বিধানসভা নির্বাচনের পর তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরের দ্বন্দ্ব এবার পৌঁছে গেল জাতীয় নির্বাচন কমিশনের দরজায়। দলের প্রকৃত নেতৃত্ব কার হাতে, প্রতীক ও তহবিলের উপর কার অধিকার থাকবে এই দাবি ও পাল্টা দাবির জেরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন দুই শিবিরকে নথি-সহ নিজেদের অবস্থান জানাতে নির্দেশ দিয়েছে কমিশন। আগামী ৬ জুলাই সোমবার বিকেল সাড়ে ৫টার মধ্যে লিখিত জবাব জমা দিতে হবে।
সূত্রের খবর, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজের নেতৃত্বে গঠিত জাতীয় কর্মসমিতির তালিকা ইতিমধ্যেই নির্বাচন কমিশনে জমা দিয়েছেন। অন্যদিকে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে পৃথক বৈঠক করে নতুন জাতীয় ওয়ার্কিং কমিটি গঠন করা হয়েছে। সেখানে মধ্য হাওড়ার বিধায়ক অরূপ রায়কে চেয়ারম্যান ঘোষণা করা হয়। সেই কমিটিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম নেই। দুই পক্ষই নিজেদেরকেই ‘আসল তৃণমূল’ বলে দাবি করেছে।
বৃহস্পতিবার দিল্লিতে নির্বাচন কমিশনের ফুল বেঞ্চের সঙ্গে দেখা করেন বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর সঙ্গে ছিলেন ১০ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল, যার মধ্যে একাধিক বিধায়ক ও এক প্রাক্তন মন্ত্রীও ছিলেন। বৈঠকের পর ঋতব্রত দাবি করেন, দলের দুই-তৃতীয়াংশ বিধায়কসহ বহু জনপ্রতিনিধি তাঁদের সমর্থনে রয়েছেন। সেই কারণেই তাঁরাই প্রকৃত তৃণমূল কংগ্রেস এবং সেই দাবির পক্ষে প্রয়োজনীয় নথিও কমিশনের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে বলে তিনি জানান।
অন্যদিকে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবিরও দাবি করেছে, দলের সাংগঠনিক কাঠামো ও নেতৃত্ব তাঁদের হাতেই রয়েছে। ফলে কোন শিবিরকে নির্বাচন কমিশন প্রকৃত তৃণমূল কংগ্রেস হিসেবে স্বীকৃতি দেবে, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে জোর জল্পনা শুরু হয়েছে।
কমিশন জানিয়েছে, দুই পক্ষের লিখিত বক্তব্য ও জমা দেওয়া নথিপত্র খতিয়ে দেখেই পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। সেই সিদ্ধান্তের উপরই নির্ভর করতে পারে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতীক, তহবিল এবং সাংগঠনিক স্বীকৃতির ভবিষ্যৎ।
প্রসঙ্গত,এই তৃণমূল কংগ্রেস (AITC) প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৯৮ সালের ১ জানুয়ারি। কংগ্রেসের সঙ্গে মতপার্থক্যের জেরে দল ছেড়ে নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই তিনিই দলের সর্বোচ্চ নেত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে ধীরে ধীরে নিজেদের শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করে তৃণমূল। ২০১১ সালে বামফ্রন্টের ৩৪ বছরের শাসনের অবসান ঘটিয়ে প্রথমবার রাজ্যে ক্ষমতায় আসে দলটি। এরপর টানা তিনবার সরকার গঠন করে তৃণমূল কংগ্রেস।
তবে ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে দলের ভরাডুবির পর সংগঠনের ভিতরে বড় ধরনের মতবিরোধ প্রকাশ্যে আসে। বিরোধী দলনেতা নির্বাচন থেকে শুরু করে দলের সাংগঠনিক নেতৃত্ব, প্রতীক ও তহবিলের অধিকার সবকিছু নিয়েই দুই শিবিরের মধ্যে সংঘাত তৈরি হয়েছে। মূলত এই সংঘাতের শুরু হয় ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় ওসন্দীপন সাহার দলবিরোধী কার্যকলাপের জন্য। এই অভিযোগে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় ও এন্টালির বিধায়ক সন্দীপন সাহাকে মমতার দল তৃণমূল কংগ্রেস থেকে বহিষ্কার করে দেয়। তবে বহিষ্কারের পরও ঋতব্রতের পাশে দাঁড়ান ৬০ জনেরও বেশি বিধায়ক। পরে তাঁরা পৃথকভাবে বৈঠক করে নিজেদেরই ‘আসল তৃণমূল’ বলে দাবি করেন এবং নতুন জাতীয় ওয়ার্কিং কমিটির ঘোষণা করেন । বর্তমানে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন দুই পক্ষই নিজেদেরকে ‘আসল তৃণমূল’ বলে দাবি করছে। সেই দাবির বৈধতা যাচাই করতেই জাতীয় নির্বাচন কমিশন উভয় পক্ষের কাছে নথি-সহ ব্যাখ্যা চেয়েছে।

