেন্দ্রের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে মিছিল, ধর্না ও প্রতিবাদ কর্মসূচির আয়োজন করেছিলেন এসডিপিআই নেতা সাঈদ আহমদ আব্দুল ওয়াহিদ চৌধুরী। এসব কর্মসূচিকে ঘিরে তাঁর বিরুদ্ধে পাঁচটি এফআইআর দায়ের করে মুম্বাই পুলিশ।
এরপর মহারাষ্ট্র পুলিশ আইনের অধীনে ২০২৫ সালের ৩ ডিসেম্বর তাঁকে এক বছরের জন্য মুম্বাই ও আশপাশের এলাকা থেকে বহিষ্কারের নির্দেশ দেওয়া হয়। পরে ২০২৬ সালের ২৭ মার্চ বিভাগীয় কমিশনারও সেই সিদ্ধান্ত বহাল রাখেন। এরপর ওই দুই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে বোম্বে হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন সাঈদ আহমদ।
মামলার শুনানিতে পুলিশের সিদ্ধান্ত নিয়ে একাধিক প্রশ্ন তোলে আদালত। বিচারপতি মাধব জে. জামদার জানতে চান, শুধু ‘বিজেপি সরকার মুর্দাবাদ‘ বা ‘অমিত শাহ মুর্দাবাদ‘ স্লোগান দেওয়ার কারণে কীভাবে কাউকে এলাকা ছাড়া করা যায়? মানুষ কি সরকারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কথা বলতে বা প্রতিবাদ করতে পারবে না?
বিচারপতি বলেন, পুলিশের মনে রাখা উচিত তারা কোনো প্রধানমন্ত্রী বা মুখ্যমন্ত্রীর ব্যক্তিগত কর্মচারী নয়, তারা জনগণের সেবক। তাই সরকারের সমালোচনা করলেই কোনো নাগরিকের বিরুদ্ধে এমন কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া ঠিক নয়। আদালত পুলিশের এই পদক্ষেপকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং আইনবিরোধী বলেও মন্তব্য করে।
আদালত আরও বলে, এখন এমন পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে, যেখানে সামান্য প্রতিবাদ করলেই মানুষের বিরুদ্ধে মামলা করা হচ্ছে। অথচ ভারতের সংবিধান প্রতিটি নাগরিককে নিজের মত প্রকাশের অধিকার দিয়েছে। সংবিধানের ১৯ নম্বর অনুচ্ছেদে বাক ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং ২১ নম্বর অনুচ্ছেদে সম্মানের সঙ্গে বেঁচে থাকার অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। তাই শুধু সরকারের সমালোচনা করার কারণে কারও সেই অধিকার কেড়ে নেওয়া যায় না, সব দিক বিবেচনা করে আদালত মুম্বাই পুলিশের বহিষ্কারের নির্দেশ বাতিল করে দেয়।

