ভারতীয় অর্থনীতি নিয়ে গত কয়েক বছরে যেভাবে প্রচার তৈরি করা হয়েছে, বাস্তব অর্থনৈতিক সূচকের সঙ্গে তার ব্যবধান এখন ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। একসময় ভারতীয় মিডিয়ায় “বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি হতে চলেছে ভারত”, “Japan কে ছাড়িয়ে গেল”, “UK-কে পিছনে ফেলল ভারত” — এই ধরনের শিরোনামে ব্যাপক উচ্ছ্বাস দেখা গিয়েছিল। কিন্তু আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF)-এর সাম্প্রতিক সংশোধিত তথ্য অনুযায়ী ভারত আবার ষষ্ঠ বৃহত্তম অর্থনীতির অবস্থানে নেমে যাওয়ার পর সেই একই মিডিয়া প্রায় নীরব। প্রশ্ন উঠছে — অর্থনৈতিক বাস্তবতা কি শুধুই রাজনৈতিক প্রচারের উপকরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে?
বিশ্বের একাধিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং মুদ্রাবাজার বিশ্লেষক গত কয়েক বছরে বারবার সতর্ক করেছেন যে ভারতীয় রুপির উপর চাপ দীর্ঘমেয়াদে আরও বাড়তে পারে। Morgan Stanley, Goldman Sachs–এর বিভিন্ন বিশ্লেষণ, এবং এশিয়ান মুদ্রাবাজার নিয়ে কাজ করা বহু অর্থনীতিবিদ আগেই বলেছিলেন — যদি আমদানি নির্ভরতা, তেলের আন্তর্জাতিক দাম এবং মার্কিন ডলারের বৈশ্বিক আধিপত্য একইভাবে বাড়তে থাকে, তাহলে ভারতীয় রুপি ধীরে ধীরে আরও দুর্বল হবে। সেই আশঙ্কা এখন বাস্তবের কাছাকাছি চলে এসেছে।
কয়েক বছর আগেও যেখানে ১ ডলার প্রায় ৬০ টাকার আশেপাশে ছিল, সেখানে এখন তা ৯৭-এর ঘর স্পর্শ করছে। অর্থাৎ “১ ডলার = ১০০ রুপি” এখন আর শুধুই সোশ্যাল মিডিয়ার বাড়াবাড়ি নয়; বরং আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক মহলের অনেকের কাছেই এটি বাস্তবসম্মত সম্ভাবনা হিসেবে দেখা হচ্ছে। সরকার প্রতিবারই আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিকে দায়ী করলেও প্রশ্ন উঠছে — শুধু বাইরের কারণেই কি একটা দেশের মুদ্রা এত দ্রুত দুর্বল হয়? দেশের অর্থনৈতিক ভিত যদি সত্যিই এত শক্তিশালী হতো, তাহলে কি পরিস্থিতি এতটা উদ্বেগজনক পর্যায়ে যেত?
ভারতের সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি হলো অতিরিক্ত আমদানি নির্ভরতা। দেশ চালাতে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল আমদানি করতে হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লেই ভারতের আরও বেশি ডলার খরচ হয়। তার উপর ইলেকট্রনিক্স, শিল্পের যন্ত্রপাতি, সেমিকন্ডাক্টর, প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম, নানা কাঁচামাল — প্রায় সব ক্ষেত্রেই ডলারের উপর নির্ভরতা বাড়ছে। কিন্তু সেই অনুপাতে রপ্তানি কি বাড়ছে? উৎপাদন কি যথেষ্ট শক্তিশালী হচ্ছে? কর্মসংস্থান কি তৈরি হচ্ছে? এই প্রশ্নগুলোর সন্তোষজনক উত্তর এখনও নেই।
সমালোচকদের মতে, সরকারের অর্থনৈতিক অগ্রাধিকারের মধ্যেও বড় সমস্যা রয়েছে। বাস্তব উৎপাদন, ক্ষুদ্র শিল্প, কৃষি বা দীর্ঘমেয়াদি কর্মসংস্থানের বদলে দেশে ক্রমশ প্রচারমুখী অর্থনীতি গড়ে উঠেছে। বড় বড় উদ্বোধন, বিশাল অবকাঠামো প্রকল্প, ক্যামেরাবান্ধব প্রচার — এগুলো রাজনৈতিকভাবে লাভজনক হতে পারে, কিন্তু এগুলো সবসময় মুদ্রাকে শক্তিশালী করে না। একটা মুদ্রা শক্তিশালী হয় তখনই, যখন দেশের উৎপাদন বাড়ে, শিল্প শক্তিশালী হয়, মানুষ কাজ পায়, বিদেশি বাজারে দেশের পণ্যের চাহিদা বাড়ে এবং বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের স্থায়ী উৎস তৈরি হয়।
এর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিও ভারতের উপর চাপ বাড়াচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সুদের হার বাড়লে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরা ভারতসহ উন্নয়নশীল দেশ থেকে টাকা তুলে আমেরিকান বাজারে নিয়ে যায়। ফলে ভারতের বাজারে ডলারের ঘাটতি তৈরি হয় এবং রুপির উপর আরও চাপ পড়ে। ডলারের বৈশ্বিক শক্তি যত বাড়ে, ভারতীয় মুদ্রার দুর্বলতা তত স্পষ্ট হয়।
জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ বেড়েছে। বিরোধী মহল ও বহু বিশ্লেষকের দাবি, আমেরিকার ভূরাজনৈতিক চাপ এবং পশ্চিমা কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টায় ভারত রাশিয়া ও ইরান থেকে সস্তা জ্বালানি আমদানির সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারেনি। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দামের ধাক্কা দেশের অর্থনীতির উপর আরও বেশি প্রভাব ফেলছে। তেলের দাম বাড়লে পরিবহন খরচ বাড়ে, শিল্প উৎপাদনের ব্যয় বাড়ে, বাজারে পণ্যের দাম বাড়ে — যার শেষ ধাক্কা গিয়ে পড়ে সাধারণ মানুষের উপর।
ভারতের ট্রেড ডেফিসিট বা বাণিজ্য ঘাটতিও উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। রপ্তানির তুলনায় আমদানি দ্রুত বাড়ায় বৈদেশিক মুদ্রার উপর চাপ তৈরি হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে রুপির মূল্য আরও দুর্বল হওয়া স্বাভাবিক। Reserve Bank of India মাঝে মাঝে বাজারে হস্তক্ষেপ করে রুপিকে সাময়িকভাবে ধরে রাখার চেষ্টা করে, কিন্তু যদি অর্থনীতির মৌলিক কাঠামো দুর্বল থাকে, তাহলে শুধু বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ খরচ করে দীর্ঘমেয়াদে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন।
সবচেয়ে বেশি ধাক্কা খায় সাধারণ মানুষ। ডলারের দাম বাড়া মানে শুধু বিদেশ ভ্রমণের খরচ বাড়া নয়। এর মানে পেট্রোল-ডিজেলের দাম বাড়বে, বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বাড়বে, আমদানিকৃত ওষুধ, মোবাইল, প্রযুক্তিপণ্য — সবকিছুর দাম বাড়বে। অর্থাৎ মানুষের হাতে থাকা টাকার প্রকৃত মূল্য কমে যাবে। মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় ক্রমাগত বেড়ে যাবে।
অর্থনৈতিক সংকটের পাশাপাশি ভারতের গণতান্ত্রিক পরিবেশ ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়েও আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ বাড়ছে। Reporters Without Borders–এর Press Freedom Index–এ ভারত বহু বছর ধরেই নিচের দিকে অবস্থান করছে। সাংবাদিকদের উপর রাজনৈতিক চাপ, মিডিয়া মালিকানার কেন্দ্রীকরণ, ভিন্নমত দমন এবং ডিজিটাল নজরদারির অভিযোগ আন্তর্জাতিক রিপোর্টে উঠে এসেছে। একইভাবে Economist Intelligence Unit–এর Democracy Index–এ ভারতকে “Flawed Democracy” হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বিরোধীদের দাবি, একদিকে “Mother of Democracy” প্রচার, অন্যদিকে বিরোধী কণ্ঠ, সাংবাদিক, ছাত্র আন্দোলন ও নাগরিক সমাজের উপর চাপ — এই দ্বৈত বাস্তবতা ভারতের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
সব মিলিয়ে ভারতের অর্থনীতি এখনও বিশ্বের দ্রুততম বর্ধনশীল বড় অর্থনীতিগুলোর একটি হলেও বাস্তব পরিস্থিতি অনেক বেশি জটিল। GDP বৃদ্ধির সরকারি প্রচারের আড়ালে জ্বালানি নির্ভরতা, রুপির দুর্বলতা, ট্রেড ডেফিসিট, কর্মসংস্থান সংকট, মূল্যস্ফীতি, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে বড় প্রশ্ন রয়ে গেছে। আর যদি বাস্তব অর্থনৈতিক সমস্যাগুলোর সমাধানের বদলে শুধু প্রচার ও ইমেজ নির্মাণে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়, তাহলে “১ ডলার = ১০০ রুপি” হয়তো কল্পনার চেয়েও দ্রুত বাস্তবে পরিণত হতে পারে।

