প্রায় চার বছর পর পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীদের জন্য ফের চালু হল রাজ্য সরকারের অনলাইন বদলি পোর্টাল ‘উৎসশ্রী’। স্কুলশিক্ষা দফতর ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে পৃথক দুটি বিজ্ঞপ্তি জারি করে জানিয়ে দিয়েছে, দীর্ঘদিনের স্থগিতাদেশ সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হয়েছে। সেই অনুযায়ী ১ জুলাই ২০২৬ থেকে প্রাথমিক, উচ্চ প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক সব স্তরের শিক্ষক এবং সংশ্লিষ্ট শিক্ষাকর্মীরা আবার অনলাইনে বদলির আবেদন করতে পারবেন।
২০২২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া চলাকালীন শূন্যপদ (Vacancy) সংক্রান্ত জটিলতা এড়াতে তৎকালীন রাজ্য সরকার উৎসশ্রী পোর্টালের মাধ্যমে বদলির আবেদন গ্রহণ সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয়। পরে শিক্ষক নিয়োগ এবং গ্রুপ-সি ও গ্রুপ-ডি কর্মী নিয়োগের প্রক্রিয়া চলতে থাকায় দফায় দফায় সেই স্থগিতাদেশের মেয়াদ বাড়ানো হয়। ফলে গত প্রায় চার বছর ধরে হাজার হাজার শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী বদলির সুযোগ থেকে বঞ্চিত ছিলেন। যদিও কিছু সময় শুধুমাত্র আপস-বদলির (Mutual Transfer) আবেদন নেওয়া হয়েছিল, অভিযোগ ছিল সেই আবেদনগুলিরও অধিকাংশের নিষ্পত্তি হয়নি।
নতুন সরকার আসার পর, এবার স্কুলশিক্ষা দফতর জানিয়েছে, নিয়োগ সংক্রান্ত প্রক্রিয়া অনেকটাই স্থিতিশীল হওয়ায় বদলি ব্যবস্থা আবার স্বাভাবিকভাবে চালু করা হচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গ স্কুল সার্ভিস কমিশনের General Transfer, Transfer on Special Ground and Re-allocation Rules, 2015 অনুযায়ী এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়েছে। ফলে এখন থেকে শিক্ষক ও অশিক্ষক কর্মীরা নির্ধারিত নিয়ম মেনে উৎসশ্রী পোর্টালের মাধ্যমে সব ধরনের বদলির আবেদন করতে পারবেন।
প্রাথমিক শিক্ষা দফতরের তরফেও একই ধরনের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছে। সেখানে স্পষ্ট জানানো হয়েছে, ১ জুলাই ২০২৬ থেকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ক্ষেত্রেও উৎসশ্রী পোর্টালের মাধ্যমে সব ধরনের বদলির আবেদন গ্রহণ আবার শুরু হয়েছে। অর্থাৎ রাজ্যের প্রাথমিক থেকে উচ্চমাধ্যমিক সমস্ত স্তরের শিক্ষকরা এখন একই অনলাইন ব্যবস্থার মাধ্যমে বদলির আবেদন করতে পারবেন।
তবে ২০২১ সাল থেকে যাঁদের পুরনো আবেদন এখনও মীমাংসা হয়নি, সেগুলির নিষ্পত্তি আগে করা প্রয়োজন। তা না হলে ভবিষ্যতে আইনি জটিলতা তৈরি হতে পারে বলেও তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন অনেকেই। তাঁদের দাবি, ২০২২ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত আবেদন নেওয়া হয়েছিল এবং পরে শুধু আপস-বদলির সুযোগ থাকলেও বহু আবেদন এখনও ঝুলে রয়েছে।

উল্লেখযোগ্যভাবে, পোর্টাল চালুর ঠিক একদিন আগে শিক্ষামন্ত্রী দীপক বর্মন শিক্ষক বদলি নিয়ে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছিলেন। তিনি বলেন, বহু শিক্ষক তাঁকে ব্যক্তিগতভাবে মেসেজ বা ই-মেল করে বদলির আবেদন জানাচ্ছেন। কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে সবার আবেদন দেখা বা উত্তর দেওয়া সম্ভব নয়। তাই নির্দিষ্ট প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই বদলি হবে এবং সেই প্রক্রিয়া চালু হওয়ার আগে আলাদা করে অনুরোধ করার প্রয়োজন নেই। মন্ত্রীর এই মন্তব্যের মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই উৎসশ্রী পোর্টাল পুনরায় চালু হওয়ায় শিক্ষক মহলে স্বস্তি ও আনন্দের পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
প্রসঙ্গত, রাজ্যের পূর্বতন সরকার শিক্ষক-শিক্ষিকাদের বদলির প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ ও সহজ করতে উৎসশ্রী পোর্টাল চালু করেছিল। এই পোর্টালের মাধ্যমে শিক্ষকরা সম্পূর্ণ অনলাইনে বদলির আবেদন করতে পারেন। আগের নিয়ম অনুযায়ী আবেদন জমা পড়ার পর নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বদলি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার লক্ষ্য রাখা হয়েছিল। পাশাপাশি, কোনও শিক্ষকের বদলির অনুমোদন পাওয়ার পর যদি সংশ্লিষ্ট স্কুল কর্তৃপক্ষ NOC (No Objection Certificate) দিতে অযথা দেরি করে বা বাধা সৃষ্টি করে, তাহলে সেই অভিযোগও অনলাইনে জানানো যেত।
অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে সরকার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। বর্তমান সরকারও উৎসশ্রী পোর্টাল পুনরায় চালু করে স্পষ্ট করেছে যে, এখন থেকে সমস্ত বদলির আবেদন নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী অনলাইনেই গ্রহণ ও নিষ্পত্তি করা হবে। তবে পুরনো ঝুলে থাকা আবেদনগুলির কীভাবে নিষ্পত্তি করা হবে, সেই বিষয়ে বিজ্ঞপ্তিতে আলাদা কোনও নির্দেশ দেওয়া হয়নি। ফলে বহু শিক্ষক এখন সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকেই তাকিয়ে রয়েছেন।


