রাজ্যের মহিলাদের সরকারি ভাতা পাওয়া নিয়ে বড় খবর সামনে এল। বুধবার নবান্নে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী পরিষ্কার জানিয়ে দিলেন, ভোটার তালিকা থেকে যাঁদের নাম স্থায়ীভাবে কাটা গিয়েছে, এবং যারা ট্রাইব্যুনালে আবেদন করেনি এমন প্রায় ৩০ লক্ষ মানুষ আর ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’-এর টাকা পাবেন না। সরকারি টাকা যাতে ভুল হাতে না যায় এবং জালিয়াতি বন্ধ হয়, তার জন্যই এই কড়া সিদ্ধান্ত। তবে সাধারণ ও গরিব মহিলাদের চিন্তার কিছু নেই। লক্ষ্মীর ভান্ডারের বদলে রাজ্য সরকার এবার নিয়ে আসছে সম্পূর্ণ নতুন একটি প্রকল্প, যার নাম ‘অন্নপূর্ণা যোজনা’।
সরকারি প্রকল্প থেকে ভুয়ো ও জালিয়াতি করা আবেদনকারীদের নাম দ্রুত বাদ দিতে চলেছে রাজ্য সরকার। এর পরিবর্তে প্রকৃত ভারতীয় নাগরিক এবং আর্থিকভাবে পিছিয়ে পড়া নারীদের জন্য সম্পূর্ণ নতুন রূপরেখায় নিয়ে আসা হচ্ছে ‘অন্নপূর্ণা যোজনা’। এই নতুন প্রকল্পটিকে সফলভাবে বাস্তবায়িত করতে রাজ্য সরকারের মহিলা ও শিশুকল্যাণ মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পালের তত্ত্বাবধানে তাঁর দফতর থেকে একটি বিশেষ ফর্ম চালু করা হচ্ছে। পুরো প্রক্রিয়ার কড়া নজরদারি ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব সামলাবেন খোদ মুখ্যসচিব এবং অর্থসচিবের নেতৃত্বাধীন শীর্ষ আধিকারিকেরা। যারা মূলত ভোটার তালিকা তৈরি, স্ক্রিনিং ও যাচাইয়ের কাজের সঙ্গে যুক্ত, সেই অভিজ্ঞ কর্মীরাই এই প্রকল্পের তথ্য সংগ্রহের মূল দায়িত্বে থাকবেন।এই নতুন ফর্মে আবেদনকারীদের কাছ থেকে অত্যন্ত বিস্তারিত তথ্য চাওয়া হয়েছে, যার পেছনে সরকারের একটি সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য রয়েছে।
মুখ্যমন্ত্রী জানান, কেবল এই প্রকল্পের সুবিধা দেওয়াই সরকারের উদ্দেশ্য নয়, বরং এর মাধ্যমে প্রতিটি পরিবারের একটি নিখুঁত ও সামগ্রিক তথ্যভাণ্ডার (Family Database) তৈরি করা হবে। এই সংগৃহীত ডেটা বা তথ্য ভবিষ্যতে সরকারের অন্যান্য জনকল্যাণমূলক প্রকল্পেও সরাসরি কাজে লাগানো যাবে।
সরকারের তরফ থেকে স্পষ্ট জানানো হয়েছে যে হুট করে কোনো প্রকল্প বন্ধ হচ্ছে না। অন্নপূর্ণা যোজনার ফর্ম পূরণ এবং নথিভুক্তকরণ প্রক্রিয়া যতদিন না পুরোপুরি সম্পন্ন হচ্ছে, ততদিন পর্যন্ত ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’-এর টাকা পাওয়া চালু থাকবে। তবে এর জন্য একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা বা ডেডলাইন বেঁধে দেওয়া হয়েছে। আগামী ২ জুনের মধ্যে যাঁরা নতুন প্রকল্পের জন্য সফলভাবে নাম নথিভুক্ত করতে পারবেন, তাঁরা ৩ জুন থেকেই অন্নপূর্ণা যোজনার টাকা পাওয়া শুরু করবেন এবং নতুন তালিকায় নাম ওঠার সাথে সাথেই তাঁদের পুরনো ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’ প্রকল্পটির সুবিধা বন্ধ হয়ে যাবে।
আবেদন প্রক্রিয়া সহজ করতে প্রশাসন সব রকমের প্রস্তুতি নিয়েছে। এদিন মুখ্যমন্ত্রী জানান, যাঁরা অনলাইন বা অফলাইনে নিজে থেকে ফর্ম পূরণ করতে পারবেন না বা কোনো প্রযুক্তিগত সমস্যায় পড়বেন, সরকারি আধিকারিকেরা সরাসরি তাঁদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে ফর্ম পূরণে সব রকম সহযোগিতা করবেন। শুধু তাই নয়, এলাকার নবনির্বাচিত বিধায়কদেরও এই জনকল্যাণমূলক কাজে সরাসরি মাঠে নামার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং সাধারণ মানুষের ফর্ম পূরণে সাহায্য করাই হবে এই মুহূর্তে তাঁদের অন্যতম প্রধান ও বড় কাজ।
এছাড়াও আগামী ১৫, ১৬ এবং ১৭ তারিখ রাজ্যজুড়ে বিশেষ ‘জনকল্যাণ শিবির’ বা ক্যাম্পের আয়োজন করা হচ্ছে, যেখান থেকেও সাধারণ মানুষ ফর্ম পূরণের সব রকমের সুবিধা পাবেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই অন্নপূর্ণা যোজনার এই বিশেষ ফর্মটি অফিশিয়াল ওয়েবসাইটে আপলোড করে দেবে বলে জানিয়েছে।
এই নতুন প্রকল্প ঘোষণা হতেই সাধারণ মানুষের মনে সবচেয়ে বড় যে প্রশ্নটি ঘুরপাক খাচ্ছে, তা হলো যাঁরা আগে থেকেই লক্ষ্মীর ভান্ডার পাচ্ছেন, তাঁদেরও কি নতুন করে ফর্ম পূরণ করতে হবে? মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর বক্তব্য অনুযায়ী, এর উত্তর হলো হ্যাঁ, এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে রাজ্যের সব উপভোক্তাকেই যেতে হবে।
মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, “ফর্মে তথ্য বিশদে চাওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে পরিবারের তথ্যও সংগ্রহ করতে চায় সরকার। যাতে তা অন্য প্রকল্পেও কাজে লাগানো যায়।”
অর্থাৎ, বিষয়টি কেবল লক্ষ্মীর ভান্ডারের নাম পরিবর্তনের নয়। রাজ্য সরকার আসলে এই ফর্মে অত্যন্ত নিখুঁত ও বিস্তারিত তথ্য চেয়ে একটি সম্পূর্ণ ‘পারিবারিক তথ্যভাণ্ডার’ (Family Database) তৈরি করতে চাইছে। এই সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার মূল উদ্দেশ্য হলো, ভবিষ্যতে সরকারের অন্য যেকোনো জনকল্যাণমূলক বা সামাজিক উন্নয়নমূলক প্রকল্প যাতে সরাসরি এবং দ্রুত সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া যায়।
তাই আপনি আগে থেকে লক্ষ্মীর ভান্ডারের টাকা পেয়ে থাকলেও, সরকারের এই নতুন ডিজিটাল ডেটাবেসে নাম নথিভুক্ত করার জন্য সবাইকেই ধাপে ধাপে এই ‘অন্নপূর্ণা যোজনা’-র নতুন ফর্মটি পূরণ করতে হবে।

