কেউ জানত না, ঠিক কোন দিন শেষ হবে ব্রিটিশ শাসন।
এমনকি ১৯৪৭ সালের ৩ জুন, যখন ভারত ভাগ এবং ব্রিটিশদের ক্ষমতা হস্তান্তরের পরিকল্পনা ঘোষণা করা হয়েছিল, তখনও স্বাধীন ভারতের জন্মের নির্দিষ্ট দিনটি নিয়ে ছিল অনিশ্চয়তা। সেদিন তৎকালীন ভাইসরয় লর্ড লুই মাউন্টব্যাটেন ঘোষণা করেছিলেন ৩ জুন প্ল্যান যা ইতিহাসে মাউন্টব্যাটেন প্ল্যান নামেও পরিচিত। এই পরিকল্পনার মধ্য দিয়েই ভারত ভাগের পথ আরও স্পষ্ট হয়ে যায়। কিন্তু স্বাধীনতার দিন? সেই তারিখ তখনও ঘোষণা হয়নি।
৩ জুনের ঘোষণার ঠিক আগের রাতটিও ছিল ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ রাত। ‘ফ্রিডম অ্যাট মিডনাইট’ এর লেখক ডমিনিক ল্যাপিয়ের ও ল্যারি কলিন্সের বর্ণনায়, ভাইসরয় ভবনে কংগ্রেস এবং মুসলিম লীগের নেতাদের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক হয়েছিল। চারপাশে ছিল চাপা উত্তেজনা, অন্ধকার আর নীরবতা। অথচ সেই নীরবতার মধ্যেই ঠিক হচ্ছিল এমন এক সিদ্ধান্ত, যার প্রভাব বদলে দিতে চলেছিল গোটা উপমহাদেশের ইতিহাস।
কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ভারত স্বাধীন হবে এটা তখন স্পষ্ট হয়ে গেলো। কিন্তু কোন দিন হবে? এই প্রশ্নের উত্তর শেষ পর্যন্ত এল লর্ড মাউন্টব্যাটেনের কাছ থেকেই। তাঁকে যখন ভারতের স্বাধীনতার জন্য একটি নির্দিষ্ট তারিখ বেছে নিতে বলা হয়, তখন তাঁর সামনে একাধিক সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি বেছে নিলেন ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট কে।
কিন্তু ১৫ আগস্ট কেন?
এই প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে রয়েছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাসে। লর্ড মাউন্টব্যাটেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় মিত্রবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ কমান্ডার ছিলেন। ১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট জাপানের সম্রাট হিরোহিতোর বেতার ভাষণের মাধ্যমে জাপানের আত্মসমর্পণের ঘোষণা সামনে আসে। ঠিক দুই বছর পরের দিনটিকেই ভারতের স্বাধীনতার জন্য বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন মাউন্টব্যাটেন। তাঁর নিজের বক্তব্য অনুযায়ী, তাঁকে যখন স্বাধীনতার জন্য একটি তারিখ বেছে নিতে বলা হয়েছিল, তখন ১৫ আগস্টের কথাই তাঁর মাথায় আসে কারণ দিনটি ছিল জাপানের আত্মসমর্পণের দ্বিতীয় বার্ষিকী। অর্থাৎ, ১৫ আগস্ট বেছে নেওয়ার পিছনে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের কোনও বিশেষ ঐতিহাসিক তারিখের বদলে মাউন্টব্যাটেনের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের স্মৃতিরও একটি ভূমিকা ছিল।
তবে প্রশ্ন থেকে যায় ৩ জুনের ঘোষণার পর কী হয়েছিল?
১৯৪৭ সালের ৩ জুন লর্ড মাউন্টব্যাটেন তৎকালীন ভারতীয় নেতাদের সামনে ভারত বিভক্তি ও ক্ষমতা হস্তান্তরের পরিকল্পনা ঘোষণা করার পর, সেই পরিকল্পনাকে আইনি রূপ দিতে তৎপর হয়ে ওঠে ব্রিটিশ সরকার। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৪৭ সালের ৪ জুলাই ব্রিটিশ পার্লামেন্টে ‘ইন্ডিয়ান ইন্ডিপেন্ডেন্স বিল’ বা ভারতীয় স্বাধীনতা বিল পেশ করা হয়। অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে বিলটি নিয়ে আলোচনা ও প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয় এবং মাত্র দুই সপ্তাহের কম সময়ে অর্থাৎ ১৮ জুলাই ১৯৪৭ সালে এটি রাজকীয় অনুমোদন লাভ করে আইনে পরিণত হয়। এই ঐতিহাসিক আইনের মাধ্যমেই ব্রিটিশ ভারতের অবসান নিশ্চিত হয় এবং ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট ভারত ও পাকিস্তান এই দুটি নতুন স্বাধীন ডোমিনিয়নের জন্ম ও ক্ষমতা হস্তান্তরের দিন হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে চূড়ান্ত করা হয়।
তাহলে পাকিস্তানের স্বাধীনতা ১৪ আগস্ট কেন?
অনেকের মনে এই প্রশ্ন জাগে, কাগজে-কলমে যখন স্বাধীনতার তারিখ ১৫ আগস্ট ছিল, তবে পাকিস্তান কেন ১৪ আগস্ট স্বাধীনতা দিবস পালন করে? এর উত্তর লুকিয়ে আছে ইতিহাসের এক ব্যতিক্রমী ঘটনার মাঝে। ব্রিটিশ পার্লামেন্টের ‘ইন্ডিয়ান ইন্ডিপেন্ডেন্স অ্যাক্ট’ অনুযায়ী ভারত ও পাকিস্তান উভয় দেশের জন্যই স্বাধীনতার দিন হিসেবে ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট নির্ধারিত ছিল। এমনকি পাকিস্তানের প্রথম পার্লামেন্ট বা ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির নথিতেও ১৫ আগস্ট মুহাম্মদ আলি জিন্নাহর গভর্নর-জেনারেল হিসেবে শপথ নেওয়ার কথা উল্লেখ আছে। কিন্তু লর্ড মাউন্টব্যাটেনকে একই সঙ্গে দিল্লি ও করাচি উভয় জায়গার ক্ষমতা হস্তান্তর অনুষ্ঠানেই থাকতে হয়েছিল। ব্যস্ত সূচি সামলাতে তিনি ১৪ আগস্ট করাচিতে উপস্থিত হয়ে পাকিস্তানের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর পর্বটি সেরে নেন। পরবর্তীতে পাকিস্তানের সরকারি দলিলেও এই ১৪ আগস্টকেই ক্ষমতা হস্তান্তরের তারিখ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয় এবং সময়ের পরিক্রমায় দিনটি তাদের স্থায়ী স্বাধীনতা দিবস হয়ে ওঠে।
প্রসঙ্গত, ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট রাত পেরিয়ে যখন ১৫ আগস্টের সকাল এল, তখন ভারত এক সম্পূর্ণ নতুন অধ্যায়ে পা রাখল। দিল্লির সংবিধান সভায় দাঁড়িয়ে স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু তাঁর বিখ্যাত ‘Tryst with Destiny’ ভাষণটি দেন। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্টের দিনেই ব্রিটিশ শাসনের চিরতরে অবসান ঘটে ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে এবং ক্ষমতা সাধারণ মানুষের প্রতিনিধিদের হাতে চলে আসে। সেদিনই নেহরু দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন এবং লালকেল্লায় জাতীয় পতাকা ওড়ান।
তবে স্বাধীনতার এই প্রথম সকালটি কেবল আনন্দের বা উৎসবের জোয়ারে ভেসে যায়নি। দেশভাগের বেদনা, ভয়ংকর দাঙ্গা আর ভিটেমাটি হারানো মানুষের অসহায় কান্নার মধ্য দিয়েই জন্ম নিয়েছিল আমাদের এই স্বাধীন দেশ। এমনকি জাতির পিতা মহাত্মা গান্ধীও দিল্লির কোন্ অনুষ্ঠানে ছিলেন না; সেই সময় তিনি বাংলার মাটিতে দাঁড়িয়ে মানুষের মধ্যে শান্তি ও সম্প্রীতি ফেরানোর কাজে দিনরাত এক করে কাজ করছিলেন।

