দীর্ঘ টালবাহানা এবং নির্বাচন কমিশনের চরম বিলম্বের অবসান ঘটিয়ে অবশেষে রাজ্যের প্রথম সাপ্লিমেন্টারি বা অতিরিক্ত ভোটার তালিকা প্রকাশিত হয়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যে চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করা হয়েছিল, সেখানে প্রায় ৬০ লক্ষ আবেদনকারীর নাম আন্ডার অ্যাডজুডিকেশন বা বিবেচনাধীন অবস্থায় রাখা হয়েছিল। সাম্প্রতিক এই অতিরিক্ত তালিকায় সেই বিপুল সংখ্যক ভোটারের মধ্যে প্রায় ২৮ লক্ষ মানুষের আবেদনের নিষ্পত্তি ঘটিয়ে, প্রথম সাপ্লিমেন্টারি ভোটার তালিকা প্রকাশ করেছে কমিশন।
এই ২৮ লক্ষ ভোটারের মধ্যে ঠিক কতজনের নাম চূড়ান্তভাবে অন্তর্ভুক্ত হলো এবং কতজন শেষ পর্যন্ত বাদ পড়লেন, তা নিয়ে কমিশন এখনও কোনো স্পষ্ট পরিসংখ্যান দেয়নি। তথ্যের এই গোপনীয়তা এবং স্বচ্ছতার অভাব সাধারণ মানুষের মনে গভীর উৎকণ্ঠা তৈরি করেছে। একদিকে যেমন বাকি এখনও ৩২ লক্ষ ভোটারের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত, অন্যদিকে যাদের নাম এই ২৮ লক্ষের তালিকায় রয়েছে, তাদের সঠিক উত্তর মেলেনি।
প্রকাশিত এই সাপ্লিমেন্টারি তালিকায় বিভিন্ন বুথ বা পার্ট (Part) অনুযায়ী তথ্য সামনে এসেছে, এছাড়াও এদিন নাম চেক করলে মূলত তিনটি বিষয় দেখতে পাচ্ছেন ভোটাররা।
১. অনেক বুথে দেখা যাচ্ছে, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ মেনে বিশেষ বিচার প্রক্রিয়ার (Adjudication) পর নতুন ভোটারদের নামের তালিকা প্রকাশ করেছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যাদের নাম ‘বিবেচনাধীন‘ ছিল, তাদের নথিপত্র যাচাইয়ের পর এই অতিরিক্ত বা সাপ্লিমেন্টারি তালিকায় জায়গা পেয়েছে।
২. সাপ্লিমেন্টারি ভোটার তালিকা প্রকাশের পর অনেক বুথেই এ বিষয়টি দেখা যাচ্ছে, ‘বিচারবিভাগীয় কর্মকর্তাদের রায়ের পর মুছে ফেলা হয়েছে’ (Deleted as per Order of Adjudicating Officer) নামের লিস্ট। এর ফলে সংশ্লিষ্ট আবেদনকারীদের নাম সাপ্লিমেন্টারি তালিকা থেকে স্থায়ীভাবে মুছে ফেলা হয়েছে, যা তাঁদের আসন্ন নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রয়োগের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ মুহূর্তে সবথেকে উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে, বিচারবিভাগীয় আধিকারিকরা ঠিক কী কারণে বা কোন যুক্তিতে এই বিপুল পরিমাণ নাম বর্জন বা খারিজ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সেই বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে এখনও কোনো সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা মেলেনি।
৩. সাপ্লিমেন্টারি ভোটার তালিকা চেক করতে গিয়ে রাজ্যের বহু এলাকার মানুষ নিচের বিষয়টি দেখতে পারছেন। মূলত তারা লিস্ট ডাউনলোড করতে দেখতে পারছেন “No adjudication pertaining to this part till 5 PM on 23.3.2026″। এর দাঁড়ায় কমিশন বুঝাতে চেয়েছে ওই নির্দিষ্ট বুথ এলাকায় ২৩শে মার্চ বিকেল ৫টা পর্যন্ত কোনো নতুন নাম বিচারাধীন বা আন্ডার অ্যাডজুডিকেশন ভোটারদের নিষ্পত্তি শেষ করে তালিকায় তোলার অনুমতি পায়নি। এর ফলে হাজার হাজার আবেদনকারী, যারা নতুন নাম তোলা বা সংশোধনের অপেক্ষায় ছিলেন, তারা এখনও চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন। তাঁদের নাম শেষ পর্যন্ত তালিকায় উঠবে কি না, নাকি আরও সময় লাগবে তা নিয়ে কমিশন কোনও পরিষ্কার ধারণা না দেওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে বাড়ছে চিন্তার ভাঁজ।
যদিও এদিন যাঁদের নাম চূড়ান্ত ভোটার লিস্টে অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে তাঁদের যেমন নামের তালিকা প্রকাশ পেয়েছে, তেমনি যাঁদের নাম বাদ যাচ্ছে তাঁদেরও আলাদা তালিকা প্রকাশ করেছে। কমিশন সূত্রে খবর, আগামী শুক্রবার প্রকাশ করা হবে দ্বিতীয় সাপ্লিমেন্টারি তালিকা। তারপর প্রতি শুক্রবার ধাপে ধাপে পরবর্তী সাপ্লিমেন্টারি লিস্ট প্রকাশ করা হবে। যদি কারও নাম প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় এভাবে প্রকাশিত তালিকায় না থাকে বা বাদ পড়ে, তবে তিনি ট্রাইব্যুনালে আপিল করতে পারবেন।
কমিশন জানিয়েছে, প্রকাশিত এই সাপ্লিমেন্টারি তালিকায় যদি কারও নাম না থাকে বা তথ্যে কোনো ভুল থাকে, তবে তালিকা প্রকাশের ১৫ দিনের মধ্যে আবেদন জানানো যাবে। এর জন্য প্রতিটি জেলায় বিশেষ অ্যাপিলেট ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়েছে। ভোটাররা অনলাইন বা অফলাইন—দুই মাধ্যমেই তাদের দাবি বা আপত্তি পেশ করতে পারবেন। এই জন্য রাজ্যের ২৩টি জেলায় মোট ১৯টি ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়েছে, যেখানে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিরা দায়িত্বে রয়েছেন। আবেদন করা যাবে এভাবে—
১. অনলাইনে কমিশনের নির্দিষ্ট পোর্টালে (ECI NET) গিয়ে।
২. অথবা আপনার এলাকার মহকুমা শাসক (SDO) বা জেলাশাসকের (DM) দফতরে গিয়ে সশরীরে আবেদনপত্র জমা দিতে পারবেন। এবং সেখান থেকে ডিজিটাল পদ্ধতিতে তা ট্রাইব্যুনাল তথা প্রাক্তন বিচারবিভাগীয় আধিকারিকদের কাছে পৌঁছে দেবেন প্রশাসনের কর্তারা।
এ দায়িত্বে নিয়োজিত আধিকারিকরা: কোচবিহার জেলার ভোটারদের জন্য নিয়োগ করেছে প্রাক্তন বিচারপতি প্রনব কুমার দেব। দার্জিলিং, কালিম্পং, জলপাইগুড়ি ও আলিপুরদুয়ারের দায়িত্ব সামলাবেন প্রাক্তন বিচারপতি দীপক সাহা রায়। উত্তর দিনাজপুরের জন্য প্রাক্তন বিচারপতি দেবী প্রসাদ দে এবং দক্ষিণ দিনাজপুরের জন্য প্রাক্তন বিচারপতি তৌফিক উদ্দিনকে নিয়োগ করা হয়েছে। মালদহ জেলার দায়িত্বে থাকছেন প্রাক্তন বিচারপতি সিদ্ধার্থ রায় চৌধুরী এবং মুর্শিদাবাদ জেলার (এসি ভিত্তিক) জন্য প্রাক্তন বিচারপতি ইন্দ্রজিৎ চট্টোপাধ্যায় ও বিশ্বজিৎ বসুকে বেছে নেওয়া হয়েছে।
এছাড়াও কলকাতা ও উত্তর ২৪ পরগনার মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এলাকার দায়িত্ব সামলাবেন কলকাতা হাইকোর্টের প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি টি এস শিবগননম এবং প্রাক্তন বিচারপতি প্রদীপ্ত রায়। দক্ষিণ ২৪ পরগনার জন্য প্রাক্তন বিচারপতি রঞ্জিত কুমার বাগ, হাওড়া জেলার জন্য প্রাক্তন বিচারপতি অশোক কুমার দাশাধিকারী এবং হুগলির জন্য প্রাক্তন বিচারপতি সমাপ্তি চট্টোপাধ্যায়কে নিয়োগ করা হয়েছে। এছাড়াও নদিয়ার দায়িত্বে বিচারপতি রঘুনাথ রায়, পূর্ব বর্ধমানের জন্য বিচারপতি প্রভাত কুমার দে, পশ্চিম বর্ধমানের জন্য বিচারপতি মীর দারা শেকো, এবং বীরভূমের জন্য বিচারপতি মনোজিত মণ্ডল থাকছেন। পুরুলিয়া ও বাঁকুড়ার যৌথ দায়িত্বে থাকছেন প্রাক্তন বিচারপতি মহম্মদ মমতাজ খান। পূর্ব মেদিনীপুরের জন্য বিচারপতি তাপন সেন এবং পশ্চিম মেদিনীপুর ও ঝাড়গ্রামের দায়িত্ব সামলাবেন প্রাক্তন বিচারপতি অনিন্দিতা রায় সরস্বতী।
প্রসঙ্গত, আগামী ২৭ মার্চ, শুক্রবার কমিশন আরও একটি সাপ্লিমেন্টারি তালিকা প্রকাশ করতে পারে বলে খবর।

