রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচনের দামামা বেজে গিয়েছে। আগামী মাসেই দুই দফায় ভোটগ্রহণ। গ্রাম থেকে শহর সর্বত্রই এখন রাজনৈতিক দলগুলোর ব্যস্ত প্রচার। কিন্তু এই উৎসবের আবহেও গভীর দুশ্চিন্তা গ্রাস করেছে রাজ্যের লক্ষ লক্ষ মানুষকে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় যাঁদের নাম বিবেচনাধীন বা আন্ডার অ্যাডজুডিকেশন রাখা হয়েছিল, তাঁদের বড় একটি অংশ এখনও জানেন না যে তাঁরা আদৌ ভোট দিতে পারবেন কি না। নির্বাচন কমিশন ইতিমধ্যে দু’টি সাপ্লিমেন্টারি বা অতিরিক্ত তালিকা প্রকাশ করলেও, নাম নেই সেই অতিরিক্ত তালিকায় কয়েক লক্ষ মানুষের।
রাজ্যে আগামী ২৩ ও ২৯ এপ্রিল দুই দফায় ভোটগ্রহণ হবে। রাজনৈতিক দলগুলো যখন উন্নয়নের খতিয়ান নিয়ে সাধারণ মানুষের দুয়ারে ভোট চাইতে ব্যস্ত, তখন ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে ‘এসআইআর‘ এর গোলকধাঁধায় দিশেহারা সাধারণ মানুষ। তাঁরা কি করবে সে নিয়েও চিন্তার অন্ত নেই। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, রাজ্যের প্রায় ৬০ লক্ষ ৬ হাজার ৬৭৫ জন ভোটারের নাম বিবেচনাধীন (Under Adjudication) তালিকায় রাখা হয়েছিল। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে ৭০৫ জন বিচার বিভাগীয় অফিসার দিনরাত এক করে এই ভোটারদের নথিপত্র যাছাই বাছাই করছেন। ইতিমধ্যে ২৩ ও ২৭ মার্চ দু’টি অতিরিক্ত তালিকা প্রকাশিত হয়েছে, যেখানে প্রায় ২২ লক্ষ মানুষের নাম নতুন করে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। অর্থাৎ, এই ২২ লক্ষ মানুষ তাঁদের ভোটাধিকার ফিরে পেয়েছেন এবং আগামী নির্বাচনে ভোট দিতে পারবেন। তবে মুদ্রার উল্টো পিঠে এক উদ্বেগজনক চিত্র ফুটে উঠেছে। কমিশন সূত্রে খবর, শনিবার ২৮ মার্চ পর্যন্ত প্রায় ৩৭ লক্ষ আন্ডার অ্যাডজুডিকেশন আবেদনের নিষ্পত্তি হয়েছে। এই পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যাচ্ছে, নিষ্পত্তি হওয়া ৩৭ লক্ষ আবেদনের মধ্যে যদি মাত্র ২২ লক্ষ মানুষের নাম তালিকায় ফেরে, তবে বাকি প্রায় ১৫ লক্ষ মানুষের নাম পাকাপাকিভাবে বাদ (Delete) পড়েছে। নথিপত্র যাচাইয়ের পর এই বাদ পড়ার হার প্রায় ৩৫ শতাংশ থেকে ৪০ শতাংশের কাছাকাছি।
এখনও প্রায় ২৩ থেকে ২৪ লক্ষ ভোটারের নিষ্পত্তির কাজ বাকি রয়েছে। তাঁদের নথিপত্র এখনও বিচার বিভাগীয় অফিসারদের টেবিলে বিবেচনাধীন। আগামী ৩ এপ্রিল তৃতীয় সাপ্লিমেন্টারি তালিকা প্রকাশের কথা রয়েছে, যেখানে এই বাকি ভোটারদের নাম আসবে বলে মনে করা হচ্ছে। তবে দুশ্চিন্তার বিষয় হলো, যাঁদের নাম ইতিমধ্যেই বাদ পড়েছে বা আগামী তালিকায় বাদ যাবে, তাঁদের কেন বাদ দেওয়া হলো সে বিষয়ে কমিশন এখনও কোনও স্বচ্ছ কারণ বা সুনির্দিষ্ট নোটিশ দেয়নি। ফলে লক্ষ লক্ষ মানুষ এখন নিজেদের ভোটাধিকার রক্ষা করতে আইনি লড়াইয়ের পথ খুঁজছেন, তবে গ্রামাঞ্চলের সাধারণ মানুষের এ লড়াই কতটা কঠিন হয়ে দাঁড়াবে তা আগে থেকেই বোঝার উপায় নেই।
উল্লেখযোগ্যভাবে, প্রথম ও দ্বিতীয় সাপ্লিমেন্টারি তালিকায় নাম না থাকা ভোটারদের আশ্বস্ত করতে কমিশনের তরফে জানানো হয়েছে যে, আগামী ১৫ দিনের মধ্যে ‘অ্যাপেলেট ট্রাইব্যুনাল’ এ আপিল করতে পারবেন ভুক্তভোগীরা। তবে এই আবেদন প্রক্রিয়ার বিষয়ে এখনও পর্যন্ত কোনো স্পষ্ট নির্দেশিকা বা বিশদ তথ্য দেয়নি নির্বাচন কমিশন। কমিশন কেবল এতটুকুই জানিয়েছে যে, অনলাইন ও অফলাইন উভয় পদ্ধতিতেই ট্রাইব্যুনালে আবেদন করা যাবে। যদিও এই ট্রাইব্যুনালের কাজের জন্য সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে কমিশন ২৩ জেলার মোট ১৯ জন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি নিয়োগ করে রেখেছে। গত ২০ মার্চ এই সংক্রান্ত একটি বিজ্ঞপ্তি জারি করা হলেও, ট্রাইব্যুনালে আবেদনের সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি। বর্তমানে প্রকাশিত নতুন তালিকার ওপর শুধুমাত্র এটুকুই লেখা থাকছে যে, সংক্ষুব্ধ (সাপ্লিমেন্টারি বাদ) ভোটাররা চাইলে ১৫ দিনের মধ্যে আবেদন করতে পারবেন।

