নওদার বিধায়ক হুমায়ুন কবীরের সাম্প্রতিক মন্তব্যকে কেন্দ্র করে বিধানসভায় কড়া অবস্থান নিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। সোমবার অধিবেশনে তিনি জানিয়ে দেন, উস্কানিমূলক ও হুমকিমূলক বক্তব্য কোনওভাবেই বরদাস্ত করা হবে না। হুমায়ুন কবীরের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যেই দুটি পৃথক FIR দায়ের হয়েছে বলেও তিনি জানান। একই সঙ্গে তাঁর কড়া বার্তা, “যথেষ্ট হয়েছে। এবার এই ধরনের লোককে শিক্ষা দেওয়ার সময় এসেছে।”
আজ বিধানসভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু প্রথমেই রেজিনগর ও শক্তিপুরে হুমায়ুন কবীরের দেওয়া দুটি বক্তৃতার অংশ পড়ে শোনান। এরপর তিনি বলেন, একজন জনপ্রতিনিধির মুখে এমন ভাষা কখনও গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। তাঁর কথায়, “আপনাকে কান খুলে শুনে রাখতে হবে, এভাবে হুমকি, বেপরোয়া এবং লাগামছাড়া কথা বলতে দেব না। দেব না, দেব না।”
এদিন মুখ্যমন্ত্রী জানান, ২৬ জুন রেজিনগরের সভায় দেওয়া বক্তব্যের ভিত্তিতে রেজিনগর থানায় একটি মামলা দায়ের হয়েছে। ওই মামলায় ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ১৫২, ১৯৬, ১৯৭, ২২৪, ২৯৯, ৩৫১(২), ৩৫২ ও ৩৫৩ সহ একাধিক ধারায় অভিযোগ নথিভুক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি শক্তিপুরে দেওয়া আরেকটি বক্তব্যের জেরেও শক্তিপুর থানায় পৃথক FIR দায়ের হয়েছে। তাঁর দাবি, পুলিশ ইতিমধ্যেই তদন্ত শুরু করেছে এবং আইন অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
হুমায়ুন কবীর কেন এই ধরনের বক্তব্য দিচ্ছেন, সেই ব্যাখ্যাও দেন শুভেন্দু অধিকারী। তাঁর দাবি, এর নেপথ্যে রয়েছে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্য। প্রথমত, ভরতপুর, রেজিনগর ও নওদার বিভিন্ন পঞ্চায়েতের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিজেদের দল AJUP-এ নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন হুমায়ুন, কিন্তু তাতে সফল হচ্ছেন না। দ্বিতীয়ত, দুটি বিধানসভা আসনে জয়ের পর নিয়ম মেনে রেজিনগর আসন ছেড়ে দিয়েছেন তিনি। আগামী কয়েক মাসের মধ্যে সেখানে উপনির্বাচন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। শুভেন্দুর অভিযোগ, সেই আসনে নিজের ছেলেকে জেতানোর লক্ষ্যেই ধর্মীয় মেরুকরণের চেষ্টা করছেন হুমায়ুন কবীর। তাঁর দাবি, ওই কেন্দ্রে প্রায় ৭২ শতাংশ মুসলিম ভোটার রয়েছেন এবং সেই ভোট একজোট করার উদ্দেশ্যেই এই ধরনের বক্তব্য দেওয়া হচ্ছে।
বিধানসভায় শুভেন্দু আরও বলেন, “এত বড় ক্ষমতা তাঁকে কেউ দেয়নি। ভারতের সংবিধান এবং আইনই শেষ কথা বলবে, কোনও বাতেলাবাজ নয়।” তিনি হুমায়ুন কবীরকে সংযত হওয়ার পরামর্শ দিয়ে বলেন, ভবিষ্যতে এ ধরনের বক্তব্য দেওয়ার আগে অন্তত ২৫ বার ভাবা উচিত। পাশাপাশি তিনি সতর্ক করে জানান, শুধু বক্তা নন, যাঁরা এই ধরনের সভার আয়োজন করেছেন তাঁদের বিরুদ্ধেও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নিজের বক্তব্যে শুভেন্দু অতীতের কয়েকটি ঘটনারও উল্লেখ করেন। নাম না করেই তিনি সন্দেশখালির শাহজাহান শেখ, ক্যানিংয়ের শওকত মোল্লা এবং ফলতার জাহাঙ্গির খানের প্রসঙ্গ তুলে বলেন, অতীতে যাঁরা একই ধরনের হুমকির ভাষা ব্যবহার করেছিলেন, তাঁদের বিরুদ্ধেও আইন নিজের কাজ করেছে। তাঁর কথায়, “এ সরকার আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করবে, গুন্ডাদের শাসনের অবসান ঘটাবে।”
এরপর বিধানসভায় হুমায়ুন কবীরের ২৬ জুন রেজিনগরের সভায় দেওয়া বক্তব্যের অংশও তুলে ধরেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর দাবি, ওই সভায় হুমায়ুন বলেছিলেন, বিজেপি মুর্শিদাবাদে বেশি আস্ফালন করলে তিনি নিজে নেতৃত্ব দিয়ে লাখ লাখ মানুষকে রাস্তায় নামাবেন এবং বিজেপিকে প্রতিরোধ করবেন। এমনকি তিনি বলেন, তাঁর মাথা গরম হয়ে গেলে পুলিশ সুপার বা মুখ্যমন্ত্রী কাউকেই তিনি পরোয়া করবেন না। শুভেন্দুর মতে, এই ধরনের মন্তব্য আইনশৃঙ্খলার পক্ষে অত্যন্ত বিপজ্জনক এবং উস্কানিমূলক।
মুখ্যমন্ত্রী আরও জানান, আগামী এক সপ্তাহের মধ্যেই তিনি মুর্শিদাবাদ সফরে যাবেন। সেখানে প্রশাসনের সঙ্গে বৈঠক করে পরিস্থিতি খতিয়ে দেখবেন। তাঁর বক্তব্য, “ভারতের সংবিধান ও আইনই শেষ কথা বলে। কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়। যারা এই ধরনের উস্কানিমূলক রাজনীতি করবে, তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

