ভারত কি সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতায় পিছিয়ে? ১৮০ দেশের তালিকায় ১৫৭-এ, কাঠগড়ায় মোদি জমানা

Ealiash Rahaman
By
Ealiash Rahaman
বিগত প্রায় পাঁচ বছর ধরে ডিজিটাল মিডিয়ার কাজের সঙ্গে যুক্ত। দেশ ও বিদেশের সমস্ত রকম খবরাখবর রাখতে ও তা প্রতিবেদন আকারে লিখতে অভ্যস্থ।
4 Min Read
WhatsApp_Group
সব খবর মোবাইলে পেতে Whatsapp গ্রুপে জয়েন্ট করুন

ভারত নিজেকে বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে দাবি করলেও, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার দিক থেকে দেশ এখন অনেক পিছিয়ে পড়েছে।  আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস’(RSF) এর ২০২৬ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী, ১৮০টি দেশের মধ্যে ভারতের স্থান এখন ১৫৭ নম্বরে।  গত বছর ভারত ছিল ১৫১তম স্থানে, অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে ভারত আরও ৬ ধাপ নিচে নেমে গিয়েছে।  এই পতন প্রমাণ করছে যে, ভারতে সাংবাদিকদের কাজের পরিবেশ দিন দিন কঠিন থেকে কঠিনতর হচ্ছে।

Join WhatsApp Channel Join Now
Telegram Group Join Now

রিপোর্টে ভারতের এই অবস্থাকে ‘অতি গুরুতর’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যা সাধারণত একনায়কতান্ত্রিক বা চরম অনুন্নত দেশগুলোতে দেখা যায়।  বিশেষজ্ঞদের মতে, সংবাদমাধ্যমের এই বেহাল দশা গণতন্ত্রের জন্য এক অশনিসংকেত।  একদিকে সত্য খবর পরিবেশন করতে গিয়ে সাংবাদিকদের আইনি হয়রানি ও হুমকির মুখে পড়তে হচ্ছে, অন্যদিকে সংবাদমাধ্যমের একটি বড় অংশ নিরপেক্ষতা হারিয়ে শাসকের অনুগত হয়ে পড়ছে।  আন্তর্জাতিক এই পরিসংখ্যান ভারতের গণতান্ত্রিক ভাবমূর্তিকে বিশ্বের দরবারে বড়সড় প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।

ভারতের এই শোচনীয় অবস্থার পেছনে সংবাদমাধ্যমের মালিকানাকে অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে দেখছে রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস (RSF)।  রিপোর্টের দাবি, ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদির সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই দেশের বড় বড় মিডিয়া হাউজগুলোর মালিকানা প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ গুটিকীয় প্রভাবশালী কর্পোরেট পরিবারের হাতে চলে গিয়েছে।  এর ফলে সংবাদমাধ্যমগুলো তাদের নিরপেক্ষতা হারিয়ে পুরোপুরি শাসকদলের স্বার্থ রক্ষায় ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। সাধারণ মানুষের সমস্যা তুলে ধরার বদলে এখনকার মিডিয়া হাউসগুলো একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক গোষ্ঠীর প্রচারযন্ত্র হিসেবে কাজ করছে।  সূক্ষ্মভাবে গড়ে ওঠা এই ‘পলিটিক্যাল-কর্পোরেট নেক্সাস’ বা রাজনৈতিক-বাণিজ্যিক আঁতাত ভারতের সংবাদ জগতের বহুত্ববাদী মডেলকে ধ্বংস করে দিয়েছে।  এর ফলে জন্ম নিয়েছে তথাকথিত ‘গোদি মিডিয়া’, যেখানে জনস্বার্থের চেয়ে ক্ষমতার তোষণই মূখ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আরএসএফ এর রিপোর্টে অভিযোগ করা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী সরাসরি কোনো সংবাদ সম্মেলন করেন না।  তিনি কেবল তাঁদেরই সাক্ষাৎকার দেন যাঁরা তাঁর গুণকীর্তন করেন।  এর ফলে সাধারণ মানুষের কাছে সঠিক তথ্য পৌঁছানোর পথ রুদ্ধ হচ্ছে।  মোদি জমানায় সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও অকারণ গ্রেপ্তারি উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে।  বিশেষ করে সরকারি সমালোচনা বা দুর্নীতি ফাঁস করলে সাংবাদিকদের ওপর রাষ্ট্রদ্রোহিতা ও সন্ত্রাস দমন আইনের (UAPA) মতো কঠোর ধারায় মামলা দেওয়া হচ্ছে, যাকে আরএসএফ এক ‘অঘোষিত জরুরি অবস্থা’ বলে অভিহিত করেছে। 

পাশাপাশি, ভিন্নমতাবলম্বী সাংবাদিকদের ‘দেশবিরোধী’ তকমা দিয়ে অনলাইনে চরম হেনস্তা করতে সক্রিয় রয়েছে বিশাল এক ডিজিটাল ‘ট্রোল বাহিনী’।  রিপোর্টে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, কেবল বিজেপি নয়, কংগ্রেসসহ বিভিন্ন আঞ্চলিক দলগুলোও সাংবাদিকদের ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে আইনি ব্যবস্থার অপব্যবহার করছে।  এই সার্বিক দমনমূলক পরিবেশ সাংবাদিকদের মধ্যে এক ভয়াবহ ‘সেলফ-সেন্সরশিপ’ বা আত্ম-নিয়ন্ত্রণের ভীতি তৈরি করছে।

এই রিপোর্টে বলা হয়েছে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর আয়ের প্রধান উৎস হলো সরকারি বিজ্ঞাপন।  মোদি সরকার বিগত বছরগুলোতে সরকারি বিজ্ঞাপনের পেছনে কোটি কোটি টাকা খরচ করেছে।  আর এই বিজ্ঞাপনের টাকাই এখন সংবাদমাধ্যমের ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার প্রধান অস্ত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে।  বিশেষ করে ছোট সংবাদমাধ্যমগুলো টিকে থাকার জন্য সরকারি বিজ্ঞাপনের ওপর এতটাই নির্ভরশীল যে, তহবিল বন্ধ হওয়ার ভয়ে তারা সরকারের সমালোচনা করার সাহস পায় না।  এভাবে বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে কেন্দ্র ও রাজ্য উভয় সরকারই মিডিয়াকে ‘সেন্সর’ করতে বাধ্য করছে।

এছাড়া, মোদি-ঘনিষ্ঠ আদানি গ্রুপের মতো বড় করপোরেট গোষ্ঠীগুলোর হাতে এনডিটিভির (NDTV) মতো গণমাধ্যমের নিয়ন্ত্রণ চলে যাওয়ায় নিরপেক্ষ সাংবাদিকতা হুমকির মুখে পড়েছে।  রিপোর্টে জানা যায়, প্রতি বছর গড়ে ২-৩ জন সাংবাদিক প্রাণ হারাচ্ছেন এবং যারা সরকারের সমালোচনা করছেন।

প্রসঙ্গত, এই সংকটটি কেবল ভারতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।  ২০২৬ সালের রিপোর্ট বলছে, সবথেকে স্বাধীন দেশের তালিকায় রয়েছে নরওয়ে, ডেনমার্ক ও সুইডেন।  ভারতের প্রতিবেশী দেশগুলোর অবস্থাও খুব একটা সুবিধাজনক নয়; তালিকায় পাকিস্তান রয়েছে ১৫২ নম্বরে এবং বাংলাদেশ ১৬৫ নম্বরে।  অন্যদিকে, তালিকার একেবারে শেষে অর্থাৎ ১৮০তম স্থানে রয়েছে ইরিত্রিয়া, যার ঠিক আগেই রয়েছে উত্তর কোরিয়া ও আফগানিস্তান।

 

Share This Article
বিগত প্রায় পাঁচ বছর ধরে ডিজিটাল মিডিয়ার কাজের সঙ্গে যুক্ত। দেশ ও বিদেশের সমস্ত রকম খবরাখবর রাখতে ও তা প্রতিবেদন আকারে লিখতে অভ্যস্থ।